মুগ্ধতা ছড়ানো মুগ্ধর কথা

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০১৯

দীপায়ন অর্ণব

গত ৮ মার্চের কথা। মিরপুর শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আবাহনীর মুখোমুখি বিকেএসপি। প্রিমিয়ার লীগের নবাগত এই দলটির বেশিরভাগ ক্রিকেটারের বয়স সতেরো-আঠারোর মধ্যে। এহেন কিশোরদের নিয়ে গড়া একটি দলকে সামলানো একটু কঠিন তো বটেই। মিরপুরের ম্যাচটা শেষ হওয়ার পরই যেমন কোচ মতিউর রহমানকে ধরে বসলেন একাদশের বাইরে থাকা এক পেসার। পরের ম্যাচে যেন তাকে খেলানো হয়, সেটাই দাবি তার। সুযোগ পেলে কি কি করবেন, সেটার ফিরিস্তিও দিলেন কোচকে। অনেক জোরে একটানা বল করে যাবেন, আক্রমণাত্মক থাকবেন- আরও নানা কিছু। কোচ কী ভাবলেন কে জানে। তবে গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্সের বিপক্ষে পরের ম্যাচটায় মাঠে নামিয়ে দিলেন সেই পেসারকে। ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে পথচলা শুরু হলো মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধর।

বিকেএসপি দলের যে চারজন ক্রিকেটার চলমান এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন, তার একজন মুগ্ধ। রংপুরের ছেলে মুগ্ধ পরীক্ষার ফাঁকে ফাঁকেই খেলেছেন ৬টি ম্যাচ। সেই ৬ ম্যাচে ৫১.২ ওভার বল করে ৩৩.৬২ গড় এবং ৫.২৪ ইকোনমিতে পেয়েছেন ৮ উইকেট। এমনিতে খুব আহামরি পরিসংখ্যান নয়। তবে মুগ্ধ মূলত নজর কেড়েছেন তার গতি দিয়ে। 'অনেক জোরে একটানা বল করে যাওয়া'কে এমনিতে কথার কথা মনে হতে পারে। তবে বিকেএসপির কোচেরা জানেন মুগ্ধর ক্ষেত্রে এটি অতিকথন নয়। এমনকি লীগে তার গতিময় বোলিং আলাদা করে চোখে পড়েছে জাতীয় দলের নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন এবং স্বনামধন্য কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের।

মুঠোফোনের আলাপচারিতায় সেই প্রসঙ্গ তুলতেই অবশ্য মুগ্ধ জানালেন, এবারের লীগে নাকি ঠিক পুরোদমে বোলিংটা করতে পারেননি, 'আমি আসলে নিজের সর্বোচ্চটা দিতে পারছি না কুঁচকির একটা চোটের কারণে। প্রায় তিন মাসে আগে চোটটা পেয়েছিলাম, এখনও পুরোপুরি সারেনি। ফিজিও বলেছেন, খুব একটা সমস্যা নেই। তবে নিজের মধ্যে একটা ভয় কাজ করে। শুধু এইচএসসি পরীক্ষাই নয়, প্রিমিয়ার লীগের সব ম্যাচ না খেলার পেছনে এই চোটও একটা কারণ। কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছি না আসলে।'

ঝুঁকি নিতে চাইছেন না বটে, তবে খেলার মাঠে গতির সঙ্গে আপসও করেননি খুব একটা। একে তো বয়স কম, তার ওপর প্রথমবারের মতো প্রিমিয়ার লীগের মতো মঞ্চে নামা, জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের অনেককে প্রতিপক্ষ দলে পাওয়া- সব মিলিয়ে মুগ্ধর সামনে তো খুলে গেছে রোমাঞ্চকর এক জগতের দরজা! বললেন, 'আমি যে পর্যায়ের ক্রিকেট খেলতাম, তার চেয়ে প্রিমিয়ার লীগ অনেক গতিশীল একটা টুর্নামেন্ট। আমার কাছে তো অবশ্যই অনেক বড় মঞ্চ, জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের সঙ্গে খেলতে পারছি। চোটটা না থাকলে হয়তো আরও ভালো করতে পারতাম, আরও জোরে বল করতে পারতাম। তবে এখন পর্যন্ত যা হয়েছে তাতে আমি খুশি। নাসির (হোসেন) ভাই, সোহান (নুরুল হাসান) ভাইয়েরা আমার বোলিংয়ের প্রশংসা করেছেন। এটা আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার।'

২০১৬ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের বিপক্ষে দুটি ম্যাচ খেলেছিলেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি, তবে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটায় দারুণ বোলিংয়ে পেয়েছিলেন তিন উইকেট। মুগ্ধর মতে, সেই টুর্নামেন্ট থেকে শিখতে পেরেছেন অনেক কিছু। আর এই পর্যায়ে আসার পথে যা শিখেছেন তার জন্য কৃতিত্ব দিলেন বিকেএসপির কোচদের, যাদের পরামর্শেই একদিন ব্যাটসম্যান থেকে পেসার হওয়ার পথে পা বাড়িয়েছিলেন, '২০১২ সালে রংপুরে বিকেএসপির একটা ট্রায়াল হয়েছিল। সেই ট্রায়ালে ভালোই ব্যাটিং করেছিলাম। কিছুদিন পর এক মাসের ক্যাম্পে ডাক পাই। ব্যাটিংটাই করতাম। কিন্তু আমার ৬ ফিট ১ ইঞ্চি উচ্চতা দেখে রুশো স্যার (আখিনুজ্জামান রুশো) আমাকে পেস বোলিং করতে বললেন। এরপর তিনিই আমাকে গাইড করেছেন। গতির ওপর খুব জোর দিতেন তিনি। মতি স্যারও নানান সময়ে অনেক কিছু শিখিয়েছেন।'

অন্য সব উঠতি ক্রিকেটারের মতো মুগ্ধও স্বপ্ন দেখেন জাতীয় দলের জার্সি পরার। সেই স্বপ্নের অনুপ্রেরণা হিসেবে যেমন কোচ এবং সিনিয়রদের প্রশংসাবাক্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে বাবার বলা কয়েকটি কথাও, 'মিরপুর মাঠে প্রথম যেদিন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ঢুকেছিলাম, সেদিনই মনে মনে বলেছিলাম যে, এই মাঠে একদিন আমি জাতীয় দলের জার্সি গায়ে নামবো। মাঝে যখন চোটের কারণে বেশ কিছুদিন বাইরে ছিলাম, সে সময় বাবা অনেক ভাবে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ওই সময়টায় আমার বাবাকে প্রতিবেশীরা আমার নাম করে অনেক টিটকিরি কাটতো। আমার ক্যারিয়ার নাকি শেষ হয়ে গেছে, এমন কথাও বলত। বাবা আমাকে কেবল বলেছিলেন, আমরা দিন এনে দিন খাওয়া পরিবারের মানুষ। তোমার স্বপ্ন সত্যি করতে অনেক পরিশ্রম করছি। এই পরিশ্রমটা বৃথা যেতে দিও না।'

মুগ্ধর দেখা স্বপ্নটা যে সত্যি হবে, সে ব্যাপারে খুব একটা সংশয় নেই বিকেএসপির কোচ মতিউর রহমানের। তবে অভিজ্ঞ এই কোচের খানিক শঙ্কা শিষ্যের চোটটা নিয়েই। বললেন, 'মুগ্ধ বোলার হিসেবে অসাধারণ। ১৪০ এর আশপাশে গতিটা ওর সবচেয়ে বড় শক্তি। সুইং বলি বা ভেরিয়েশন, এগুলো না হয় কোচেরা শিখিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু গতি তো প্রকৃতি প্রদত্ত ব্যাপার। এটা ওর মধ্যে আছে। তবে ওই চোটটা সারানো আসলে খুবই দরকার। ও বলেছে, বোলিং করার সময় চোটের জায়গাটায় খোঁচার মতো অনুভূত হয়। এ নিয়ে ফিজিওদের সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে। তারা ঠিক বুঝতে পারছেন না এটা স্নায়ুর কোনো সমস্যা কি-না। আর এই বয়সে যেটা হয়, সবসময় শুধু খেলতে চায়, জোরে বোলিং করতে চায়। আমি ওকে অনেকবারই বলেছি, এত বেশি বল করার দরকার নেই। কিন্তু বয়সটাই তো এমন! এই চোটটা যদি সেরে যায়, আমি শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, ও একদিন বাংলাদেশ দলে খেলবে এবং অনেক দিন খেলবে।'