'ওল্ড স্কুল' মডেলে কিউইরা

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০১৯

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ম্যানচেস্টার থেকে

অনেকের চোখেই এবারের বিশ্বকাপের ব্যাটিং ধরন 'ওল্ড স্কুল ক্রিকেট' মডেলের। 'ওল্ড' বলতে বহু পুরনো কিছু নয়, দুই-তিন দশক আগের স্টাইল। তখন ব্যাটিং হতো নির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়া মেনে, প্রথম পাওয়ার প্লেতে রান না উঠালেও চলবে, কিন্তু উইকেট হারানো চলবে না। এরপর মাঝের সময়টায় আস্তে আস্তে রানের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে, তবে উইকেট খোয়ানো যাবে বড়জোর দুটি-তিনটি। এরপর শেষ দিকে গিয়ে হাতে উইকেট নিয়ে কোনোমতে আড়াইশ বা এর কাছাকাছি রান তোলার চেষ্টা চলবে। ব্যাস, আগে ব্যাটিং করে এই রান তুলতে পারলেই জয় অর্ধেক নিশ্চিত। আশি-নব্বই দশকের জনপ্রিয় এই ধারা চলতি শতাব্দীর শুরু থেকে, বিশেষত টি২০-এর আগমনের পর থেকে অনেকটাই বদলে গেছে। তবে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে সেই ধারা ফিরে এসেছে মহাসমারোহে। 'রান উৎসব, রান উৎসব' কোরাস তোলা দ্বাদশ বিশ্বকাপে 'ওল্ড স্কুল ক্রিকেট' দেখা গেছে কমবেশি অনেক ম্যাচেই। তবে এক্ষেত্রে যেন সবাইকে ছাড়িয়ে আদর্শ রেপ্লিকা তৈরি করেছে নিউজিল্যান্ড। কিউইদের ব্যাটিং মানেই যেন টুকটুক করে খেলা, কোনোমতে আড়াইশ' পার করার চেষ্টা করা। যে ধারা থেকে বের হয়নি তারা গতকালের সেমিফাইনালেও। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে বৃষ্টিতে খেলা বন্ধের আগ পর্যন্ত ৪৬.১ ওভারে তোলে ৫ উইকেটে ২১১ রান।

গতকাল ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে হওয়া এ ম্যাচে প্রথম ইনিংসের প্রথম ১৬ বলে কোনো রানই নিতে পারেননি দুই কিউই ওপেনার। প্রথম দশ ওভারে রান ওঠে মাত্র ২৭। কেবল ভারতের নিয়ন্ত্রিত বোলিং কিংবা সেমিফাইনালের চাপের কারণে এমন মন্থর রান উঠেছে- ব্যপারটা এরকম নয়। এর আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও যথাক্রমে ৩০ ও ৩১ রানের বেশি তুলতে পারেনি দলটি। একপর্যায়ে উভয় ওপেনার ফিরে যাওয়ার পরও রানে বিশেষ গতি আসেনি। দলীয় একশ' পূর্ণ হয় ২৮.১ ওভারের সময়, উইকেটে যদিও তখন তিন ও চার নম্বরে নামা ব্যাটসম্যান! ইনিংসের ৩৪ ওভারের সময় দেখা যায়, ২০৪ বলের মধ্যে ১২৬ বল অর্থাৎ ২১ ওভার কেবল ডট বলই খেলে গেছেন উইলিয়ামসন-টেলররা। চল্লিশ ওভারের সময়কার হিসাবে তাদের বাউন্ডারির খোঁজ পাওয়া যায় মাত্র ১০টি; চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত হওয়া ৪৬ ম্যাচের মধ্যে যা যৌথভাবে সর্বনিম্ন। রেকর্ডের ভাগিদার হিসেবে অন্য যে ইনিংসটি আছে, সেটিও নিউজিল্যান্ডের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চল্লিশ ওভারে চার ছিল নয়টি, ছক্কা একটি। নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং কতটা 'ওল্ড স্কুল ক্রিকেট' ঘরানার হয়েছে, তা আরও বোঝা যাবে মোট দলীয় রানের দিকে তাকালে। সেমিফাইনালে উঠেছে তারা সেরা চার দলের একটি হয়ে। কিন্তু সেমির ব্যাটিংয়ের পরও তাদের মোট দলীয় সংগ্রহ ১ হাজার ৮৮৫ রান মাত্র, অংশগ্রহণকারী দশ দলের মধ্যে যা অষ্টম। নিউজিল্যান্ডের চেয়ে বেশি রান করেছে লীগ পর্ব থেকে বাদ পড়ে যাওয়া বাংলাদেশ (২২৭৮), পাকিস্তান (২০২৫), উইন্ডিজ (১৯৬৯) আর দক্ষিণ আফ্রিকা (১৯৩৪)। ওভারপ্রতি রান তোলার দিক থেকে অবশ্য আরও খারাপ (৪.৯৭), দশ দলের মধ্যে নবম (সামনে কেবল আফগানিস্তানের ৪.৬৫)। শুরু থেকে সেমি পর্যন্ত যাত্রায় মোট যে ১৮৮৫ রান উঠেছে, তার মধ্যে ৫৪৮ রানই আবার উইলিয়ামসনের। টুর্নামেন্টজুড়ে দলকে প্রায় একাই টেনে নিয়েছেন অধিনায়ক। তবে দলের ছাপ ডানহাতি এ ব্যাটসম্যানের ওপরও পড়েছে। ৪টি ইনিংসে তিনি পঞ্চাশ পেরিয়েছেন, এর একটিতেও ৭২ বলের আগে পঞ্চাশ ছুঁতে পারেননি। গতকাল পর্যন্ত বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী প্রথম ২৩ জনের মধ্যে তার স্ট্রাইক রেটই সবচেয়ে কম-৭৬.৩২। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন উইলিয়ামসনের সতীর্থ টেলরের ৭৬.৪৫। একটা যুক্তি দেওয়া যায়, নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক বলে যে মার্টিন গাপটিল ও কলিন মুনরোকে বিবেচনা করা হয়, তাদের ব্যর্থতার চাপেই দলের সেরা দুই ব্যাটসম্যানের এমন মন্থর ব্যাটিং। কিন্তু যুক্তি টেকে না এ কথায় যে, মোটের ওপর পুরো দলটাই তো পুরনো ধাঁচের ব্যাটিংয়ে ফিরে গেছে। ম্যাচের পর ম্যাচ তো সে দৃষ্টান্তই দেখা গেল।