হাসিমুখের আড়ালে বেদনা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০১৯      

আল নুরাইন

তারা ক্রিকেটের 'নাইস গাইজ', নিপাট ভদ্রলোক। ক্রিকেটটা খেলে একদম সঠিক স্পিরিটে। মাঠে স্লেজিংয়ে জড়ায় না, জিতলে উদযাপনে থাকে না আতিশয্য। হারলেও প্রতিপক্ষকে অভিনন্দন জানায় সবার আগে। লর্ডসে সেই কিউইরা যখন ফাইনাল হারল, তখনও তাদের মধ্যে খুব বেশি ভাবালুতা দেখা গেল না। টানা দু'বার ফাইনাল হারের হতাশা তারা লুকিয়ে রাখল আপাত হাসির মুখোশে।

ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনেও কেন উইলিয়ামসনের মুখ দিয়ে খুব দুঃখের কিছু বের হলো না। হাসিমুখেই প্রশ্নের জবাব দিয়ে গেলেন। না জেতার কারণ হিসেবে বললেন, 'কিছু জিনিস আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। গোটা ম্যাচেই ছোট ছোট বিষয় আমাদের পক্ষে যায়নি।' ওভার থ্রোতে পাওয়া ছয় রান নিয়ে বললেন, আশা করবেন আর কোনো দলের সঙ্গে যেন এমন না হয়। অবশ্য যখন ফাইনাল না হেরেও আপনি চ্যাম্পিয়ন হবেন না, তখন এর চেয়ে বেশি কি-ই বা বলা যায়!

কিন্তু উইলিয়ামসন তো বরাবরই এমনই। খুব বেশি আবেগ দেখান না। তার দলটাও ঠিক তার ইমেজেই গড়া। হেরে গেলেও মাথা উঁচুই রাখে। মুখেও থাকে হাসি। তবে হাসির পেছনে লুকানো বিষাদটা টের পাওয়া যায় জেমি নিশামের টুইট দেখে। বাচ্চাদের উদ্দেশে করা তার টুইটের ভাবানুবাদ যেটা দাঁড়ায় তা হলো, আর যাই কর খেলায় এসো না। সুখী হয়ে মরতে পারবে। আহা নিশাম! গত বিশ্বকাপে খেলতে না পেরে একসময় ক্রিকেট ছেড়েই দিতে চেয়েছিলেন। পরে ফিরে এসে কী এক বিশ্বকাপই কাটালেন। অথচ দিন শেষে তার ওপর ভর করল রাজ্যের হতাশা। ওদিকে আছেন মার্টিন গাপটিল। সুপার ওভারে দুই রান নিয়ে দলকে জেতাতে পারেননি। আবার তার থ্রো থেকেই অতিরিক্ত চার রান পেয়ে যায় ইংল্যান্ড। এর পরও হতাশ না হলে তিনি হয়তো মানুষই নন।

ফাইনালটা মহাকাব্যিক হলেও এর পরতে পরতে নিউজিল্যান্ডের হতাশার গল্প। নইলে ৪৭তম ওভারে কীভাবে ক্যাচ ধরেও বাউন্ডারিতে পা রাখলেন ট্রেন্ট বোল্ট? এরপর শেষ ওভারে ওই ওভার থ্রো থেকে ছয় রানকেই বা কী বলা যায়? ধারাভাষ্যকার ইয়ান স্মিথ তো বলেই দিলেন, 'এ টুর্নামেন্টে অনেক ছয় হয়েছে। কিন্তু আর কোনোটিই মাটি দিয়ে গড়ানো ওই ছয়ের মতো মাহাত্ম্যপূর্ণ নয়।'

আসলে এটাই ক্রিকেট। খেলাটা কখনই আপনাকে চমকাতে ব্যর্থ হবে না। মহাকাব্যিক এ ফাইনাল জিতে নিয়েছে ইংল্যান্ড। কিন্তু বিজিত নিউজিল্যান্ডের প্রশংসা করতে কুণ্ঠাবোধ করছেন না কেউ; বরং অনেকের চোখে তারাই আসল চ্যাম্পিয়ন। গোটা টুর্নামেন্টই দারুণ লড়াই করেছে কিউইরা। ভঙ্গুর ব্যাটিং নিয়েও বোলারদের বীরত্বে জয় ছিনিয়ে এনেছে। তাদের বেশ কয়েকটি ম্যাচে ফল এসেছে শেষদিকে। গ্রুপ পর্বে রান রেটের ব্যবধানে চার নম্বর দল হয়ে সেমিতে উঠে আবার এক স্নায়ুক্ষয়ী ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে ফাইনালে যায় তারা। চিরলড়াকু এ দলটাই ফাইনাল হারল কি-না বাউন্ডারির হিসাবে! অথচ একটুখানি ভাগ্যের পরশ পেলে আজ ট্রফি নিয়ে উল্লাস করার কথা ছিল তাদেরই। হাসিমুখে থাকলেও নিউজিল্যান্ডের খেলোয়াড়দের হতাশা আন্দাজ করাটা তাই কঠিন নয়।