ঠাকুরমার ঝুলির সেই গল্পগুলো মনে আছে? আরব্য রজনীর গল্পকথকের নাম? সেই যে কমিক বইয়ের চরিত্রগুলো? তারুণ্যের কথা বলতে গিয়ে ডালিম কুমার, শীত-বসন্ত, নীলকমল আর লালকমলের কথা এসে গেল। অসুরের বিনাশ ঘটিয়ে, যক্ষ-রক্ষ-দানব বধ করতে তলোয়ার চালিয়ে জীবনপন লড়াই করা সেই রাজপুত্রদের কথা ভুলে যাবার নয়। শেহেরজাদের বুদ্ধিমত্তা আর সৃজনশীলতায় এখনও আমাদের মুগ্ধতা কাটে না। পুবের মতো পশ্চিমের সুপারহিরো- ফ্যান্টম, টারজান, ওয়ান্ডার ওম্যান, স্পাইডারম্যান, সুপারম্যানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আজকের শক্তিশালী অ্যাভেনজার্স। কল্পলোকের চরিত্রগুলো কিন্তু নিছক মনগড়া নয়। শুভশক্তির প্রতিনিধিত্ব করছে এই অতিমানবিক উদার সাহসী চরিত্রগুলো, যা সৃষ্টি হয়েছে বাস্তবতার অনুরূপে। এই সেই অদম্য তারুণ্য! অশুভ শক্তির সামনে মাথা নত না করে যে শক্তি অমিত তেজে রুখে দাঁড়ায়। অন্যায়-অনাচারকে প্রতিহত করে যুগে যুগে পৃথিবীকে সুরক্ষিত এবং বাসযোগ্য করে তোলে।

সময় বদলে গেছে। বদলে গেছে সমাজব্যবস্থা, রাজনীতি, অর্থনীতির চালচিত্র। এমন কি ভূ-প্রকৃতিও নেই আগের মতো। জলবায়ু উষ্ণতর হয়েছে। মেরুর বরফ গলে সাগরের উচ্চতা বেড়েছে। এতসব বদলের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবনধারা এবং অন্তর্গত ভাবনাজগৎ। উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার সঙ্গে এগিয়ে গেছে মানবসভ্যতার চাকা। পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে বদলে গেছে রূপকথার সেই রাজপুত্ররা। বাহারী মোড়কে অপশক্তি রূপান্তরিত হয়েছে আধিপত্যবাদে, যুদ্ধবিগ্রহে, ক্ষুধায়, নিপীড়নে। এ সব দৃশ্যমান আর আড়ালের অদৃশ্য অপশক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর অস্ত্র 'তারুণ্য'। তারুণ্যকে একটি শব্দ দিয়ে যদি সংজ্ঞায়িত করা যায় তা হলো 'শক্তি'। এই শক্তি স্বপ্ন দেখার সাহসকে ধারণ করে। তারুণ্যের জয়োল্লাসে অন্ধ চোখে আলো জ্বলে ওঠে। ক্লেদ, মালিন্য আর গ্লানি মুছে মৃতপ্রায়ের বুকে বাঁচার আনন্দ জাগে।

নোবেলে শান্তি পুরস্কার বিজয়ী কৈলাশ সত্যার্থী বলেছেন- The power of youth is the common wealth for the entire world. The faces of young people are the faces of our past, our present and our future. No segment in the society can match with the power, idealism, enthusiasm and courage of the young people. এই কথাগুলো পড়তে পড়তে মনে পড়ে যায় একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোর কথা। পরাধীনতার অন্ধকার কারাগার থেকে বেরিয়ে স্বাধীনতার সূর্যোদয় দেখবে বলেই আদর্শ আর উদ্দীপনায় ভরপুর বাংলাদেশের তারুণ্য ঘুরে দাঁড়িয়েছিল একাত্তরে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তারুণ্য প্রসঙ্গে একাত্তর এক অমোঘ অপ্রতিরোধ্য স্বপ্নের নাম। তারুণ্যের চোখে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন ছিল বলেই দেশের আপামর মানুষের বুকে জেগেছিল দেশকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করার প্রত্যয়। তারুণ্যের সাহসের জন্যই সমষ্টিগতভাবে বাঙালি উচ্চারণ করেছিল- 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো'। এ দেশের বুকে আঠারো নেমে এসেছিল বলেই বাংলাদেশ নামের একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছিল বিশ্ব মানচিত্রে।

যতবার এই দেশ ও জাতি সমস্যায় পড়েছে সমাধানের পথে এগিয়ে এসেছে তরুণ সমাজ। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরও দেশে গঠন আর সমাজ পরিবর্তনে তারুণ্যের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। জাতির সংকটকালে টিয়ার গ্যাস আর বুলেট উপেক্ষা করে তরুণরা রাজপথে নেমেছে বারবার। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, নব্বইয়ের গণআন্দোলন, দ্বিতীয় দশকের গণজাগরণ মঞ্চ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভ্যাট প্রত্যাহার আন্দোলন, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন সফল হয়েছিল মূলত তারুণ্যের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে। এরই ধারাবাহিকতায় সদ্য কুমিল্লার সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জের ধরে দেশজুড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় রাজপথে নেমে এসেছিল তরুণ লেখক সমাজ। তাদের আহ্বানে সংহতি জানিয়ে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একত্রে দাঁড়িয়ে ছিলেন কবি, লেখক, শিল্পী ও সাংবাদিকরা। বেশিরভাগ আন্দোলনেই প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির বাইরে তরুণরা স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে প্রতিবাদ করেছে।

রাজনৈতিকভাবেই শুধু নয়, তারুণ্যের উত্থানে বাংলাদেশের অর্থনীতিও সচল হয়েছে। বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যে ডিজিটাইজেশনের নতুনধারা যুক্ত হয়েছে। গতানুগতিক ব্যবসায় নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগ, নতুন অর্থনীতি, বাজারজাতকরণ, ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল আইনগত ও নিরাপত্তাজনিত ইস্যু বিষয়ে তরুণ সমাজ দ্রুত দক্ষ হয়ে উঠেছে। কভিড-১৯ এর নির্মম বাস্তবতায় 'স্টার্টআপ' একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। স্টার্টআপ হলো স্বল্পপুঁজিতে একজন উদ্যোক্তার উদ্ভাবনী ব্যবসার চিন্তাধারা ও সেটার বাস্তবায়ন। স্টার্টআপের মাধ্যমে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ব্যবস্থা তরুণদের শুধু অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করছে তা নয় বরং তারুণ্যের বিপথগামী হওয়াকেও প্রতিরোধ করেছে। আমাদের দেশীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে সারা পৃথিবীতে গর্বের একটি নাম উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম (ডঊ)। গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ১২ লাখ। দেশি পণ্যের এই গ্রুপটির মাধ্যমে তরুণ নারী উদ্যোক্তারা পরস্পরের সঙ্গে একক একটি প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে পেরেছে। এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে স্টার্টআপ ব্যবসায়ের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কর্মশালা, সামিট ও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করছে উদ্যোক্তারা। ফলে অভাবনীয় সব সুযোগের উন্মেষ ঘটছে, যা বহুমাত্রিকভাবে তাদের ব্যবসায়িক সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখছে।

শুধু জিডিপির হিসাব আর দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে পরিমাপ করলে উন্নয়নের সার্বিক চিত্রটি বোঝা যায় না। মননশীলতার গঠন ও সৃজনশীলতার বিকাশ না ঘটলে একটি জাতির আত্মিক মৃত্যু ঘটে। প্রতিনিয়ত তারুণ্যের শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চা করে জাতির সেই আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখে। তারুণ্য চিরবসন্তের মতো প্রকৃতির এক উপহার। একটি দেশের সম্পদ। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে তারুণ্য একটি জাতির মানবিক ও সংবেদনশীলসত্তাকে জাগিয়ে তোলে। হোক না সেটা একটি রক্তদান কর্মসূচি। মুমূর্ষু রোগীর পাশে তখন আস্থার নাম হয়ে যায় তারুণ্য। স্কুলবঞ্চিত পথশিশুরা অক্ষর চিনে নেয় তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের কাছ থেকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসহায় মানুষের ভরসাস্থল তরুণরাই। আসছে শীতে তরুণদের সংগ্রহ কয়েকটি শীতবস্ত্র সামান্য হলেও তো উষ্ণতা দেবে! এভাবেই মানবিকতায় দীক্ষিত তরুণ শিখে ফেলে কেমন করে হাতে হাত রেখে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। শিল্প ও সাংস্কৃতিক চর্চায় জানতে পারে নিজ ইতিহাস আর লোকজ ঐতিহ্য সম্পর্কে। বিজয় উৎসবে কিংবা নববর্ষের পার্বণে তরুণ প্রজন্ম চিনে নেয় জাতিসত্তাকে।

অযুত সম্ভাবনার তারুণ্যের সামনে রয়েছে প্রতিবন্ধকতা। নিজেদের স্বার্থেই তরুণদের সংকটের জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। চলমান রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণে অনীহা, রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পক্ষে তারুণ্যের ভাবনা ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে না পারা এবং ক্ষেত্রবিশেষে নেতিবাচকভাবে তরুণদের ব্যবহার করার প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আজকের তরুণরাই জাতির ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারক। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের দায়-দায়িত্ব নেওয়ার যোগ্য হয়ে উঠতে হবে এই তরুণ প্রজন্মকে। তাই রাজনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অধিকাংশ তরুণের অনাস্থা আর মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দেশের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না।

দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণের অপ্রতুল ব্যবস্থা আর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মানহীনতা তারুণ্যের সংকটকে গভীরতর করেছে। এখনই সময় সচেতন হওয়ার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাক ডুবিয়ে তরুণ প্রজন্ম যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে মনোবৈকল্যে না ভোগে। প্রযুক্তিনির্ভর ডিভাইসগুলো যেন তরুণদের আত্মকেন্দ্রিক না করে একত্র করতে পারে সে লক্ষ্যে অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। একুশ শতকের তরুণদের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে যোগ দিতে হবে প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে। এই বাস্তবতায় স্টার্টআপ বা ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার উপযুক্ত মাধ্যম তৈরি করতে হবে। উদ্যমী উদ্যোক্তার জন্য ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। আগামীতে ব্যবসার নেতৃত্ব দেবে তরুণসমাজ। বহুজাতিক কোম্পানি এবং টেকজায়েন্ট কোম্পানিগুলোতে কাজের সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকলেও নেতৃত্ব দেওয়ার বা যোগাযোগ করার প্রয়োজনীয় দক্ষতা তরুণদের নেই। তাই তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা বাড়াতে কর্মশালার আয়োজন করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশের তরুণরা বিশ্ব শ্রমবাজারে যুক্ত হয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী সুপরিকল্পিতভাবে তরুণ অদক্ষ শ্রমিককে দক্ষ শ্রমিকে পরিণত করতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী বিনিয়োগ পরিকল্পনা। বেসরকারি খাতকেও দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য এগিয়ে আসতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে কারিগরি শিক্ষায়। তরুণদের পক্ষে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব সংকটের মোকাবিলা করা সম্ভব না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুচিন্তিত কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ ও পরিকল্পনার আন্তরিক বাস্তবায়নই তারুণ্য শক্তিকে ইতিবাচকভাবে দেশ ও দশের কাজে লাগাতে পারে।

তারুণ্য হয়তো কখনও পথ ভুল করেছে। কিন্তু অপার সম্ভাবনা নিয়ে আবারও সঠিক পথে ফিরে এসেছে। তারুণ্যের প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে মাদকাসক্তি। এক্ষেত্রে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষায় তরুণদের দীক্ষিত করতে হবে। আমরা দেখেছি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতাদর্শ অনুসরণকারী গোষ্ঠী জেএমবি সন্ত্রাসবাদ বিস্তারে তরুণদের জঙ্গিবাদী কার্যক্রমে ব্যবহার করেছিল। ২০১৬ সালে হলি আর্টিজানের নৃশংস হামলা দেখে স্তম্ভিত হয়েছিল বাংলাদেশ। পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সকল স্তরের মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল তরুণদের নিয়ে। বিভিন্নভাবে তরুণদের সাময়িক নজরদারিতে রাখা হয়েছিল জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে। তারুণ্যকে বাদ দিয়ে একটি দেশ ও জাতি কখনও আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। তরুণরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। উন্নয়নের হাইওয়েতে তারুণ্যের হাতে স্টিয়ারিং। গতি-অগতির নিয়ন্ত্রণ ওই শক্ত সমর্থ দুটি হাতে।

ওই যে তরুণ শিল্পী প্রভাত ফেরিতে গাইছে- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি... ফুল হাতে, খালি পায়ে একুশের প্রথম প্রহরে আমরাও তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই। জরা-জীর্ণতা ঝরিয়ে সঞ্জীবনী সুধায় উজ্জীবিত হই। বারবার বেঁচে উঠি। ক্রান্তিকালেও শুনতে পাই বজ্র-নিনাদ। কে যেন ডাকছে- জাগো বাহে...

লেখক
কথাসাহিত্যিক
প্রাবন্ধিক

মন্তব্য করুন