'এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়'

কবি হেলাল হাফিজের বহুল জনপ্রিয় লাইন দুটি পড়লেই যেন অদ্ভুত এক প্রাণশক্তি জেগে ওঠে দেহের ভেতরে, জেগে ওঠে আকুতি যুদ্ধ জয়ের। যদিও আক্ষরিক অর্থে দেশে কোনো যুদ্ধ নেই। যারা বয়সে এখন তরুণ, বাঙালি জাতির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গৌরবের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়নি তাদের; অথচ যুদ্ধের নেশায় তাদের তারুণ্য ছটফট করে প্রতিনিয়ত।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে আমরা। একটু ফিরে তাকালেই দেখি, মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল তরুণ সমাজ। তারা হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, গড়ে তুলেছে 'মুজিব বাহিনী', ধ্বংস করেছে শত্রু শিবির, একের পর এক নস্যাৎ করেছে শত্রুদের সকল পরিকল্পনা। তারও আগে উনসত্তরের ভাষা আন্দোলনে তরুণদের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও ভূমিকা পাল্টে দিয়েছে দাসত্বের ইতিহাস। '৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে '৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের নব্বই দশক অবধি প্রতিটি আন্দেলনে-সংগ্রামে তরুণদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সর্বশেষ মানবতাবিরোধী রাজাকারদের বিচারের দাবিতে শাহবাগ থেকে সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত গণজাগরণের ঢেউ পৌঁছে দেওয়ার অসীম সাহসের এক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল আমাদের তরুণেরা। আজও দেশের কোথাও কোনো রাষ্ট্রবিরোধী, সাম্প্রদায়িক, নারীর প্রতি সহিংসতা বা মানবতাবিরোধী ঘটনা ঘটলেই সবার আগে এগিয়ে আসে এই তরুণ সমাজ, গড়ে তোলে সামাজিক প্রতিরোধ।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই তরুণ, যা সংখ্যায় প্রায় পাঁচ কোটি। দেশ গড়ায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এই তরুণরাই ভূমিকা রেখে চলেছে সকল ক্ষেত্রে, দেশে এবং বিদেশেও। শিক্ষায়, গবেষণায়, বিজ্ঞান চর্চায়, খেলাধুলায়, মেধা-মনন-সৃজনশীলতায় এ দেশের তরুণেরা দেশের সীমানা পেরিয়ে এখন প্রশংসিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। খুব সাধারণ পরিবারে অনাদরে বেড়ে ওঠা এক ঝাঁক তরুণ এখন বিশ্বক্রিকেটের বিস্ময়। তরুণেরাই এভারেস্ট জয়ের মাধ্যমে দেশকে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়, বিভিন্ন অলিম্পিয়াডে সফলতার স্বাক্ষর রাখছে, খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে, এমনকি রাজনৈতিক নেতৃত্বেও উন্নত বিশ্বে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশের তরুণেরা।

অতি সম্প্রতি মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের তালিকায় নাম উঠে এসেছে বাংলাদেশের ৯ তরুণের। এশিয়ার ২২ দেশের সেরা ৩০০ তরুণ উদ্যোক্তার তালিকায় স্থান করে নিয়েছে এই ৯ তরুণ। ব্যবসা, প্রযুক্তি, সামাজিক প্রভাব এবং রিটেইল ও ই-কমার্স ক্যাটাগরিতে এশিয়ার সেরা তরুণদের কাতারে উঠে এসেছে তারা।

এসব অর্জন আমাদেরকে আশাবাদী করে, সামনে চলার প্রেরণা জোগায়। কিন্তু বিপরীতে হতাশার চিত্রও কম নয়। হতাশার প্রধান কারণ বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের অপ্রতুলতা। ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) এক পরিসংখ্যানে দেখিয়েছে, বাংলাদেশে শতকরা ৪৭ ভাগ গ্র্যাজুয়েট হয় বেকার, না হয় যে কর্মে নিযুক্ত এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট হওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। প্রতি বছর বাংলাদেশে ২২ লাখ কর্মক্ষম মানুষ চাকরি বা কাজের বাজারে প্রবেশ করছে। এই বিশালসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষের মাত্র ৭ শতাংশ কাজ পাচ্ছে, অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বেকারের তালিকায় নাম লেখাচ্ছে। ফলে বেকারত্ব বাড়ছে, বাড়ছে হতাশা, বাড়ছে মাদকের প্রতি আকর্ষণ, অনৈতিক পথে আয়ের চেষ্টা এবং ব্যর্থতা থেকে আত্মহত্যা। এ সংকট আমাদের একার নয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেই দেখা যাচ্ছে তরুণেরা যত বেশি  পড়ালেখা করছে, তত বেশি বেকার থাকার ঝুঁকি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আঞ্চলিক কর্মসংস্থান নিয়ে এক প্রতিবেদনেও এ চিত্রই উঠে এসেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২৮টি দেশের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ পাকিস্তানে, ১৬.৮ শতাংশ। বাংলাদেশে এই হার ১০.৭ শতাংশ, যা এ অঞ্চলের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মোটা দাগে বলা যায়, এর জন্য দায়ী আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা। তরুণদের ছোট একটি অংশ পেশাদারি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও বিশাল অংশটি তাদের শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে না। অন্যদিকে অল্প শিক্ষিতরা প্রবাসে পাড়ি জমাচ্ছে কাজের সন্ধানে অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে। শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের এই সমীকরণ মেলানোর কথা যত না বলা হচ্ছে, বাস্তবতায় তার প্রতিফলন নেই। মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছে এবং দেশে আর ফিরছে না। পাচার হয়ে যাচ্ছে মেধা, মানবসম্পদ, আমাদের ভবিষ্যৎ- বিষয়টিকে আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করছি না। না করার কারণটিও একেবারেই সুস্পষ্ট; আমাদের অধিকাংশ নীতিনির্ধারকরা সন্তানদের বিদেশে নিরাপদে রাখতেই স্বস্তি পান।

নীতিনির্ধারক এবং রাজনীতিকদের এই মানসিকতার ফলে মেধাবী তরুণেরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে চায় না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে এ দেশের রাজনীতি যেভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে এগিয়েছে, সেখান থেকে ফিরতে যেমন সময় লাগবে, তেমনি প্রয়োজন হবে আমূল সংস্কার। রাজনীতিকদের সেটুকু সদিচ্ছা আছে বলে নিকট অতীতের ঘটনাবলি খুব একটা প্রমাণ করে না। এখনকার সচেতন তরুণেরা নিজেরাই এগুলো বিচার-বিশ্নেষণ করে, ক্ষমতা ভোগ আর ভাগাভাগির দৃশ্য তারা চাক্ষুস দেখে। ফলে এড়িয়ে যায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে। দুঃখজনক যে, নিজের ভোটটিও দেওয়ার আগ্রহ হয় না এখনকার অধিকাংশ তরুণেরই। এর ফলে দেশের প্রতি তাদের মমত্ববোধ কমে যাচ্ছে। এই রাজনীতি বিমুখতা দেশকে এগিয়ে নিতে বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াবে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তরুণদের আরেকটি অংশ অপরাজনীতির প্রভাবে জড়িয়ে পড়ছে জঙ্গিবাদী কার্যক্রমে। সাম্প্রদায়িক বিভিন্ন ঘটনা, হলি আর্টিসানসহ নানা ঘটনা সমাজে যেমন একপ্রকার অস্থিরতা তৈরি করেছে, অন্যদিকে বিভ্রান্ত করছে তরুণ সমাজকে। কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়া, সাহিত্য-সংস্কৃতির অবাধ সুযোগ না থাকা, খেলাধুলা-বিনোদনের সুযোগ সীমিত হওয়ায় রাজনীতির দুষ্টচক্র খুব সহজেই তরুণদের ব্যবহার করতে পারছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি, ভোগবাদী জীবনধারা এবং সংস্কৃতির আগ্রাসনে প্রগতিশীল রাজনীতি আগের মতো সক্রিয় বা গঠনমূলকও নেই যে, তরুণদের আকৃষ্ট করবে।

বিজ্ঞানমুখী, প্রযুক্তিমুখী, কর্মমুখী, উৎপাদনমুখী জাতি গঠনে আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করার এখনই সময়। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যে আয়োজন শুরু হয়েছে, সে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের তরুণদেরকেই প্রস্তুত করতে হবে। আমাদের আশার কথা, দেশ গঠনে আমরা তরুণ একজন প্রযুক্তি পরামর্শক সজীব ওয়াজেদ জয়কে পেয়েছি, যিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

কিন্তু আমাদেরকে কঠিন বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না। তরুণদের গড়ে তুলতে ঢেলে সাজাতে হবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিজ্ঞানে আমাদের তরুণদেরকে গড়ে তুলে এবং সে অনুসারে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য উপযোগী বিজ্ঞানাগার এবং তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সহশিক্ষা কার্যক্রমকে উৎসাহ দিতে স্কুল-কলেজে বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব ইত্যাদি আবশ্যক ঘোষণা করে বাৎসরিক কর্মপরিকল্পনায় বিজ্ঞান মেলা, সাংস্কৃতিক সপ্তাহ, বিতর্ক উৎসব ইত্যাদির চর্চা নিয়মিত রাখতে হবে। আর এসব কিছু সুনিপুণ পরিকল্পনা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সদিচ্ছা ছাড়া হওয়ারও নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে সে আশার আলো কিছুটা হলেও দেখা যাচ্ছে। এ আলো অনেক বিস্তৃত হবে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আমাদেরকে আরও মনে রাখতে হবে, বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিচ্ছেন, এখন আমাদের যে প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণ রয়েছে ২০৫০ সাল নাগাদ, তা ১০ থেকে ১৯ শতাংশে নেমে আসবে। তাই আজকে আমাদের সামনে যে সুযোগ রয়েছে, তা আজকেই কাজে লাগাতে হবে। বিশাল এ কর্মক্ষম, দেশপ্রেমী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান, উদ্যমী তরুণ প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নির্দেশনার মাধ্যমে দেশ গড়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদেরকে মূল্যায়ন করতে হবে যথাযথভাবে, সুযোগ দিতে হবে তাদের মেধা বিকাশের, তাদেরকে বসাতে হবে যোগ্যতর স্থানে। রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল অংশকে তরুণদের উপযোগী ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে।

পাস করেই একমাত্র লক্ষ্য চাকরি- এ ধারণা থেকে আমাদেরকে সরে আসতে হবে। কর্মসংস্থান মানেই শুধু চাকরি নয়। এ জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সামাজিক উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা তৈরিতে ব্যাপকভাবে কাজ করতে হবে। প্রযুক্তি, কৃষি, নবায়নযোগ্য শক্তি, যোগাযোগ, সেবা, পোশাকশিল্প, চামড়া শিল্প, খাদ্য সকল ক্ষেত্রেই দেশের বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামাজিক উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারি বিনিয়োগ, সহযোগিতা, কর অবকাশ, উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ ইত্যাদি নিশ্চিত করতে পারলে তরুণেরা অবশ্যই আকৃষ্ট হবে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের দক্ষতা এবং একতাবদ্ধতা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসমূহ। প্রত্যন্ত অঞ্চলের লাখ লাখ দক্ষ নারী এখন সম্পদে পরিণত হয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলেই এরা দেশের এবং বিদেশের বাজারের উপযোগী পণ্য সম্ভারে সাজিয়ে দিতে পারবে দেশটাকে। সামাজিক উদ্যোগে তরুণদের দক্ষতা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন খাতে এবং বিশেষ করে ই-কমার্স পরিচালনায় প্রশংসিত হয়েছে। এসব কাজে সরকারকে নিয়ন্ত্রক নয়, সহায়ক হিসেবে পাশে থাকতে হবে।

তরুণেরা সত্য জানে, সত্য জানতে চায়। যে কোনো দেশের বা সমাজের প্রাণশক্তি তারা। তরুণেরা স্বপ্ন দেখতে জানে, আর সে স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার চ্যালেঞ্জ নিতেও পিছপা হয় না। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে দাঁড়িয়ে দেশ নিয়ে হতাশার কথা বলা শোভা পায় না। দল-মত নির্বিশেষে দেশকে গড়াই এখন আমাদের সবার চিন্তা ও চেতনা হওয়া উচিত। তরুণদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমরা যদি আমাদের পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্নসমূহ বাস্তবায়ন করতে পারি, তার সুফল শুধু তরুণেরা নয়, সমগ্র জাতি ভোগ করবে এবং সে সুফল অবশ্যই টেকসই হবে।

আমাদের সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, দূরদর্শিতা, সহযোগিতা, বিনিয়োগ, উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং দেশপ্রেমের মাধ্যমে নতুন করে এ দেশটাকে গড়ে তুলতে পারি, যেখানে তরুণেরা মাঝি হয়ে উন্নয়নের নৌকায় আমাদেরকে নিয়ে যাবে নিরাপদ কোনো গন্তব্যে।

লেখক
নির্বাহী পরিচালক বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (বিএফএফ)

মন্তব্য করুন