রানের ক্ষুধায় তামিম

আজকের খেলা

প্রকাশ: ১১ জুন ২০১৯

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ব্রিস্টল থেকে

একটা তাড়না, ভেতরে একটা স্বতোচ্ছল অশান্ত ঢেউ- সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাকে। আয়নায় দেখা নিজের ছবিটাই তাকে যেন সারাক্ষণ বলে যাচ্ছে, এই তুমি সেই তুমি নও...! তাই 'সেই তুমি'কেই খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তামিম ইকবাল। সবাই যখন কার্ডিফ থেকে এসে হোটেল রুমের চাবি বুঝে নিয়েছেন, তখন লবিতে ব্যাগ রেখেই বৃষ্টি মাথায় তামিম ছুটেছেন ব্রিস্টলের ইনডোরে। কিন্তু তাতে তেষ্টা মেটেনি তার। 'এভাবে ইনডোরে প্র্যাকটিস করাটা আমার কখনোই ভালো লাগে না। কিন্তু কী আর করব, বসে থাকতে পারছি না।' গতকালও সবার আগে এসে সেন্টার উইকেটে গেছেন হেলমেট পরে। সবাই যখন স্ট্রেচিংয়ের আগে ফুটবল খেলে মজা করছেন তখন ওই সেন্টার উইকেটে নেইল ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে ভীষণ সিরিয়াস তামিম। রান করার রাক্ষুসে খিদেটা তাকে পাগল করে তুলেছে। তিন ম্যাচে মাত্র ৫৯! তামিম জানেন, এটা মোটেই তার পাসওয়ার্ড নয়।

হয়তো এখনই ফেসবুক দেয়ালে তার নাম ওঠেনি। কিন্তু কানাঘুষাও তো চলছে- গতবছরের সেরা গড়ের ওপেনারের বিশ্বকাপে একি হাল? নিজের মধ্যে ডুবে থাকলেও তামিম জানেন তা। 'জানি, আমার কাছে অনেক প্রত্যাশা দলের। কিন্তু আমি সব সময় একটা জিনিস বলি, তা হলো, কোনো কিছু ঠিকঠাক না হলে আপনি শুধু চেষ্টাই করতে পারবেন। প্র্যাকটিস আর প্র্যাকটিসই করতে পারবেন। এরপর সময়ই বলে দেবে আপনি ভালো খেলবেন না খারাপ। এমনও হতে পারে, আপনি যা চিন্তা করছেন তার চেয়েও ভালো কিছু হচ্ছে। যেটা আমার সঙ্গে হয়েছেও। আসলে ধৈর্য ধরতে হবে। বিশ্বকাপের কারণেই হয়তো আমাদের ধৈর্যটা কম হয়ে যায়। আমাদের সবাইকেই ধৈর্য ধরতে হবে। সেটা শুধু আমার প্রতি না, দলের কোনো নির্দিষ্ট ক্রিকেটারের প্রতিও না, পুরো দলের প্রতি। চেষ্টা সবাই করে যাচ্ছে। আমিও করছি। অনেক সময় চেষ্টা করেও হয় না। তবে আমার পক্ষ থেকে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখছি না। আমার বিশ্বাস, পরিশ্রম আর চেষ্টা করলে ভালো কিছু হবেই।'

ব্রিস্টলের পড়ন্ত রোদে কোনো দার্শনিকের মতোই শোনাল তামিমকে! তবে তিনি বাস্তবিক। মোবাইলে ইনডোর সেশন ভিডিও করতে দিয়েছিলেন দলের অপারেশন্স ম্যানেজার সাব্বির খানকে। থ্রোয়ার বুলবুলকে বলেছিলেন গুনে গুনে একশ'টি থ্রো করতে! 'তামিমকে এই ভিডিওটি পাঠাতে হবে। রাতে সে এই সবটুকু দেখবে। আসলে সে রান করার জন্য ছটফট করছে। পেস বোলিংয়ের সামনে ওর কোথায় ভুল হচ্ছে। সেটি সে নিজেই বুঝতে পেরেছে।' সাব্বির খানের পাঠানো ওই ভিডিওটি দেখে গতকালও নেটে ম্যাকেঞ্জিকে নিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা অনুশীলন করেছেন। বুকসমান ধেয়ে আসা বাউন্সারগুলোতে সমস্যা হচ্ছে তামিমের। সে কারণে থ্রোয়ারকে দিয়ে ক্রিজের মাঝ বরাবর জায়গা থেকেই থ্রো করতে বলছেন। পুল খেলতে গিয়ে ক্যাচ উঠে যাচ্ছে তার। সেটি শুধরে নিতেও এদিন বেশ কয়েকবার ওই শটটিই খেলতে দেখা যায় তাকে। 'ব্যাড প্যাচ থাকলে নেটে বেশি বেশি সময় দিতে হয়। বেশি বেশি প্র্যাকটিস করতে হয়। আমি এখন সেটাই করছি। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে সবাই ভালো খেলতে চায়। আমিও চাই। মানুষের অনেক প্রত্যাশা আমাকে ঘিরে। অনেক সময় চেষ্টা করেও হয় না। কিন্তু তার পরও চেষ্টা তো করতেই হবে। ম্যাচে যে ভুলগুলো হচ্ছে, সেটা কমিয়ে যদি ভালো একটা শুরু করতে পারি তাহলে দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।' এতটা জেদি ও পরিশ্রমী তামিমকে শেষবার কবে দেখা গেছে ক্রিকেট ফলো করা অনেকেই তা মনে করতে পারলেন না। দলের মধ্যে সবচেয়ে যিনি অনুশীলন করে থাকেন সেই মুশফিকও যেন হার মেনেছেন তামিমের কাছে। 'সব ঠিক আছে ? ওই শটগুলো কি খেলেছিলি?' নেট থেকে বেরিয়ে আসা মুশফিকও তামিমের কাঁধে হাত দিয়ে যেন ভরসা দিচ্ছিলেন। মাশরাফিও চাচ্ছিলেন, তামিমের এই চেষ্টার সঙ্গে একটু যদি 'ভাগ্য' যোগ হয়, তাহলেই তামিম খুঁজে পাবেন সেই আগের তামিমকে।