মানুষের অমরত্বের সাধনার ইতিহাস বহুপ্রাচীন। পৌরাণিক চরিত্র হতে বাস্তবের মানুষ সকলেই অমরত্বের সন্ধান করেছে। এ জন্য ভারতীয় পৌরাণিক গ্রন্থে যে অমৃত বা সোমরসের উল্লেখ আছে তার সন্ধান করেছে মানুষ। সুমেরীয়রা করেছে বিশেষ পানীয়ের সন্ধান। পারস্য সাহিত্যে যা উল্লেখ করা হয়েছে আব-ই হায়াত নামে। চীনের মানুষেরা অনুসন্ধান করেছে এক বিশেষ ধরনের মাশরুমের; যা প্রকৃতপক্ষে জন্মায় গোবরে। অনেকে মনে করেন গরুকে পবিত্র মনে করার একটা সূত্র সম্ভবত এর সাথে যুক্ত। এমন গল্পও চালু আছে যে, গ্রিক মহাবীর আলেক্সান্ডার ভারতের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন মূলত অমরত্বের ঝরনায় স্নান করার উদ্দেশ্যে। তিনি সে ঝরনার সন্ধানও নাকি পেয়েছিলেন। কিন্তু যখনই ডুব দেবেন তখনই ঝরনার পাশের মরা ডালে বসা একটি অতি বৃদ্ধ শকুন তাকে সাবধান করে। সে জানায়, এ ঝরনায় সেও ডুব দিয়ে অমরত্ব লাভ করেছে। কিন্তু সে এখন মৃত্যু চায়। কেননা, অতিশয় বৃদ্ধ হওয়ার ফলে তার জীবন নিজের কাছে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। কিন্তু মৃত্যু আর তার হচ্ছে না। বৃদ্ধের দুর্বিষহ জীবন কেইবা চায়? আলেক্সান্ডার অমরত্বের ঝরনায় ডুব না দিয়েই ফিরে যান। এটা না বোঝার কারণ নেই, এটি নিছক গল্পমাত্র। কিন্তু এর ভেতর একটি সত্য লুকিয়ে আছে। তা হচ্ছে মানুষ অমরত্ব চায়। কিন্তু বৃদ্ধের জীবন চায় না। সে চায় চিরতরুণ থাকতে। মানুষের পক্ষে অমরত্ব লাভ সম্ভব না হলেও টুরিটসিস ডোরনি নামক একমাত্র যে প্রাণীটিকে অমর ধরা হয় সেও বৃদ্ধ হতে চায় না। যখনই শরীরের কোনো কোষের বৃদ্ধ বা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় সে তখনই সে কোষটিকে পলিপে রূপান্তর করে আবার তরুণ করে তোলে। ফলে এ কথা সহজেই বলা যায়, প্রাণিজগতের মূল ইচ্ছা চিরতরুণ থাকা। এ জন্য স্বর্গলোকে চিরতরুণ, চির যৌবনময় থাকার স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। সর্বত্রই তারুণ্যের জয়গান। তারুণ্যের জয়গান গেয়ে যুগে যুগে রচিত হয়েছে অসংখ্য কাব্য।

কিন্তু তারুণ্য জিনিসটা ঠিক যতটা না শরীরের বিষয় তার চেয়ে বেশি মনের। তারুণ্যের কোনো সর্বসম্মত বয়সসীমা নেই। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড প্রোগ্রাম অব অ্যাকশনের বিবেচনা অনুযায়ী ১৫-২৪ বছর বয়স হচ্ছে তারুণ্যের সময়। আবার জাতিসংঘের সুরক্ষা কাউন্সিলে রেজল্যুশন অনুযায়ী এ বয়সসীমা ১৮ থেকে ২৮। আফ্রিকান সনদ অনুসারে এ বয়সসীমা ১৫ হতে ৩৫ বৎসর। অর্থাৎ নানা দেশে নানান বয়সসীমা আছে। মূলত কিশোর ও সদ্য যুবক বয়সীদের আমরা বয়সের দিক থেকে তরুণ ধরতে পারি। বাংলাদেশে এ রকম জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ। মানে এ সংখ্যা তিন কোটি বিশ লাখের বেশি। এটা বিরাট সংখ্যা। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, এরাই হচ্ছে জনসংখ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কেননা এদের ওপরই ভিত্তি করে এ দেশের ইতিহাস গড়ে উঠেছে,বর্তমান চলছে আর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাব ইতিহাসের প্রতিটি ক্ষণ মূলত এরা তৈরি করেছে, ইতিহাস নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাব- বাঙালির প্রতিটি সংকটে তরুণ সমাজ সামনে দাঁড়িয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তরুণ সমাজই এগিয়ে এসেছে। এরপর ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনে, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে ছিল প্রধানত তরুণ সমাজেরই ভূমিকা। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের বৃহৎ অংশ ছিলেন তরুণ। তারা যুদ্ধ করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন এ দেশের স্বাধীনতার জন্য। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও দেশ গঠন ও গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সব সময় তরুণ সমাজ নেতৃত্ব দিয়েছে। তার উজ্জ্বল দুটো উদাহরণ হচ্ছে নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন ও শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এ দুটো গণ-আন্দোলন ছিল বিশেষভাবে স্মরণীয়। এ দুটো আন্দোলনই গড়ে তুলেছিল তরুণ সমাজ। এর পর জাহাঙ্গীরনগরেও যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন ও সাম্প্রতিক নিরাপদ সড়ক আন্দোলনও গড়ে তুলেছিল তরুণ সমাজ। শুধু রাজনৈতিক, সামাজিক, নাগরিক নয়- নানা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও সাধন করেছেন তরুণরা। বাংলা লোকগানকে নতুন করে ফিরিয়ে এনেছে তরুণরা। নাটক ও চলচ্চিত্রে ঘটেছে অনেক পরিবর্তন। এমনকি চলচ্চিত্রে এ দেশের তরুণরা পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। ক্রীড়ায়, বিশেষত ক্রিকেটে বিস্ময়কর অর্জন। অবশ্য তরুণদের এসব অর্জন যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে কিছু সংকটও।

বর্তমান সময় একটি সন্ধিক্ষণের কাল। তাত্ত্বিকরা এ সময়ের নাম দিয়েছেন উত্তর সত্য (Post Truth) কাল। বিগত শতাব্দীর শেষ কয়েক দশকে বিশ্ব এক নতুন পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছিল। রাশিয়ার সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়ার পর বিশ্ব কার্যত এক নতুন অবস্থার মুখোমুখি হয়। ফলে এতদিন ধরে বিশ্বরাজনীতিতে যে ভারসাম্য অবস্থা ছিল তা ভেঙে পড়ে। এতে পুঁজিবাদী বিশ্ব হঠাৎ করেই আগ্রাসী হয়ে ওঠে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে অনিয়ম, অসত্য মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মিডিয়া ও বাকস্বাধীনতাও নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। অবস্থা এমন হয় যে, সত্য তখন উৎপাদিত হতে থাকে। বলা হতে থাকে প্রকৃত ঘটনা সত্য নয়, সত্য হচ্ছে যা রাষ্ট্র বানিয়ে বলে। দিনে দিনে এ অবস্থা আরও মারাত্মক হতে থাকে। যার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনে। দেশে দেশে এ রকম ঘটনা ঘটেছে, ঘটছে। এর অভিঘাত তরুণদের মনে ক্ষত তৈরি করেছে।

গত কয়েক দশকে অন্তর্জালের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বিস্তার ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের। এটা যেমন একদিকে সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি তৈরি করেছে সংকটেরও। কেননা বর্তমানে তরুণ সমাজ একই সাথে দুটো পরিচয় ও ভূমিকাকে বহন করছে। একদিকে সে বাস্তব দেশের নাগরিক আর অন্যদিকে ভার্চুয়াল জগতেরও নাগরিক তথা নেটিজেন। বাস্তব জগৎটি এতটা আকর্ষণীয় নয়, যতটা আকর্ষণীয় কল্পনার জগৎ। সেটা সম্ভব অনলাইনে। সেখানে মেকি, সাজিয়ে দেখানো জগতে বাস করা সম্ভব। তরুণরা স্বভাবতই কল্পনা ও ভাবপ্রবণ। স্বাভাবিক কারণেই তরুণদের বড় একটি অংশ সে ভার্চুয়াল জগতে বসবাস করতে অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ফলে আন্তকুলায়িত, আত্মমুগ্ধ একটি প্রজন্ম গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগে যেমন যে কোনো সামাজিক রাষ্ট্রীয় সংকটে তরুণ এগিয়ে আসত, অন্যায়, অবিচারে ঝাঁপিয়ে পড়ত বর্তমানে তা আর দেখা যায় না বলে অনেকে অভিযোগ করেন।

অনলাইনের অনেক বিশাল ও বর্ণিল দুনিয়া তরুণদের অনেক সময় অস্থির করে তোলে। এ থেকে তৈরি হয় অনলাইন আসক্তিও। ফলে তরুণদের মধ্যে একনিষ্ঠ অনুশীলন ও গভীর চিন্তা করার ক্ষমতা কমেছে বলে অনেকে অভিযোগ করেন। অনলাইনের নানা ধরনের আসক্তির ফলে এ তরুণরা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে বলেও ধারণা করা হয়। এর থেকে তৈরি হচ্ছে হতাশারও। সাথে যুক্ত হয়েছে মাদকাসক্তি। এতে তরুণদের একটা অংশ ঝুঁকিতে পড়েছে।

তরুণদের হতাশার আরও একটি বড় কারণ বেকারত্ব। বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে দেশে জনসংখ্যা ও শিক্ষার হার যে হারে বেড়েছে চাকরির স্থান সে হারে বাড়েনি। বিশেষত ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস ও নানা ধরনের বিবেচনায় অধিক হারে কলেজ পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় দেশে উচ্চশিক্ষার একটি উল্লম্ম্ফন ঘটেছে। অপরদিকে এ শিক্ষার মান নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। উচ্চশিক্ষিতরা যেমন অভিযোগ করেন তারা চাকরি পাচ্ছেন না, তেমনি চাকরিদাতাও অভিযোগ করেন তারা যোগ্য কর্মী পাচ্ছেন না। শিক্ষার হেরফেরের কারণে এমনটি ঘটছে। প্রয়োজন মানসম্পন্ন ও কর্মমুখী শিক্ষা। আশার কথা, সরকার কর্মমুখী শিক্ষার দিকে বর্তমানে নজর দিচ্ছে।

সাংস্কৃতিক দিকে থেকেও সংকট দেখা যাচ্ছে। তরুণদের একটি অংশ নানা উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছে। এর কারণ সাংস্কৃতিক শূন্যতা। গত কয়েক দশকে দেশে শিল্প-সংস্কৃতির অনেক মাধ্যম নানা অজুহাতে সীমিত বা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যাত্রাশিল্পকে রোধ করা হয়েছে অশ্নীলতার অভিযোগ তোলে। এমনকি কবিগান, বাউলগানকেও নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। পয়লা বৈশাখসহ বাঙালি সংস্কৃতির বড় বড় উৎসবকে বিতর্কিত করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। এই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন একশ্রেণির কট্টরপন্থি ওয়াজ মাহফিলকারীরা। সেসব ওয়াজ মাহফিলে অনেক বক্তা জনপ্রিয় হওয়ার জন্য ধর্মের বাইরে গিয়ে যেমন বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তেমনি একটা অংশ ছড়িয়েছে বিদ্বেষ ও উগ্রবাদ। সে ওয়াজ মাহফিলগুলো আবার প্রচার হয়েছে অনলাইনের নানা মাধ্যমে। ফলে তরুণদের একটা অংশ উগ্রপন্থার দিকে আকৃষ্ট হয়েছে। তাদের মনন গঠনেও প্রভাব বিস্তার করেছে এ পন্থা।

এই সংকট সত্ত্বেও আমি এ সংকটের ভেতরই তরুণদের সম্ভাবনা দেখতে পাই। অনলাইন যে আসক্তির কথা বলা হয়েছে এই অনলাইন জগতেই বাংলাদেশের তরুণরা ইতোমধ্যে তাক লাগানো কাজ করেছেন। আয়মান সাদিক টেন মিনিটস্‌ স্কুল খুলে শিক্ষা জগতে নজর কেড়েছেন বিশ্বব্যাপী। করোনাকালে অনলাইন শিক্ষার নানা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন তরুণরা। আমাদের তরুণরা ইলাস্ট্রেশন ও কার্টুন মুভি তৈরি করার ক্ষেত্রেও নাম করেছেন। ইতোসময়ে বাংলা ভাষার ডিজিটালাইজেশনের কাজও করেছে তরুণরা। আউটসোর্সিং জগতের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের তরুণদের দখলে। করোনার সময় সব ক্ষেত্রে অনলাইন কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামীতেও এর গুরুত্ব কমবে না। এ কথা সকলেই মনে করেন আগামী বিশ্ব হবে পুরোপুরি টেকনোলজি-নির্ভর। বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশ টেকমুখী। এ ক্ষেত্রে আমাদের তরুণদের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে আগামী বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার।

আজ যে শিশু আগামীকাল সে কিশোর, তরুণে পরিণত হবে। তারপর এক সময় বৃদ্ধে রূপান্তরিত হবে। এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে। আর তারুণ্যের বন্দনা করার ধারাও কখনও বন্ধ হবে না। তারুণ্য সব সময়ই অমিত সম্ভাবনাময়।

লেখক
কবি
শিক্ষাবিদ

মন্তব্য করুন