জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়; বিশ্বের ইতিহাসেই এক নজিরবিহীন ঘটনা। ১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর জেলখানার অভ্যন্তরে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে হত্যা করা হয়। কিন্তু '৭৫-এর খুনিরা পৃথিবীর সব শুভ ও সুন্দর নজিরকে পদদলিত করে জেলহত্যা সংঘটিত করে।

আমরা ৭৫-এর ১৫ আগস্টকে অনেক সময় আকস্মিক ঘটনা বলে অভিহিত করি। এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক গবেষণা হয়েছে। তার পরও নির্দিষ্ট তারিখ দিয়ে বলা যাবে না- খুনিরা কখন এই পৈশাচিক হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল। অনেকে মনে করেন, ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের সময় থেকেই বঙ্গবন্ধুকে মোশতাক ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। মোশতাক যে বাংলাদেশ চায়নি- তা মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ে অনেকটা অনুধাবন করা যায়। ১৯৬৯ সালে ৬ দফার ভিত্তিতে নির্বাচনী মেনিফেস্টোর অর্থনৈতিক দিক পর্যালোচনা ও সেগুলোকে মেনিফেস্টোতে সন্নিবেশিত করার জন্য বঙ্গবন্ধু কয়েকজন অর্থনীতিবিদকে দিয়ে একটি স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠন করেন। ৬ দফার আলোকে খসড়া সংবিধান প্রণয়নও এ কমিটির কাজ ছিল। বঙ্গবন্ধু মাঝেমধ্যে এ কমিটির সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় অংশ নিতেন। অর্থনীতিবিদদের প্যানেলে ছিলেন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, আনিসুর রহমান ও রেহমান সোবহান এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খন্দকার মোশতাক আহমদ, তাজউদ্দীন আহমদ ও এএইচএম কামারুজ্জামান। ৬ দফার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ছিল স্বাধীনতার প্রায় কাছাকাছি এমন এক ধরনের স্বায়ত্তশাসন, যেখানে বাঙালিরা চাইলে যে কোনো সময়ে আলাদা হয়ে যেতে পারে বা পাকিস্তান সরকার স্বেচ্ছায় বাঙালিদের স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়। এসব বিষয়ে আলোচনাকালে মোশতাক এমন সব প্রশ্ন করতেন এবং এমন ব্যাখ্যা দাবি করতেন; টিমের সবার মধ্যে সন্দেহ দেখা দেয়।

মুক্তিযুদ্ধকালে মোশতাকের ভূমিকা সবারই জানা। তিনি গোপনে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। বিষয়টি তাজউদ্দীন আহমদের কাছে ধরা পড়ে। মোশতাক তখন আওয়ামী লীগের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের কিছু সদস্যকে তাজউদ্দীন আহমদের বিপক্ষে লাগিয়ে দেন। তারা তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। অথচ তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বিশ্বস্ত। তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে ছিলেন অনড়। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশ অবশ্যই স্বাধীন হবে এবং ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হবে। কিন্তু মোশতাক জাতীয় পরিষদ সদস্য জহিরুল কাইয়ুমকে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার জন্য নিযুক্ত করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝান- বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতার বিষয়ে ছাড় দিতে প্রস্তুত। এসব গোপন আলোচনার এক পর্যায়ে মোশতাক কলকাতায় মার্কিন দূতাবাসের রাজনৈতিক কর্মকর্তা পোলোফের সঙ্গে বাংলাদেশ মিশনে এক গোপন আলোচনায় বসেন। সেখানে মোশতাক বলেন, 'ইয়াহিয়া খান অত্যন্ত ভালো লোক এবং ইয়াহিয়া জানে যে, আমিও একজন ভালোমানুষ।' এই বক্তব্যের মাধ্যমে অনুধাবন করা যায়, মোশতাক বাংলাদেশের জন্য কত ক্ষতিকর ছিলেন!

মোশতাকের পাকিস্তানপ্রীতি যখন আর গোপন নেই, তখন তাকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর মোশতাককে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। অতঃপর মোশতাক প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন এবং ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসার পর তার কান ভারি করতে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেন মোশতাক। এ ক্ষেত্রে পথের কাঁটা তাজউদ্দীনকে দূরে সরিয়ে দেওয়াই ছিল মোশতাকের প্রথম কাজ। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাজউদ্দীনের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ ছিল অকৃত্রিম। এটি মোশতাক খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতেন। সে জন্য প্রথমে শুরু হয় তাজউদ্দীনকে সরানোর ষড়যন্ত্র।

ইতোমধ্যে বেশকিছু ঘটনা ঘটে। ১৯৭৩ সাল থেকেই বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ম্ফীতি ও খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এ সময়ে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন, তাই তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালে তাজউদ্দীন আহমদকে যেহেতু অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়, তাই যুক্তরাষ্ট্র বা বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে শর্তাধীন সাহায্য গ্রহণে তিনি ছিলেন অনীহ। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় আবেগ স্থায়ী নয়; সে বিষয়টিও তার না বোঝার কথা নয়। দেশে দুর্ভিক্ষাবস্থার প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তার কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু তারা পাকিস্তানের ঋণের একটি অংশ বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাকনামারা বাংলাদেশ সফরে আসেন। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের বিমানবন্দরে যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি যেতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তার পরিবর্তে পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল ইসলাম ম্যাকনামারাকে স্বাগত জানান। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে প্রদত্ত খাদ্য সহায়তার বিষয়টিকে বিলম্বিত করে। ফলে দুর্ভিক্ষাবস্থা আরও প্রকট রূপ নেয়। মোশতাক সম্ভবত এসব পরিস্থিতির সুযোগ নেয় এবং তাজউদ্দীন আহমদকে মন্ত্রিসভা থেকে সরে যেতে হয়। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই মোশতাকের রাস্তা পরিস্কার হয়ে যায়।

১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী গগ হুইটলেম বাংলাদেশ সফরে আসেন। তার সম্মানে একটি নৌভ্রমণের আয়োজন করা হয়। এই ভ্রমণে মন্ত্রিসভার মাত্র দু'জন সদস্য খন্দকার মোশতাক ও তাহের উদ্দীন ঠাকুর আমন্ত্রিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু এক পর্যায়ে জাহাজের ডেকের ওপর উঠে দেখতে পান, উপরিউক্ত দু'জন মন্ত্রী একান্তে কথা বলছেন। বঙ্গবন্ধু তখন সরাসরি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, সব সময়ে তারা এত কী ফিসফাস করেন বা গোপন কথাবার্তা বলেন? বঙ্গবন্ধু তাদের এটাও বুঝিয়ে দেন, তাদের এ চক্রান্ত বিষয়ে তিনি অবহিত। তার পরও তাদের বিরুদ্ধে কেন তিনি ব্যবস্থা নেননি, তা এখনও অজ্ঞাত। তবে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর চার নেতার ওপরে খুনি মোশতাক যেভাবে চাপ সৃষ্টি করেন, তাতে অন্য কয়েকজনের মতো তারা মন্ত্রিসভায় শপথ নিলে হয়তো তাদের জীবন রক্ষা পেত, কিন্তু এভাবে হয়তো অমর হয়ে থাকতে পারতেন না। বিশেষ করে তাজউদ্দীন আহমদের মনোকষ্ট থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার ভালোবাসাকে তিনি মৃত্যুর মাধ্যমে দেখিয়ে গেছেন।

শিক্ষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন