লাল-সবুজ এক বোধ, এক মনন। তার সঙ্গে অনেক অনুভূতি। বেঁচে থাকা, শ্বাস নেওয়া, প্রাণের অন্বেষণ, সন্তানের জন্য ভাবনার মধ্যে যেমন প্রাণের এক ধরনের আকুতি থাকে- দেশকে ভালোবাসার প্রকৃত চেতনার মধ্যেও সেই প্রাণের পরশ থাকে। এবারের বিশ্বকাপে টাইগারদের উপস্থিতি সেই বোধ এই অনুভূতিই নাড়িয়ে দিয়ে গেছে ইংল্যান্ডের বাঙালি একটি প্রজন্মকে। বছর দশ থেকে আঠারোর এই প্রজন্মকেই এখানকার বাংলাদেশিরা বলে 'থার্ড জেনারেশন'। যাদের বাবা-মা বাংলাদেশি হলেও নিজেরাই ঠিকভাবে বাংলা বলতে পারেন না। তাদের বেড়ে ওঠা ব্রিটিশদের সঙ্গেই, তাদের স্কুল, খেলাধুলা, চলাফেরা সব ইংলিশদের সঙ্গে। এই প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশ এতদিন ছিল কেবলই 'প্যারেন্টস হোম'-এর মতো। সেই তারাই এবার টাইগারদের খেলা দেখতে গিয়ে জাতীয় সঙ্গীত শুনে চোখের জল ফেলেছেন, সন্তানের মধ্যে শিকড়ের এই এতটুকু উপস্থিতি টের পেয়ে বাবা- মায়ের গর্ব আর প্রশান্তির জায়গাটি স্ম্ফীত হয়েছে।

'আমার ছেলেকে নিয়ে ছোটবেলায় একবার শুধু বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। এখন সে মেডিকেলে পড়ছে। ওর কাছে এ ইংল্যান্ডই নিজের দেশ। ক্রিকেট নিয়েও ওর কোনো আগ্রহ ছিল না। এবার অনেকটা জোর করেই ওকে নিয়ে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটি দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানে যখন আমার সোনার বাংলা... বাজছিল, তখন আমার ছেলের চোখে জল দেখে আমি নিজেকেও সামলাতে পারিনি। সে এখন বুঝতে পারে, বাংলাদেশও ওর দেশ...'- নটিংহামের ডাক্তার আসাদ রহমানের চোখ ভিজে যাচ্ছিল কথা বলতে গিয়ে। এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স যেমনই হোক না কেন, যতই টাইগাররা আট নম্বরে থাকুক না কেন- ইংল্যান্ডে থাকা এই একটি প্রজন্মের মধ্যে টাইগাররা যে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তুলতে পেরেছে সেটি চোখে পড়েছে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাদিয়া মুনা তাসনিমের মধ্যেও। 'ইংল্যান্ডে কয়েক প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশিরা বসবাস করছে। এখন তাদের তৃতীয় প্রজন্ম চলছে। আমি খেয়াল করেছি, নতুন এই প্রজন্মের মধ্যে এই বিশ্বকাপ ক্রিকেট কতটা নাড়া দিয়েছে। তারা অনুভব করতে পারছে, লাল-সবুজের পতাকার মধ্যে তাদেরও সত্তার উপস্থিতি আছে। বাংলাদেশের খেলা দেখার পর এখানকার পার্লামেন্টের সদস্যরাও আমার কাছে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। ওদের মুখে বাংলাদেশ নিয়ে এসব শুনতে ভীষণ ভালো লাগে।'

প্রায় দেড় মাসের এই টুর্নামেন্টে কাজ বাদ দিয়ে সাকিবদের খেলা দেখাটা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য অনেকটাই চ্যালেঞ্জের ছিল। রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী, কর্মচারী, ট্যাক্সিচালক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র- বাংলাদেশের খেলা থাকলে সব ফেলে তারাই ছুটে আসতেন মাঠে। তিনগুণ, চারগুণ পাউন্ড বেশি দিয়েও টিকিট কিনেছিলেন তারা। ইংল্যান্ডে ভারতীয় আর পাকিস্তানিদের তুলনায় সংখ্যায় অনেক কম বাংলাদেশিরা। তার ওপর নাক উঁচু ইংলিশরা যতই উদারতার কথা বলুক না কেন, শেষ পর্যন্ত গিয়ে ওই গায়ের রঙটা দেখেই তারা তার সঙ্গে তেমন আচরণ করে। তাই যুগের পর যুগ এখানে থাকলেও একটা দূরত্ব ঠিকই টের পায় প্রবাসীদের দ্বিতীয় প্রজন্ম। তাদের কাছে তাই বাংলাদেশ দলের এই দেড় মাসের ইংল্যান্ড উপস্থিতি ছিল সার্বজনীন উৎসবের মতো।

মন্তব্য করুন