তরুণ প্রজন্মের কথা বলার শুরুতে আমরা যেটা বলতে পারি, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ তরুণদেরই অবদান। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু যখন মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিলেন, তখন ৭১ সালের তরুণ প্রজন্ম, তারাই কিন্তু গেরিলা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে এ দেশকে স্বাধীন করেছে। নিশ্চয়ই বিভিন্ন বয়সের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষ করে ৩০ লাখ মানুষ যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন তাদের মধ্যে শিশু থেকে বৃদ্ধ সকল বয়সের মানুষ ছিল। তাদের সকলের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। সমকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমরা জানি যে সমকালের মতো একটি পত্রিকা যাদের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এবং আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করছি, এমন সময় দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মতো খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সকল শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং একই সঙ্গে আমাদের তরুণ প্রজন্ম, যারা তাদের সর্বস্ব ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, অনেকে শহীদ হয়েছেন, অনেকে যুদ্ধ করে স্বাধীন দেশ আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তরুণ প্রজন্ম সবসময়ই জীবনের প্রতীক, গতিশীলতার প্রতীক এবং সেই গতিশীলতা দেশকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যায়। আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত এ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ভূমিকা রেখেছে তা আজ গভীরভাবে স্মরণ করব এ কারণে, যে বাংলাদেশের আগামী প্রজন্ম যারা আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে, তারা নতুনভাবে শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য পার হয়ে নেতৃত্বের দিকে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের অর্জন এবং তাদের থেকে আমাদের যে চাহিদা আমরা প্রত্যাশা করি, এ সম্পর্কে যদি বলতে যাই, শুরুতেই বলতে হবে তরুণ প্রজন্মের জীবন্ত উদাহরণ সৃষ্টি করা দরকার আছে। বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মহান নেতা সামনে ছিলেন বলে আমরা দেখেছি সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় তরুণ প্রজন্ম কীভাবে একজন নেতাকে অনুসরণ করেছে। তিনি যখন যে কথা বলেছেন তরুণ প্রজন্ম মনে করেছে সেটি শিরোধার্য এবং সেটিই আমাদের পালন করতে হবে এবং এতেই আমাদের মঙ্গল রয়েছে। তিনি যে কথাটি বলেন, সেটি তরুণ প্রজন্মের কাছে বেদবাক্য হিসেবে

উপনীত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ প্রজন্মের মাঝে আমরা একটা হতাশা, একটা নৈরাশ্যমূলক পরিস্থিতি লক্ষ্য করি। এটার কারণ হচ্ছে যে এখন তরুণ প্রজন্মের সামনে তখনকার বঙ্গবন্ধুর মতো একজন জীবন্ত আদর্শের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে পারছি না। এটি শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বলছি না। আমরা যে যেখানে আছি বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্বে যারা আছি, যারা শিক্ষক হিসেবে আছি বা বিভিন্ন পেশায় যারা নিয়োজিত আছি, আমাদের অনুসারীরাই তো পরবর্তী সময়ে আমাদের জায়গায় এসে অবস্থান করবে। তারা যদি কোনো আদর্শ দৃষ্টান্ত না দেখে তাহলে কাদেরকে অনুসরণ করবে?

সেই জায়গায় আমার মনে হয় আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সকলকেই আদর্শ অনুসরণ করে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে হবে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুশীলন করে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে হবে যেন তরুণ প্রজন্ম এখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে। রাষ্ট্র এবং সরকারের যে দায়িত্ব, তরুণ প্রজন্মের মাঝে শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা। তরুণদের মাঝে যদি শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা না যায়, তাহলে তরুণ প্রজন্মকে আমরা সম্পদে পরিণত করার সুযোগ পাব না। যেটি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সঠিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন বলে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যাস করে আধুনিক, যুগোপযোগী, সময়োপযোগী ও স্বাধীন দেশ উপযোগী একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করার। বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর আমরা সেদিক থেকে বহু বহু পিছিয়ে গেছি। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে পথ অনুসরণ করে ২০১০ সালে আমাদের শিক্ষানীতি উপহার দিয়েছেন এবং এখন সে শিক্ষানীতি আধুনিকীকরণের কাজ এগিয়ে চলেছে। সম্প্র্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো ধরনের বার্ষিক পরীক্ষা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রাথমিক ও জুনিয়র শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা সেটি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত এসেছে। পরীক্ষার চাপ শিক্ষার্থীদের ওপর কমানো হচ্ছে এবং তাদেরকে পরীক্ষার্থী বানানোর পরিবর্তে প্রকৃতপক্ষে বিদ্যার্থীতে রূপান্তর করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আর নবম ও দশম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, কলা, বাণিজ্য বিভাগের বিভাজন না করে একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে বিজ্ঞান, বাণিজ্য, কলা বিভিন্ন বিষয়ে বিভাজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা যা বহির্বিশ্বে অনুসরণ করা হয় তার সঙ্গে অনেকাংশেই সংগতিপূর্ণ। সেজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু যেটি প্রয়োজন, আজকে বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের মাঝে প্রায় ১২ শতাংশ বেকার আছে। বিশ্বেও শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। কারণ, শিক্ষার সুযোগ বাড়লেও শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে চাকরির সুযোগ কিন্তু বাড়ছে না। আমাদের দেশে দেখছি তরুণ প্রজন্মের মাঝে যারা একটু উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে তারা অনেকেই বেকার থাকছে। আর যারা একটু উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে না তারা নিজেদের মতো করে অনেকেই অনেক কিছু করছে। কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করছে, কেউ দোকান দিচ্ছে, কেউ ছোটখাটো চাকরি করছে। কিন্তু যারা স্নাতক, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছে তারা অনেকেই বেকার জীবনযাপন করছে। কারণ তাদের পক্ষে এখন গ্রামে গিয়ে কৃষিকাজ করা সম্ভব হচ্ছে না, তাদের পক্ষে নিম্ন আয়ের কোনো কাজ করা সম্ভব নয়, কেউ হয়তো বিদেশে চলে গিয়ে দৈহিক শ্রমে কাজ করছে। দুটোই কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, কারণ শিক্ষা যখন নিচ্ছে, জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ হয়। সেই শিক্ষা যদি স্নাতক, স্নাতকোত্তর ডিগ্রির শিক্ষা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো কারিগরি শিক্ষা হয়, যে কোনো শিক্ষার পেছনে সরকারের প্রচুর টাকা যাচ্ছে। সেই শিক্ষা আমরা দিচ্ছি। সেই শিক্ষা নেওয়ার পরেও এমন কোনো শিক্ষা হচ্ছে না যেটি আজকের জগতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ শিক্ষা। বঙ্গবন্ধু সে জায়গায় কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি ১৯৭৩ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে বলেছিলেন, আমি বাংলাদেশে কেরানি শিক্ষার যে প্রচলন আছে তা বন্ধ করে দিলাম। কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটাব। আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি বাস্তবতায় কারিগরি শিক্ষার কতটা প্রয়োজন। আজকে আমাদের যেসব শ্রমিক ভাইবোন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন, তাদেরকে যদি কারিগরি শিক্ষার নূ্যনতম শিক্ষা দিয়ে পাঠানো যেত, তাহলে তারা আজকে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন তার চেয়ে ৫ বা ৭ গুণ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারতেন। আমরা অনেক বেশি সংখ্যক শ্রমিক পাঠাচ্ছি। সেই হিসেবে কম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারছি। দক্ষিণ কোরিয়া বা শ্রীলঙ্কা আমাদের চেয়ে কম সংখ্যক শ্রমিক পাঠিয়ে অনেক বেশি সংখ্যক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে যাচ্ছে। কারণ তাদের শিক্ষার দিকটা বিস্তৃত, প্রসারিত। আমরা সেদিক থেকে পিছিয়ে আছি। আমার মনে হয় আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য এখন এমন শিক্ষাব্যবস্থা দরকার, যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে নিজেদের চাকরি সংস্থানের একটা সমন্বয় নিজেরা তৈরি করতে পারে।

তরুণ প্রজন্ম কেন হতাশায় ভুগবে? তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে আশার সঞ্চার করা দরকার। আশা মানুষকে প্রবল করে তোলে, আশা মানুষকে আশাবাদী করে। আশাবাদী মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আশা কিন্তু দেখা যায় না কিন্তু আশা মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আমি আশান্ব্বিত হয়েছি কারণ আমি জানি আমার সামনে এই সুযোগটা আছে। মানসম্পন্ন লেখাপড়ার সুযোগটাও কিন্তু আশার সঞ্চার করে।

একজন শিক্ষার্থী যখন ভালো ফল করে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে তারপর তার কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ পায়, সে খুব আশা নিয়ে পড়ালেখা শুরু করে, কিন্তু সে যখন কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায় না তখন সে মন খারাপ করে। কোনো জায়গায় হয়তো ভর্তি হয় ঠিকই কিন্তু তার পড়ালেখার উদ্যমটা আর থাকে না। এগুলো অনুভব করার বিষয়। এগুলো তরুণ প্রজন্মকে হয়তো বলে বোঝানো যাবে না এজন্য তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যারা ওঠাবসা করে, যেমন আমরা আমাদের পেশাগত জীবনে তরুণ প্রজন্মের মাঝে কাটিয়েছি, আমরা তরুণদের অব্যক্ত কথাগুলো বুঝতে পারি। আমরা দেখতে পাচ্ছি এই মুহূর্তে চাকরির পরীক্ষাগুলো এক শুক্রবারে ১৪টি ১৮টি সংস্থার পরীক্ষা একদিনে হচ্ছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মের বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে কিন্তু বিগত দুই বছর পরীক্ষা দিতে পারেনি কারণ পরীক্ষা অনুষ্ঠিতই হয়নি। এখন যখন পরীক্ষা হচ্ছে, সরকারের এই সংস্থাগুলোর সমন্বয় করার দরকার ছিল। কারণ সরকারি চাকরির জন্য আমাদের ছেলেমেয়েরা লম্বা সময় পর্যন্ত প্রতীক্ষা করে আছে। এখন যদি একই দিনে ১৭-১৮টি সংস্থার পরীক্ষা থাকে তাহলে একজন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে তো সকাল-বিকেল দুটি পরীক্ষা ছাড়া এর বেশি পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি সংস্থাগুলো যাদের ওপর তরুণদের চাকরি পরীক্ষার বিষয়গুলো ন্যস্ত করা আছে তারা যদি এই বিষয়গুলো উপলব্ধি করত, তাহলে নিশ্চয়ই তারা নিজেদের মধ্যে আন্তঃসমন্বয় করে ছেলেমেয়েদের এই সুযোগটা দিত যেন তারা অন্তত পরীক্ষাগুলোতে অংশগ্রহণ করতে পারে। তারপরে তারা চাকরি পাবে কি পাবে না, সেটা পরের কথা। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব সুযোগ করে দেওয়া। এবং আমরা সমাজে যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন নেতৃত্ব দিচ্ছি, আমাদেরও দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মকে সুযোগ করে দেওয়া। আর ছেলেমেয়েদের দায়িত্ব তাদের মেধা ও দক্ষতার প্রকাশ ঘটানো। এখন মেধা এবং দক্ষতা প্রকাশ ঘটানোর জন্য আবার তাদের মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থার সুযোগ করে দিতে হবে। আমরা এখনও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সীমিত অবস্থানে আছি। তবে প্রচেষ্টা চলছে সরকারের পক্ষ থেকে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা, কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং এগুলোর চেষ্টা অব্যাহত আছে। আমরা আশা রাখি এবং মনে করি, তরুণ প্রজন্ম এই সুযোগগুলো সামনের দিনে নিতে পারবে।

সবচেয়ে বড় প্রয়োজন যেটি, শিশু বয়স থেকে তরুণ বয়স পর্যন্ত যে শিক্ষাব্যবস্থা, এর মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অক্ষুণ্ণ রাখাটা অত্যধিক জরুরি। এই মুহূর্তে যখন আমরা দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছি, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছি, দেখতে পাচ্ছি যে শারদীয় দুর্গা উৎসব নিয়ে সারাদেশে কী একটা বাজে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ দেশ ধর্মনিরপেক্ষ। এখানে প্রত্যেকে তার ধর্ম পালন করবে এবং ধর্মীয় উৎসবগুলো আমরা সবাই মিলেই পালন করি। কিন্তু ধর্মীয় উৎসব পালন করতে গিয়ে যদি কোনো সম্প্রদায় বাধার সম্মুখীন হয়, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিশোর বয়সের কিছু ছেলে বিভিন্ন মন্দিরে গিয়ে আক্রমণ করেছে। এগুলো আমরা বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে দেখেছি। এটি কী করে সম্ভব হয়েছে? সম্ভব হয়েছে কারণ তাদেরকে খুব সহজেই প্রলুব্ধ করা যায়। তারা নিজেরা তো অপরাধী নয় কিন্তু অপরাধীরা তাদেরকে অপরাধের দিকে ধাবিত করেছে। এবং তারা বুঝে বা না বুঝে হোক, অপরাধের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখানে আমরা যদি কারণ নির্ণয় করতে যাই যে সমাজে কী কারণে এ রকম অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে, তাহলে প্রথমেই দেখতে হবে এ দেশে শিক্ষাব্যবস্থা কেমন। একটি দেশকে ধ্বংস করতে হলে প্রথম যে কাজটি করার কথা অপরাধীরা বলে থাকে, সেটা হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করা।

শিক্ষাব্যবস্থা যদি ধ্বংস হয়ে যায় বা শিক্ষাব্যবস্থা যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেই সমাজ টিকে থাকতে পারে না। ঠিক একইভাবে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মাঝেও এমন কিছু কিছু জায়গা সৃষ্টি হয়েছে, যেগুলো বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে; যেখানে এমন কিছু মনমানসিকতার মানুষ তৈরি করা হচ্ছে, যারা দেশের এবং দশের কল্যাণের কথা চিন্তা করছে না।

আমরা রবীন্দ্রনাথের সেই কথাতেই ফিরে যেতে চাই, অন্তর মম বিকশিত করো। নিজের অন্তর যদি বিকশিত না হয় তাহলে যতই বিদ্যা অর্জন করা হোক, কোনো কাজ হবে না। এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কথাটা বলতেই প্রথমে যেটা আসে তা হচ্ছে মুক্তির চেতনা। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। সেই মুক্তির সংগ্রাম করে আমরা দেশকে মুক্ত করেছি। কিন্তু এখন নতুন প্রজন্মের কাজ হবে নিজেকে নিজের সীমাবদ্ধতা থেকে, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, ধর্মান্ধতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা। নিজেকে নৈতিক মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, নিজেকে সকল অন্ধকার ও সংকোচ থেকে মুক্ত করা। এই মুক্ত করার সংগ্রাম কিন্তু আমাদের প্রতিনিয়ত চালিয়ে যেতে হবে। এবং এই মুক্ত করার সংগ্রাম হলো আত্মমুক্তির সংগ্রাম। আত্মমুক্তির সংগ্রাম হলো আত্মশুদ্ধির সংগ্রাম। আত্মমুক্তি এবং আত্মশুদ্ধির সংগ্রাম ছাড়া কোনো প্রজন্ম কোনো দেশে সুশিক্ষিত হতে পারে না।

আমরা শিক্ষার অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা বলি, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলি, কিন্তু মানব কাঠামোর যে উন্নয়ন, সেই উন্নয়ন ছাড়া নৈতিক উন্নয়ন ছাড়া তরুণ প্রজন্ম সত্যিকার অর্থে ক্ষমতায়িত হওয়া এবং দেশের স্বার্থে নিজেরা নিজেদেরকে উন্নীত করা সেটি কিন্তু স্থায়ীভাবে করা যায় না। আওয়ামী যুবলীগের প্রথম যে বার্ষিক সম্মেলন হয়েছিল, সেখানে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আত্মশুদ্ধ যুবশক্তির উন্মেষ চাই। আত্মশুদ্ধ যুবশক্তির উন্মেষের আহ্বান জানিয়ে তিনি যুবসমাজের প্রতি আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম, আত্মবিশ্বাসের আহ্বান জানান। সাম্প্র্রদায়িকতাকে উৎখাত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি সেদিন। দেশের মানুষকে মুক্ত করার জন্য দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু আমরা নিজেদেরকে আত্মস্বার্থ সংকীর্ণতা এবং সাম্প্র্রদায়িকতা থেকে মুক্ত করতে পারছি কিনা সেটি আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে। কারাগারের রোজনামচায় ১৪ জুন ১৯৬৬ সালে  বঙ্গবন্ধু লিখেছিলেন পরশ্রীকাতরতা দুনিয়ার কোনো ভাষায় খুঁজে পাওয়া যাবে না একমাত্র বাংলা ভাষা ছাড়া। এটিই আমাদের চরিত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এই যে পরশ্রীকাতরতা থেকে মুক্ত থাকার উপায় হচ্ছে পরশ্রীকাতরবিহীন মানুষ সমাজে অবস্থান করার বাধ্যবাধকতা। তারা যদি আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে পারেন, তখন হয়তো আমরা এই পরশ্রীকাতরতা থেকে হিংসা-বিদ্বেষ, সংকীর্ণতা থেকে নতুন প্রজন্মকে দূরে রাখতে পারব। এখানে যে কথাটি বলার প্রয়োজন আছে এবং এটা শুধু সরকারের একার পক্ষে এই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়, শুধু শিক্ষকদের পক্ষে এই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। এই দায়িত্ব পালন করতে হবে প্রতিটি পরিবারের বাবা এবং মায়ের, অভিভাবকদের। এই শিশুরা প্রথম যে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে সেটি হচ্ছে গৃহ বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয়। পরিবার হচ্ছে একটি শিশুর প্রধান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সে আসবে কলেজে, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়। এই পরিবারের প্রধান শিক্ষক হচ্ছে বাবা এবং মা। এমন হতে পারে বাবা অথবা মা তেমন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অতটা শিক্ষিত নন। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বিষয় নয়। এখানে মূল্যবোধের শিক্ষা, সততার শিক্ষা। যদি তার বাবা-মা সৎ জীবনযাপন করেন, সেই সৎ জীবনযাপন দেখেই কিন্তু তার ছেলেমেয়েরা শিক্ষা গ্রহণ করবে। অর্থাৎ আমরা প্রত্যেকেই যারা আমাদের পরিবারে বাবা বা মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি আমরা নিজেরা যদি সৎ থাকি, যদি চরিত্রবান হই, যদি দেশকে ভালোবাসি, নিশ্চয়ই আমাদের নতুন প্রজন্ম এই শিক্ষাটা পাবে।

আমরা আমাদের দেশের নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও দেখি তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা, উৎকর্ষের প্রমাণ। আমি আমার শিক্ষকতার জীবনে দেখেছি, তরুণ প্রজন্মের মাঝে যে সৃষ্টিশীলতা আছে, যে উদ্দাম আছে, যে প্রত্যাশা তাদের মাঝে কাজ করে, তা যদি আমরা কিছুটা তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারি, দেখা যায় যে তারা বড় বড় অর্জন নিয়ে আসতে পারবে। আমাদের ছেলেমেয়েদের দেখেছি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলন যেমন গণিত সম্মেলন, রোবোটিক্স সম্মেলন, বিতর্ক সম্মেলন, বিজ্ঞান সম্মেলনে শুধু অংশগ্রহণ করেনি, তারা অর্জন করে নিয়ে এসেছে। কীভাবে করেছে? তাদের অনুপ্রেরণা দেওয়ার কারণে করেছে। তাদের অনুপ্রেরণা দেওয়ার দায়িত্ব আমরা যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিই। আমাদের দায়িত্ব ছেলেমেয়েদের অনুপ্রেরণা দেওয়া, অনুপ্রাণিত রাখা। অনুপ্রেরণা একটি শক্তি। আমি যেই আশার কথা বলেছিলাম, রবীন্দ্রনাথেরই কথা, সেই আশা তাদের মাঝে জেগে উঠবে যদি অনুপ্রেরণাটুকু তারা পায়। তারা অনুপ্রেরণা পেলে অনুপ্রাণিত হয়ে দেখা যাবে আমাদের প্রত্যাশাকে অতিক্রম করে নতুন নতুন আবিস্কারের সঙ্গে তারা নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারবে। তরুণ প্রজন্ম সবসময় সৃষ্টিশীল কাজ করে। তাদের মাঝে নিত্যনতুন আবিস্কারের প্রবণতা আমি লক্ষ্য করেছি। কিন্তু এগুলো একটা সময় গিয়ে অনেকটা শিথিল হয়ে যায়। কারণ তাদের সমাজের যে জায়গা থেকে যতটুকু অনুপ্রেরণা পাওয়া উচিত তারা পায় না। সে জায়গা থেকে কিছুটা ঘাটতি আছে। আমরা যারা প্রবীণ প্রজন্ম, আমরা অনেক সময় তরুণ প্রজন্মকে ছোট করে দেখার চেষ্টা করি। আমরা মনে করি যে আমরাই অনেক কিছু জানি, তারা তেমন কিছু জানে না। আমরা তাদের থেকে একটু দূরত্ব বজায় রাখি। যে কারণে তারা আমাদের থেকে একটু দূরে সরে গেলে অনুপ্রেরণার যে চক্র, সেটিও শিথিল হয়ে যায়। আমার মনে হয় যে আমাদের সবারই দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করা। আমরা যে সীমাবদ্ধতা নিয়ে বড় হয়েছি, তা ছাড়িয়ে যাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। কারণ তাদের মাঝে সম্ভাবনা আছে। বিশেষ করে করোনা-উত্তর যে পৃথিবী, এখানে আমাদের তরুণদের ওপর নির্ভর করতে হবে। কারণ করোনার মাঝে আমরা যে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এসেছি, করোনা- উত্তর পৃথিবী কিন্তু একেবারেই নতুন হবে। কাজেই এই নতুন পৃথিবীতে তরুণ প্রজন্মকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। তাই তাদের প্রস্তুত করতে হবে এবং তারাই দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে। এটিই আমি প্রত্যাশা করি।

লেখক
শিক্ষাবিদ
প্রাবন্ধিক

মন্তব্য করুন