পেলের দেশে নেইমার এখন ত্রাতা রিডিমার

প্রকাশ: ১০ জুন ২০১৪      

রূপায়ণ ভট্টাচার্য রিও ডি জেনিরো, ব্রাজিল

এক একটা পাহাড় সমুদ্রের গায়ে গা লাগিয়ে এক এক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। যেন কিছু একটা বলতে চায়। দেখে মনে মনে এক একটির আলাদা আলাদা নাম দিয়ে দিতে বড়ো ইচ্ছে হয়_ পেলে, গ্যারিঞ্চা, জিকো, রোনালদো, রোমারিও।
সবুজ কিছু। কয়েকটা পাথুরে। ফুটবলারদের চরিত্রের মতো।
রিওর সবচেয়ে বিখ্যাত পাহাড়টি চিনির মণ্ডের মতো_ সুগারলোফ মাউন্টেন।
পাশাপাশি দুটো চূড়ায় সূর্যের আলো ঝলসায়। ব্রাজিলিয়ানরা ওদের বলেন, দুই ভাই।
মরো দোয়েস দা গায়েভা। সামান্য দূরে সমুদ্রের ধারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্রানাইট পাথরের পাহাড়_ ওটা পেদ্রা দা গায়েভা। একটু ভেতরে, শহরের মাঝে কোরকোভাদো পাহাড় ও জঙ্গল। তার চূড়াতেই বিশ্বের নতুন সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম, ৯৮ ফুট উঁচু যিশুমূর্তি_ ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার। এখানে বলে, ক্রিস্তো দে রিদিমার। সাদা। সূর্যের আলোয় সাদা। রাত বাড়লে সেটা ধ্রুবতারাসুলভ চিরকালীন হয়ে যায় হঠাৎ। ভোরের আলোয় শুকতারা।
শহরের সব আলো জ্বলে উঠলে রিওর সৌন্দর্যে সাম্বা তরুণীর কার্নিভালের পোশাকের সব রঙ উপচে ওঠে। মাথার ওপর রিডিমারের সাদা আলো। ঘোর। অদ্ভুত ঘোর। এ দৃশ্য স্পিলবার্গের কোনো ছবির নিখুঁত সেট থেকে উঠে এলো তো! ওই শ্বেতশুভ্র মূর্তিতে এখন ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ জার্সি পরিয়ে নেইমারের মুখ লাগিয়ে দিলে কেমন হয়? এক মাসের জন্য? মারাকানা স্টেডিয়ামের মিডিয়া সেন্টারে এক স্বেচ্ছাসেবককে বলায় হাসলেন_ 'কেউ আপত্তি করবে কি-না জানি না, আমি করব না। মাঝে মাঝে তো রঙ বদলায়ই।' বছর সাতেক আগে বিশ্বজুড়ে ভোট নেওয়া হয়েছিল নতুন সপ্তম আশ্চর্য বাছার জন্য। আমাদের তাজমহল, চীনের প্রাচীর, রোমের কলোসিয়াম, পেরুর মাচু-পিচু, জর্ডানের পেট্রা, মেক্সিকোর চিচেন ইতসার সঙ্গে সপ্তম আশ্চর্য হয় এ মূর্তিও। ওই সময়টায় শুনলাম, ব্রাজিলিয়ানদের প্রিয় সংখ্যা ছিল ৪৯১৬। ফোনে ওই নম্বর করলেই যিশুমূর্তি একটা করে ভোট পেত। শুনলাম, কোপাকাবানা সৈকতের ওপর দিয়ে বিমানও উড়ে যেত বার্তা নিয়ে, '৪৯১৬ ভোট ফর ক্রিস্তো'।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে সে ধরনের কোনো বার্তা গায়ে লিখে কোনো বিমান কি উড়বে? তখন ৪৯১৬ সবচেয়ে আলোচিত অক্ষর হলে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় শব্দ '৬'। মানে ব্রাজিলিয়ানরা বলেন 'হেক্সা'। ছয় নম্বর বিশ্বকাপটা চাই যে! রিওর রাস্তায় এখন সবুজ-হলুদ পতাকা বাঁশের কঞ্চির ওপরে লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ট্যাক্সি। সারারাত ধরে জেগে থাকা কোপাকাবানা সৈকতে ফ্যান ফেস্টিভালের মঞ্চ তৈরি হচ্ছে। বাঙালিদের মতো ঢিলেঢালা ব্যাপার আছে ব্রাজিলিয়ানদের। মঞ্চ যথারীতি মাঝপথে। চলার রাস্তায় কত রকম ব্রাজিল জার্সি। জাতীয় দলের রঙে কত জিনিস! ব্যান্ড বাজিয়ে পয়সা তুলছে যে লোক, তার বাদ্যযন্ত্রেও জাতীয় পতাকার হলদে-সবুজে রঙ। রাত ৮টায় সৈকতে বিচ ভলিবল খেলতে ব্যস্ত ছেলেটির গায়েও নেইমারের জার্সি। ট্যাক্সিতে শহর চক্কর দিতে দিতে দশ নম্বর ছাড়া কোনো জার্সিই তো দেখলাম না! দোকানে হলুদ রঙের ভুভুজেলার পাশে বছর দুয়েকের ছেলের জন্য নেইমারের জার্সিটিও রয়েছে! ছয় নম্বর বিশ্বকাপ 'হেক্সা' মিললে এ দেশে অন্তত নেইমার বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য হয়ে দাঁড়াবেন!
আমাদের ট্যাক্সি-ড্রাইভার লিওর পছন্দ নয় নেইমারকে। লিও মানে তো লিওনেল মেসি? মজা করলে ব্রাজিলিয়ান প্রতিবাদ করেন, 'না লিও মানে লিওনার্দো। ব্রাজিল। এসি মিলান।' তার সাফ কথা, 'ধুর, নেইমারের চেয়ে অনেক কার্যকর ফ্রেড। তার পর ডেভিড লুইস। উইলিয়ান কী চমৎকার খেলল আগের ম্যাচে।' কে শুনবে তার কথা? দোকানের টিভিতে নেইমারের ইন্টারভিউ চলছে। লোকে শপিং ফেলে সেদিকে তাকিয়ে। আমাদের এখানে যেমন 'ইন্ডিয়া' এবং 'ভারত' দুটো আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে, এ দেশেও যেন 'ব্রাজিল' এবং 'ব্রাসিল' দুটো শব্দ আলাদা করে চিনিয়ে দিচ্ছে দেশ। গরিব ও বড়লোকের আশ্চর্য সহাবস্থান এই রিও। বহুতলের মধ্যে উঁকি মারে ফাবেলা। পাহাড়ে ফাবেলা। লেকের ধারে ফাবেলা। শহরের দুটো বিখ্যাত ক্লাবের একটা ফ্ল্যামেঙ্গো গরিবদের, অন্যটা (ফ্লুমিনেন্স) ধনীদের। আকাশ থেকে বিমান নামার সময় মাইলের পর মাইল 'ফাবেলা' (বস্তির পর্তুগিজ সংস্করণ) দেখলে রক্ত হিম হয়ে যায়! ওহ, এর কাছে তো মুম্বাইয়ের কুখ্যাত ধারাভিও শিশু! বিকেলের রিওর আকাশের রঙ বিশ্বকাপের ব্রাজুকা বলের মতো কোনো রঙ নেই সেখানে? সব, সব, সব আছে। কিন্তু সেই রঙ দেখার আনন্দও চাপা পড়ে যায় ফাবেলার পর ফাবেলা দেখে। রিও যতই তিনটে বিমানবন্দর থাক, আন্তর্জাতিকটি কলকাতার নিরিখেও বেশ ছোট। কলকাতার মতোই মহানগরের উত্তরে। উত্তর ছাড়িয়ে দক্ষিণের দিকে যেতে গেলে শহরের ভূগোল পাল্টে যেতে থাকে দ্রুত। দক্ষিণ রিওর রাস্তাঘাটে ইউরোপিয়ান আভিজাত্য বেশি। তবে মহানগরের বৃহত্তম ফাবেলা 'রোচিনহা' দক্ষিণেই। বেশ অভিজাত এলাকা সাও কনরাদোর গায়েই। সর্বত্র মিল দেখলাম দুটো। ফাবেলার মধ্যে উঠে পড়েছে বহুতল বা বহুতলের মধ্যে উঠে পড়েছে ফাবেলা এবং লম্বা বাড়িগুলোয় ঝুলতে শুরু করে দিয়েছে জাতীয় পতাকা। কাপড়ের কোথাও, কোথাও কাগজের।
এসব দেখতে দেখতে জানতে ইচ্ছা করে, বিশ্বখ্যাত বাঙালি ভূপর্যটক কর্নেল সুরেশ বিশ্বাস যে ব্রাজিলের সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে নদিয়ার পাততাড়ি গুটিয়ে এখানে সংসার পেতেছিলেন, সেটা আসলে কোন রিও? হিসাব বলছে, ১০৯ বছর আগে এ শহরেই দেহ রেখেছেন নদিয়ার নাথপুর গ্রামের কর্নেল_ ডাক্তার। তার মানে সুরেশবাবু বিশ্বখ্যাত ক্রিস্তো দে রিদিমার মূর্তিও দেখে যাননি, এত এত ফাবেলাও না! এই যে পদে পদে ড্রাইভার সতর্ক করে দিচ্ছেন_ 'রাস্তায় একা একা বেশি জিনিস নিয়ে ঘুরবেন না, তা কি কর্নেল বিশ্বাস ভাবতে পেরেছিলেন? নিরাপত্তার অভাব? রাতেও পার্কে বসে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, প্রেমিক-প্রেমিকা। আধো অন্ধকারে নির্জন রাস্তায় কত লোক যে হেঁটে যাচ্ছে। বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামের রাতের রঙ এখন ব্রাজুকা বলের মতো রঙিন। ইডেন বা ওয়াংখেড়ের মতোই স্টেডিয়ামটা শহরের একেবারে ভেতরে। সেখানেও গেটের মুখে দিব্যি স্কেট করে বেড়াচ্ছে শিশুর দল। জগিংয়ে ব্যস্ত মাঝবয়সী। হাত ধরাধরি করে হাঁটছে যুগলে। বুয়েন্স আইরেস থেকে আসা, ম্যারাডোনা-ভক্ত ড্যানিয়েল মারাডোনা সেজে মারাকানার প্রধান গেটে ড্রিবলিং করে যাচ্ছেন আনমনে। ব্রাজিলিয়ানরা অবাক বিস্ময়ে ভিড় করছে, 'ম্যারাডোনা'? সামান্য বাদে, রাত সাড়ে ৯টায় শহরের একটা জমজমাট জায়গা 'পালা'য় গিয়ে দেখি, মানুষের ঢল রেস্তোরাঁ থেকে নেমে এসেছে ফুটপাত সংলগ্ন রাস্তায়। গানের দলের একটি তরুণী আপ্রাণ আওয়াজে বিউগল বাজিয়ে যাচ্ছে। ওদিকে বিক্রি চলছে পপকর্ন ভাজা। দুটি জিনিস ওই মেলা মেলা পরিবেশে ঠিকই রয়েছে। এক, ছেঁড়া পোশাকের কিছু সিগারেট বিক্রেতা বা ভিখিরি। দুই, সে-জাতীয় পতাকা। মোড়ের মাথায় বিশাল দুটো পতাকাকে টানিয়ে দিয়েছে কেউ। উড়ছে হাওয়ায়। রাতের আলোয় আরও মায়াবী দেখাচ্ছে।
এই শহরেই ছড়ানো রোনাল্ডো, রোমারিও, জিকো, আলবার্তো তোরেসদের জন্মচিহ্ন। এখান থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে পাও গ্রান্দে গ্রামে এক কবরখানায় গ্যারিঞ্চার কবরের কাছে লেখা_ 'ও ছিল শিশুর মতো। পাখিদের সঙ্গে কথা বলত। তুমি বিশ্বকে হাসিয়েছ, এখন সবাইকে কাঁদালে।' এক চোখে হাসি, এক চোখে জল নিয়েই বিশ্বকাপের অপেক্ষায় ব্রাজিল ও ব্রাসিল। হাসিটা ফুটবলের জন্য, কান্না হাসপাতাল, স্কুল, পরিকাঠামোর জন্য। ফুটবলারদের বাদ দিলে রিওর আরেক নামি ব্যক্তিত্বকে এক ডাকে চেনে সারাবিশ্ব। লেখক পাওলো কোয়েলহো। পেলের মতোই বিদেশে বেশি থাকেন বলে আম ব্রাজিলিয়ানের তাকে পছন্দ নয়; কিন্তু বই বিক্রিতে তিনি 'পেলে'র সমান। তার 'দ্য অ্যালকেমিস্ট' ছাপা হয়েছে ৮০টি ভাষায়। তার সাম্প্রতিকতম হিট বুক 'ম্যানুসক্রিপ্ট ফাউন্ড ইন আক্রা'তে কোয়েলহো একটা পর্বের শুরুতে লিখেছেন, 'যখন সব কিছু কালো দেখায়, আমাদের তখন স্পিরিট বাড়িয়ে তোলা দরকার। চলুন, আমরা সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলি। 'ফ্ল্যামেঙ্গো-বোতাফোগোর রিও, কোপাকাবানা-মারাকানার রিও, সুরেশ বিশ্বাসের রিও বিশ্বকাপের মুখে এখন সে সৌন্দর্যের কথা বলতে চাইছে। ফুটবলের গানে ব্যর্থতার অজুহাতের কোনো স্বরলিপি লিখতে চায় না।
নেইমার একবার শুধু রিদিমারের মতো অষ্টম আশ্চর্য হয়ে দেখা দিন! ফুটবল উৎসব থেকে দূরে রিওতে নিস্তব্ধ দুপুর। রোববার প্রথম পাতার পর।
হএই সময় থেকে