ডারবান টু লর্ডস

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯

স্পোর্টস ডেস্ক

'শেষ ভালো যার, সব ভালো তার'- কথাটা কি সব সময়ই সত্যি? শেষটুকু ভালো হলেই কি সবটুকু ভালো হয়? প্রশ্নটার মধ্যে একটা ধাঁধা হয়তো আছে। ঠিক এমন একটা ধাঁধা আছে মাশরাফি বিন মুর্তজার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার নিয়েও। সবটুকু ভালো হয়নি, ভালো হচ্ছে না শেষটাও। তবে সামগ্রিকভাবে দেখলে মনে হবে, শেষটা ভালো না হলেও সবটুকুকে 'ভালো'র কাতারে ফেললেও দোষের কিছু নেই। ডারবানে যে যাত্রাটা শুরু হয়েছিল বা লর্ডসে আজ যে যাত্রাটা শেষ হচ্ছে- সেটাকে অবশ্য কেবল ভালো-মন্দে বেঁধে না রেখে দেখা যেতে পারে রোমাঞ্চকর এক রোলারকোস্টার রাইড হিসেবেও।

২০০৩ সালে ১৯ বছর বয়সে মাত্র তিন ওয়ানডের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে পা পড়েছিল তার। সেই মঞ্চে আলো ছড়ানো হয়নি ভাগ্যের পরিহাসে। টুর্নামেন্টে তৃতীয় ম্যাচের আগে অনুশীলনে বলের ওপর পড়ে মচকে গিয়েছিল পা। সেই পা এরপর আর তাকে নামতে দেয়নি সেবারের বিশ্বকাপে।

সকালটা যে সব সময় পুরো দিনের পূর্বাভাস দেয় না, সেটাই যেন প্রমাণ করে দিলেন পরের বিশ্বকাপে। সেই বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটা শুধু তার ক্যারিয়ারের নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটেরই অন্যতম উজ্জ্বল এক অধ্যায়। সেই ম্যাচে বোলিং ইনিংসের শুরুতেই দারুণ এক ডেলিভারিতে বোল্ড করেছিলেন বিরেন্দর শেবাগকে। এরপর নিয়েছিলেন আরও তিন উইকেট। সুবাদে ভারতের ১৯১ রানে গুটিয়ে যাওয়া এবং পাঁচ উইকেট হাতে রেখে বাংলাদেশের জিতে যাওয়া। ম্যাচসেরার পুরস্কারটা উঠেছিল মাশরাফির হাতেই। বারমুডার বিপক্ষে ম্যাচেও করেছিলেন দারুণ বোলিং। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয়ের ম্যাচে ব্যাট হাতে খেলেছিলেন ১৬ বলে ২৫ রানের ইনিংস।

তবে এই সবকিছুর বিনিময়ে হলেও বোধহয় দেশের মাটিতে ২০১১ বিশ্বকাপটা খেলতে চাইতেন মাশরাফি। নিজের দেশে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলার সৌভাগ্য ক্রিকেটারদের হয় কদাচিৎ। কিন্তু ভাগ্যদেবতা যেন এবারও নির্মম এক উপহাস করল মাশরাফির সঙ্গে। বিশ্বকাপের আগে আগে ঘরোয়া ক্রিকেটের ম্যাচে চোট পেয়েছিলেন। চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণার আগে পুরোপুরি সেরে ওঠার জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করেছিলেন। কিন্তু স্কোয়াডে শেষ পর্যন্ত জায়গা পাননি ফিটনেস ইস্যুতে। স্কোয়াড ঘোষণার পর ক্যামেরার সামনে মাশরাফির কান্না নাড়া দিয়েছিল দেশের সব ক্রিকেট দর্শককে।

তবে যে বিশ্বকাপ তাকে কাঁদিয়েছিল, সেই বিশ্বকাপই এরপর তাকে দিয়েছে অনন্য এক প্রাপ্তির স্বাদ। ২০১৫ বিশ্বকাপে গিয়েছিলেন অধিনায়ক হয়ে। বিশ্বকাপের মঞ্চে সেবার তার দারুণ নেতৃত্বগুণ এবং উজ্জীবনীশক্তি যেন ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দলের মধ্যেই। ফলাফল- নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলল বাংলাদেশ। সেটা ছিল শুরু। ওই বিশ্বকাপের পর থেকে এরপর ওয়ানডে ক্রিকেটে সাফল্যের জোয়ারে ভেসেছে বাংলাদেশ। আর সেখানে দক্ষ নাবিকের মতো হাল ধরে দলকে আরও সাফল্যের পথ দেখিয়েছেন মাশরাফি।

এবারের বিশ্বকাপ শুরুর আগেই বলেছিলেন- এটাই শেষ বিশ্বকাপ। শেষটা কে না রাঙাতে চায়! চেয়েছিলেন মাশরাফিও। কিন্তু প্রত্যাশার ধারা তো আর সব সময় প্রাপ্তির মোহনায় মেলে না! মাশরাফিরও মেলেনি। বোলিংয়ে যেন ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। দল ভালো পারফরম্যান্স করলেও তার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি 'মাশরাফিসুলভ' পারফরম্যান্স। তবে এর পরও বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সফলতম অধিনায়ক তিনি। এই দলকে নতুনভাবে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করার অন্যতম কারিগর তিনি। শেষটা মলিন হলেও সামগ্রিক বিচারে বিশ্বকাপের মাশরাফি বা মাশরাফির বিশ্বকাপের ঔজ্জ্বল্য একটুও ম্লান হয় না। সেই ঔজ্জ্বল্যটুকু সঙ্গী করেই আজ লর্ডসে নিজের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচটি খেলতে নামবেন তিনি।