১৯৭১ সাল। মাস জুলাই। রাত গভীর। সারাদিন আতঙ্কের ভেতরে বসবাস। রাতের অন্ধকারে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছি। নিদ্রাহীন চোখ। কান খাড়া করে রেখেছি। কোথাও কোনো শব্দ পাওয়া যায় কিনা। কোনো চিৎকার বা হুঙ্কার বা অট্টহাসি। আমি একা নই। আমি জানি সমস্ত পাড়াও ঠিক আমারই মতো অপেক্ষায়। অন্ধকারে জ্বলজ্বল চোখ নিয়ে বসে থাকা। সকালে যে খাদ্য আহার করেছি তা তখনও হজম হয়নি, রাতে যে খাদ্য আহার করেছি সেটিও গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে। খাটের নিচেই পা ঢাকা জুতো রাখা আছে। বিপদের সংকেতে যেন লাফ মেরে উঠে পায়ের জুতো পরে নিতে পারি। সেই জুতোর ভেতরে দুশো টাকা গুঁজে রাখা আছে। শুধু আমার নয়, বাড়িতে যত ভাইবোন এখন তাদের ঘরে ঘুমিয়ে আছে তাদের সকলের পায়ের কাছে রাখা আছে পা ঢাকা কালো জুতো। তার ভেতরে মোজা। আর মোজার ভেতরে কাগজের টাকা। জিন্নাহ সাহেবের ছবি আঁকা দুশ করে টাকা।

দুশ অনেক টাকা। মধ্যবিত্তের পালানোর জন্য যথেষ্ট।

কখন কোথা দিয়ে শত্রুর আক্রমণ ঘটবে আমরা কেউ জানিনে। কিন্তু পালানোর জন্য আমরা প্রস্তুত।

বুকের ভেতরে আমাদের, সকল বাঙালির তখন কাল-বিষাদ। এই বিষাদ বা বিষণ্ণতার কোনো পরিমাপ নেই। এই বিষাদ শুধু ঢেউয়ের মতো বুকের ভেতরে ওঠানামা করে।

আর গভীর অসহায় এক নিঃসঙ্গতা আমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে।

এই অবস্থায় দূরে, আবার যেন খুব দূরেও নয়, কাছে আবার যেন খুব কাছেও নয়, ফুটুস করে একটা আওয়াজ।

শব্দ শুনেই লাফ মেরে উঠে বসেন স্বামী। অন্ধকারে আমার মুখ দেখতে দেখতে ফিসফিসে গলায় বলেন, শুনেছো? শুনলে?

উত্তরে আমি বিছানায় উঠে বসি না, কিন্তু মুখে বলি, হ্যাঁ। আমাদের গেরিলা ভাই। আমাদের বাংলা মায়ের দামাল ছেলে। আমাদের ত্রাতা।

স্বামী বলেন, গত দু'দিন ওদের কোনো সাড়াশব্দ পাইনি, মনটা খুব খারাপ হয়েছিল, আজ আমার মনের মধ্যে সাহস হচ্ছে। ওরা পারবে। পারবে না?

আমার উত্তর, অবশ্যই পারবে!

কিন্তু আমার মনের মধ্যে দুরাশা। আর কবে পারবে? এদিকে আমরা যে আর বাঁচিনে। আজ সকালেও আমাদের সামনের রাস্তা থেকে দু'জন

যুবককে তুলে নিয়ে ট্রাকে করে চলে গেছে। আমার ঘরভর্তি ছোট ভাইবোন ও দেবর-ননদ। তাদের কেউ পালাতে পেরেছে, কেউ পারেনি।

সকলকে ঘরের ভেতরে ঠেসে আমি রেখে দিয়েছি।

এভাবে আগস্ট আসে, আসে সেপ্টেম্বর। আর আমাদের মনের মধ্যে বাড়তে থাকে সাহস। রোজ রাতে প্রার্থনা করি, কোথায় আমার গেরিলা ভাইয়েরা? নবীন, তরুণ মুক্তিযোদ্ধা? আমার বাংলা মায়ের অকুতোভয় সোনার ছেলেরা? যারা মরছে তবু মাথা নোয়ায় না।

এই ছিল আমাদের সেই '৭১।

অকুতোভয় তারুণ্যের অর্জন আমাদের এই সোনার স্বাধীনতা।

স্বাধীনতা আমাদের সোনার ফসল।

আর আমরা তাদের আত্মবিসর্জন ও আত্মাহুতির ফলে আজ গর্বিত মাথা তুলে স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের দাবিদার।

তারপর, তার কিছুদিন পর যেন রাষ্ট্রের বুকে নেমে এল ধস। চোখের সামনে তারুণ্যকে দেখলাম দুমড়ে-মুচড়ে, দলা পাকিয়ে নষ্ট হয়ে যেতে। হয়ে যেতে বিকৃত ও চরিত্রভ্রষ্ট। আর তরুণেরা যেদেশে নষ্ট, সেদেশে সবই নষ্ট। স্বাধীনতার মতো বিশাল এক অর্জনের পর দেশের তারুণ্য যেন পথ হারিয়ে ফেলল। চোরা পথে শুরু হলো তারুণ্যের পথচলা।

সদ্য অর্জিত স্বাধীনতা যেন পেন্ডুলামের মতো দোদুল্যমান।

নিজেদের ভেতরে হিংসা, হানাহানি, রক্তপাত, সন্দেহ, চোরাগুপ্তি মার, জাতির পিতাকে হনন, পিতার পরিবারকে হত্যা, দেশের গৌরবের সন্তানেরা জেলেখানায় হলেন বিলীন, লোভ ও রিরংশায় দেশ উঠল মেতে। বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে পায়ে দলন, মিথ্যাচার ও চরিত্র হনন। যেন এক মাৎসান্যায়।

বাংলা মায়ের গৌরবের আঙিনায় চরে বেড়াতে লাগল শকুন। বিবর্ণ শুস্ক পাতায় ঢেকে গেল বাংলার উঠোন।

কিন্তু না। হতাশার ধূসর পর্দা দুই হাতে ছিঁড়ে ফেলে আবার জেগে উঠল আমাদের বাংলা মায়ের নাড়িছেঁড়া ধন, আমাদের তরুণেরা। তারা মাথা তুলে দাঁড়াল। তারা সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াল রুখে। তারা বুকের রক্ত ফুটপাতে ঢেলে দিল এরশাদের চলার গতি রুদ্ধ করতে। তারা গড়ে তুলল সমতা, গড়ে তুলল মৈত্রী, তারা রুখে উঠল। তারা পতন ঘটালো সামরিকতন্ত্রের।

সুচারু নেতৃত্বে তারা পুনরুদ্ধার করল গণতন্ত্রের।

কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে থাকল না। জাতির পিতার ঘাতকদের রক্ষা করবার জন্য দেশে-বিদেশে শুরু হলো ষড়যন্ত্র।

এবারও রাজপথে নেমে এলো তরুণেরা।

শুরু হল অন্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযান। রাজধানীর শাহবাগ ঢেকে গেল যৌবনদীপ্ত তরুণদের পদচালনায়। তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরে জেগে উঠল শাহবাগ তথা সমগ্র দেশ ও জাতি।

অন্যায়ের বিচার হলো আবার সঠিক।

আর এগিয়ে চলল দেশ।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে এগিয়ে চলল দেশের কিশোর ও তরুণেরা।

কে বলে আমরা মৃত? কে বলে আমাদের তরুণেরা পথভ্রষ্ট? বরং যতবার বয়স্ক ও প্রবীণদের দ্বারা দেশ নিগৃহীত, লক্ষ্যভ্রষ্ট, বিপথে ও বেপথু ততবারই দেশের দামাল সন্তান তরুণেরা জাগ্রত হয়ে ওঠেন। অতীতেও এবং বর্তমানেও।

তারপরও তরুণদের সংকট যেন কাটে না। তারা তবুও বয়স্ক ও প্রবীণদের দ্বারা নিগৃহীত, তাড়িত, পীড়িত ও লক্ষভ্রষ্ট। এবং পথভ্রষ্টও।

পথভ্রষ্ট তারা বয়স্কদের হটকারী সব ব্যবস্থাপনায়।

একই রাষ্ট্রে তাদের জন্য ছেলেবেলা থেকেই চার প্রকারের শিক্ষাব্যবস্থা। যেন তারা বাল্যবয়স থেকেই হয়ে ওঠে হতবুদ্ধি ও হিংসুক। যেন তাদের ভেতরে ছেলেবেলা থেকেই গড়ে ওঠে হটকারী প্রভুত্ববোধ ও হীনম্মন্যতাবোধ। যেন তারা একজন আরেকজনকে ক্রমাগতভাবে ঘৃণা করতে শেখে, অবিশ্বাস করতে শেখে এবং শত্রুতাবোধে পীড়িত হয়, সেই ব্যবস্থা তাদের ছেলেবেলা থেকেই রাষ্ট্র গড়ে দিচ্ছে। ছেলেমেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থাই সমাজে চিহ্নিত করে চলেছে ধনী এবং নির্ধন, বোকা এবং চালাক, স্মার্ট এবং আলাভোলা। করে তুলছে তাদের ধর্মান্ধ ও কূপমণ্ডূক। করে তুলছে অসহিষ্ণু ও হিংস্র।

এ সবই হচ্ছে তাদের চতুর্বিধ শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য।

এর কোনো দিক নিশানা নেই। শুধু শেষমেশ গোবরের ঢিবিতে হুমড়ি খেয়ে পড়া ছাড়া। এবং ইংরেজি পড়ূয়াদের দেশ ত্যাগে সাহায্য করা ছাড়া। দেশের অধিকাংশ ইংরেজি পড়ূয়ার স্বর্গ এখন পশ্চিমে।

কারণ তাদের পেছনে যে বিশ হাজার টাকা প্রতি মাসে তাদের অভিভাবকেরা ব্যয় করেছেন তার যেন একটা সুরাহা হাতে পাওয়া যায়।

তারা গটগট করে হেঁটে চলে যায় বাংলা এবং আরবি পড়ূয়াদের করুণ এবং অসহায় চোখের দিকে তাকিয়ে। যেন পশ্চিমে যারা যায় তারা স্বর্গের টিকিট হাতে পেয়ে চলে যায়।

নিজের দেশটিকে কীভাবে ভালোবাসবে একজন তরুণ যদি তাদের পিতামাতার মনে দেশের প্রতি থাকে শুধু বাঁকা চাহনি এবং অশ্রদ্ধা? বরং তারা তো জানেই না যে তাদের এই তরুণ সন্তানটিকে পিতামাতা বড়শি হিসাবে মানুষ করে তোলে এই আশায় যে এই সন্তানের পিছু পিছুই ভবিষ্যতে বুড়ো বয়সে তাদেরও স্বর্গগমন ঘটবে। তারাও কানাডা বা আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার কবরে গিয়ে ভবিষ্যতে স্থায়ী হবে।

না, এসব কোনো বিদ্রূপের কথা নয়, এসবই হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে সত্য দেশ জাগরণের একই মন্ত্রে বলকে দীক্ষিত করা।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের দেশের ষোলো কোটি মানুষের ভেতরে প্রায় অর্ধেক মানুষ পনেরো বছরের নিচে। এই এতবড় এক গোষ্ঠীর সকলেই অচিরে তরুণ হবে বা তারুণ্যের দাবিদার হবে। যে দেশে তরুণের সংখ্যা এত বেশি সেই দেশের সম্ভাবনারও কোনো শেষ নেই। শুধু যে জিনিসটি দরকার সেটা হলো এইসব তরুণকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসা। দেশ জাগরণের একই মন্ত্রে সকলকে দীক্ষিত করা। কেউ যেন কারও চেয়ে নিজেকে ছোট বা অপাংক্তেয় মনে না করে। নিজের মাতৃভূমিকে ভালোবাসা যে জীবনে বেঁচে থাকবার জন্য দরকার এই বোধও তাদের ভেতরে জাগরিত করতে হবে। ছেলেবেলা থেকে যদি সুকুমার প্রবৃত্তিগুলোকে আমরা জাগ্রত না করি, তাহলে দেশের সংকটে এদের কোনো ইতিবাচক ভূমিকাই থাকবে না।

লেখক
কথাসাহিত্যিক
প্রাবন্ধিক

মন্তব্য করুন