বিশ্বমঞ্চে মাশরাফির শেষ

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯

সঞ্জয় সাহা পিয়াল,লন্ডন থেকে

দুইশ' পাঁচ বছরের পুরনো দালান বাড়ি, সাদা গ্রিলের সেই বারান্দা, বাগানঘেরা ক্যান্টিন, সাদাকালো পুরনো সব ছবিতে সাজানো ড্রয়িংরুমের মতোই ড্রেসিংরুম। আভিজাত্য আর ঐতিহ্য চুইয়ে পড়ছে তার প্রতিটি বসনে। এখনও এমসিসির বারান্দায় যেতে হলে লাল-হলুদ টাই পরতে হয় এখানে, টাইয়ের নট একটু এদিক-ওদিক হলেও বাঁকা চোখে তাকানো হয়- এতটা নিয়ম-নিষ্ঠার এই ক্রিকেট তীর্থে এসে কি ছবি না তুলে থাকা যায়! অনুশীলনের ফাঁকে সৌম্যদের মতো কেউ কেউ তাই চেনা ফটোগ্রাফারের সামনেই চুল ঠিক করে দাঁড়িয়ে পড়লেন। লর্ডসের প্রথম দর্শনেই মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে দলের অনেকের মধ্যেই। শুধু একজনই ছিলেন কাল মনমরা, চেনা হাসিমুখে বিষণ্ণতা। তিনি মাশরাফি বিন মুর্তজা। অনুশীলনে এলেও বোলিং করলেন না, প্রতিদিনের মতো হাসিঠাট্টায় মাতিয়ে রাখলেন না ছেলেগুলোকে। কথা বললেন না মিডিয়ার সঙ্গেও।

কিন্তু তার কথা শোনার জন্য যে অপেক্ষা করে আছে ঢাকা থেকে আসা রেকর্ডারগুলো। রাজসিক লর্ডসেই কি আজ 'বিদায়' বলবেন মহানায়ক? ম্যাচের পরই কি বলবেন- এটাই ছিল আমার শেষ ওয়ানডে? যারা এই কথা শোনার জন্য কান খাড়া করে আছেন, তাদের জন্য মন খারাপের খবর হলো। এটাই মাশরাফির শেষ ওয়ানডে নয়। পরাজিত মাশরাফি নন, জয়ী মাশরাফিই অবসর নেবেন। তিনি জানেন ঈর্ষার কাঁটা আছে, ষড়যন্ত্রের পচা শামুকও আছে- এসব ছাপিয়েই অনন্য হতে হয় কীভাবে, সেটাও জানা আছে তার। তাই পারফর্ম করে, নিজেকে আরেকবার প্রমাণ দিয়েই অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

২৫ জুলাই থেকে শ্রীলংকায় তিন ম্যাচের ওয়ানডে ঠিক হয়েছে টাইগারদের। এর বাইরে এ বছর সূচিতে আর কোনো ওয়ানডে নেই বাংলাদেশের। মাশরাফির ইচ্ছা, দেশের মাটিতে বিদায়ী ম্যাচ খেলতে। তার জন্য জিম্বাবুয়ে আর আফগানিস্তানকে নিয়ে একটি ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট আয়োজনেরও চেষ্টা করছে বিসিবি। অক্টোবরের দিকে যদি সেটা ঠিক হয়ে যায়, তাহলে মিরপুরেই বিদায় বলবেন মাশরাফি। দলের সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলে তেমনটাই ঠিক হয়েছে। এই সময়ের মধ্যেই ধীরে ধীরে সাকিবের হাতে রাজ্যপট বুঝিয়ে দেবেন।

যদিও বাইরের কানভাঙানিতে কান দিচ্ছেন না তিনি। ড্রেসিংরুম তার পাশেই থাকছে। সিদ্ধান্তটি তার ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন সবাই। একে তো লর্ডসে প্রথম ওয়ানডে খেলার রোমাঞ্চ, তার সঙ্গে প্রিয় মাশরাফি ভাইয়ের ফেয়ারওয়েল ম্যাচ- সব মিলিয়ে একটা অন্যরকম আবহ ড্রেসিংরুমে। 'মাশরাফিকে ড্রেসিংরুমের সবাই প্রচণ্ড ভালোবাসে আর ভীষণ শ্রদ্ধা করে। তারা চায় না কোনো অসম্মান জনক কিছু হোক মাশরাফির সঙ্গে। অবসরের সিদ্ধান্তটি একান্তই তার নিজের। বিশ্বকাপের পর শ্রীলংকা সফরে মাশরাফি যদি থাকে তাহলে খুব ভালো। সে না থাকলেও দল এগিয়ে যাবে...'- এ কথা বলার পর কোচ স্টিভ রোডস বুঝতে পারেন, সামনে বসা প্রতেকেই তার এ কথাটি দিয়েই শিরোনাম করতে পারে। তাই যাতে ভুল বোঝাবুঝি না হয়, সেজন্যও নিজের কথাটিরই খুলে ব্যাখ্যা দেন। 'আমি যেটা বলতে চেয়েছি সেটা হলো যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই দল এগিয়ে যায়। এগিয়ে যেতে হয়। মাশরাফি যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে, সে শ্রীলংকা সফরে যাবে না, তাহলে আমাদের যা আছে তা নিয়েই যেতে হবে।'

লর্ডস যেভাবে পুরনো ঐতিহ্যকে আঁকড়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সম্মানের সঙ্গে, মাশরাফিকে সেই সম্মান দিয়েই মাথায় মুকুট বানিয়ে রাখতে চায় টাইগাররা। সেই 'মুকুট', যা রাজ্য বদলে গেলে, রাজা বদলে গেলেও অক্ষত থাকে। গর্ব আর শ্রদ্ধায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম যা বয়ে বেড়ায়। শুধু কিছু ম্যাচ খারাপ হয়েছে বলেই মাশরাফিকে 'বিদায়' বলতে হবে- ফেসবুকের এই দাবি নয়, মাশরাফির প্রাণের দাবিই শুনতে চায় সবাই। দেখতে চায়, বীরের মতো বীরের বিদায়। এভাবে হেরে যাওয়া পরাজিত সৈনিকের মতো বিদায় কখনই নেবেন না তিনি।