ক্রাইস্টচার্চে ব্ল্যাক ফ্রাইডে

ভয়াবহ, বীভৎস...

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০১৯     আপডেট: ১৬ মার্চ ২০১৯      

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ভয়াবহ, বীভৎস...

আল নূর মসজিদে বন্দুকধারীর হামলার নৃশংসতা দেখে হ্যাগলি ওভালে ফেরার পথে তামিম-মিরাজদের চেহারাগুলোই বলে দিচ্ছিল মানসিক ধাক্কাটা তাদের জন্য কত প্রবল - টুইটার

এ যেন পাখি শিকার; ট্রিগারে একের পর এক চাপ পড়ছে আর গুলি বিদীর্ণ হয়ে ঢলে পড়ছে একেকটি দেহ। কিংবা এ যেন নিশানাভেদের খেলাও; মুহূর্তেই এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে মানুষ নামের রক্ত-মাংসের শরীরটুকুন!

কিছু মানুষ নিশ্চল পড়ে আছে মাটিতে, কিছু মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি করছে দিজ্ঞ্বিদিক। কারওবা আবার প্রাণ থাকলেও নড়ার ক্ষমতা নেই, শরীর থেকে আলগা হয়ে যাচ্ছে হাতখানা ...।

ভয়াবহ, বীভৎস এই দৃশ্যগুলো এতদিন ছিল সিনেমা আর ভিডিও গেমসের জগতে। কিন্তু কল্পনার জগতটি নিষ্ঠুর বাস্তবতা হয়ে দেখা দিল তামিম ইকবালদের সামনে। শনিবার শুরু সিরিজের শেষ টেস্ট, গোটা বাংলাদেশ দল তাই হ্যাগলি ওভালে গিয়েছিলেন অনুশীলনে। সেখান থেকে মধ্য ক্রাইস্টচার্চের আল-নূর মসজিদে জুমা পড়তে এসেই মুখোমুখি হলেন মরণ খেলার। তামিমরা ছিলেন ১৭ জন। মসজিদ প্রাঙ্গণে পৌঁছে গাড়িতে বসে থাকতে থাকতেই দেখলেন জীবন-মরণের ভয়াবহ ওই খেলা! যে খেলায় তামিমরাও একেকটি লক্ষ্য, একেকজন শিকার! সামনে-পেছনে, চারপাশে থাকা প্রতিটি মানুষই শিকার, একজন মাত্র ঘাতক। আল-নূর মসজিদের অভ্যন্তর আর প্রাঙ্গণ তখন সাক্ষাৎ এক মৃত্যুপুরী। যে কোনো মুহূর্তে ধেয়ে আসা একটি বুলেটই জীবনাবসান ঘটিয়ে দিতে পারে। সবারই শ্বাস-প্রশ্বাস আটকে যাওয়ার মতো অবস্থা। এভাবে মৃত্যুর অতলে তলিয়ে যাওয়া যখন ক্ষণিকের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, তখন আর কী করার থাকে শিকারের? কাচ ভেদ করে বাসের ভেতর গুলি ঢুকতে পারে বলে একটি কাজই করার ছিল- ঘাড় গুঁজে মাথা নিচু করে থাকা, ঘাতক যেন দেখতে না পায়। তামিম-মুশফিকরা সেটাই করলেন। কিন্তু কতক্ষণ? গোলাগুলি তো অবিরাম চলছেই। এক সেকেন্ড, ১০ সেকেন্ড, এক মিনিট, দুই মিনিট...। ঘাড় গুঁজে হয়তো থাকা যাচ্ছে, কিন্তু ঘাতক যদি টের পেয়ে এখানেই হামলা করে বসে, তাহলে তো পরিস্থিতি আরও গুরুতর হবে। এর মধ্যে কিছু খেলোয়াড় কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন। কেউ কেউ হতবিহ্বল; কী করবেন, কী বলবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। এরই মধ্যে কেউ একজন বললেন, এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। থাকলে বিপদ, বের হতে পারলে নিরাপদ হতে পারে। তার কথায় সম্মতি দিলেন বাকিরাও। আট-নয় মিনিটের মতো গাড়িতে অবরুদ্ধ থাকার পর বেরিয়ে এলেন বাইরে। ছুটলেন পেছনের গেট দিয়ে। পড়িমরি করে দৌড় লাগালেন মৃত্যুপুরী থেকে দূরে সরতে। জায়গাটা বেশ চেনা। মূল রাস্তা না ধরে তামিমরা ছুটলেন হ্যাগলি পার্কের ভেতর দিয়ে। চোখেমুখে তখনও ভীষণ আতঙ্ক। মুশফিক কাঁদছেন, শরীর ভেঙে পড়ছে তামিমের। বুক ধুকপুক করছে সবারই। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলেন সবাই হ্যাগলি ওভালের ড্রেসিংরুমে। পরে সেখান থেকে গেলেন টিম হোটেলে। ততক্ষণে মিডিয়ার মাধ্যমে সারাবিশ্বে পৌঁছে গেছে ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলার কথা। স্বজন আর দেশের জনগণকে আশ্বস্ত করতে তামিম দ্বারস্থ হলেন টুইটের, 'গোলাগুলি থেকে আমরা পুরো দলই রক্ষা পেয়েছি। খুবই ভীতিকর অভিজ্ঞতা। সবাই আমাদের জন্য মঙ্গল কামনা করবেন।' ক্রিকেটারদের সবাই স্বজনদের ফোন করে জানালেন নিরাপদে থাকার কথা। তবে পরিস্থিতির ভয়াবহতা কাটিয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারছিলেন না কেউই। কী ভয়ানক পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফিরেছেন, সে কথা শোনা গেল খালেদ মাসুদ পাইলটের মুখে। বাসের মধ্যে থাকা সেই আট-নয় মিনিটের রুদ্ধশ্বাস বর্ণনা দিয়ে গিয়ে ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা সাবেক এই অধিনায়ক বলেন, 'আমি খেলোয়াড়দের দেখেছি বাসের মধ্যে অনেকেই কান্নাকাটি করছি। কী করতে পারে, কীভাবে কী করলে এখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। খুবই কঠিন সময় ছিল ওটা। সবার ওপরই মানসিক প্রভাব ফেলে। যে কোনো মানুষেরই ভেঙে পড়ার কথা।'