দ্য বিগ বেন 'স্টোকস'

ইংল্যান্ডের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে টেস্ট জয়

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৯      

নাজমুল হক নোবেল

স্টুয়ার্ট ব্রড এলবি হওয়ার পর রীতিমতো জয়োল্লাস শুরু করে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। নবম উইকেটের পতন হয়ে গেছে, তখনও বাকি ৭৩ রান। কিন্তু বেন স্টোকস যে সুপারম্যান হয়ে উঠবেন, তা কি জানত অসিরা? জ্যাক লিচকে নিয়ে শেষ উইকেটে জন্ম দেন এক রূপকথার। মাত্র ক'দিন আগে ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ এনে দেওয়া স্টোকস গতকাল কল্পনাকেও হার মানিয়েছেন। কামিন্সের বলে কাভার দিয়ে চার মেরে তিনি যে হুঙ্কার দেন, তা ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শেষ উইকেটে ইংল্যান্ড ৭৬ রান যোগ করেছে, যেখানে লিচের অবদান মাত্র ১। আর ৪৫ বলে ৭৪ রান এসেছে স্টোকসের ব্যাট থেকে! তার ১৩৫ রানের ইনিংসটি নিয়ে ধন্য ধন্য পড়ে গেছে ক্রিকেট বিশ্বে। বয়কট, মুডি, ভনের মতো বোদ্ধারা তার ইনিংসটিকে টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইনিংসের মর্যাদা দিচ্ছেন। স্টোকসের অতিমানবীয় ব্যাটিংয়ে পাওয়া ১ উইকেটের জয়ে অ্যাশেজেও টিকে রইল ইংল্যান্ড। সিরিজে এখন ১-১ সমতা।

পুরোটা সময় ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা হয়ে থাকা এ বাঁহাতি ব্রড আউট হওয়ার পরের ওভারেই হাত খোলেন অফস্পিনার নাথান লায়নকে ছয় মেরে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধান অস্ত্র হ্যাজেলউডের এক ওভার থেকে দুই ছয়ে ১৯ রান তুলে নিয়ে তাদের মনোবল ভেঙে দেন। এরপর প্যাটিনসন, কামিন্স কেউই রেহাই পাননি তার হাত থেকে। যে উইকেটে প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ড ৬৭ রানে অলআউট হয়েছিল, সেখানেই কি-না স্টোকস হয়ে ওঠেন অদম্য। তাকে আউট করা তো দূরের বিষয়, চার-ছয় ঠেকাতেই জেরবার অবস্থা হয় অস্ট্রেলিয়ার। দুর্দান্ত সব শটস খেলার পাশাপাশি শেষ ব্যাটসম্যান জ্যাক লিচ যেন প্রতিপক্ষের সামনে না পড়ে সে ব্যাপারেও মনোযোগী ছিলেন তিনি। শেষ উইকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের জুটি গড়েন তারা। আর ইংল্যান্ড নিজেদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ড গড়ে।

তবে অস্ট্রেলিয়া যে সুযোগ পায়নি, তা কিন্তু নয়। হ্যাজেলউডের বলে তুলে মারতে গিয়ে থার্ডম্যানে ক্যাচ দিয়েছিলেন স্টোকস; হ্যারিস তা হাতে জমাতে পারেননি। ইংল্যান্ড জয় থেকে মাত্র দুই রান দূরে থাকা অবস্থায় সুবর্ণ সুযোগটি নষ্ট করে অস্ট্রেলিয়া। লায়নের বল স্টোকস শর্ট থার্ডম্যানে পাঠানোর পর দৌড়ে অপরপ্রান্তে চলে গিয়েছিলেন লিচ। কিন্তু তাকে ফিরিয়ে দেন স্টোকস। ফিল্ডার যখন বল লায়নের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, তখন লিচ প্রায় উইকেটের মাঝখানে। অবিশ্বাস্যভাবে সে বলটি ধরতে পারেননি লায়ন। এই একটি রান আউট মিসের যন্ত্রণা বহু দিন কুরে কুরে খাবে তাকে। রোমাঞ্চের পসরা সাজিয়ে বসা হেডিংলিতে ঠিক তার পরের বলেই এলবির জোরালো আবেদন থেকেও রক্ষা পান স্টোকস। টিভি রিপ্লেতে দেখা গেছে, বল গিয়ে স্টাম্পে আঘাত হানত। কিন্তু তখন রিভিউ ছিল না অস্ট্রেলিয়ার হাতে। একটু আগেই শেষ রিভিউটা নষ্ট করেন তারা।

ইংল্যান্ড স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল অধিনায়ক জো রুটের ব্যাটে। আগের দিন দুর্দান্ত ব্যাটিং করা রুট গতকাল শুরু করেছিলেন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। তার সঙ্গী বেন স্টোকসও ছিলেন ভীষণ ধৈর্যশীল। তবে এত সতর্কতার পরও বাঁচতে পারেননি রুট। লায়নের স্পিন ডাউন দ্য উইকেটে খেলতে গিয়ে স্লিপে ওয়ার্নারের হাতে ক্যাচ দিয়ে বসেন তিনি। রুট বিদায় নিলেও হাল ছাড়েনি ইংল্যান্ড। স্টোকসের সঙ্গে বেয়ারস্টো যোগ দিয়ে দলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। তারা দু'জন রক্ষণাত্মকভাবে খেলার বদলে রান তোলায় মনোযোগ দেন। এ কৌশলটা ভালোই কাজে লাগে। তবে উইকেটে থিতু হয়ে যাওয়ার পর হ্যাজেলউডের একটি লাফিয়ে ওঠা বল থার্ডম্যানে খেলতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বসেন বেয়ারস্টো। তাদের ৮৬ রানের জুটি ভাঙার পর ইংলিশদের ব্যাটিং লাইনে একটি ছোট ধস নামে। দ্রুত আউট হয়ে যান জস বাটলার ও ক্রিস ওকস। স্টুয়ার্ট ব্রড ও জোফরা আর্চারও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। অবশ্য এরপরই আসল লড়াইটা শুরু করেন বেন স্টোকস। শেষ ব্যাটসম্যান জ্যাক লিচকে নিয়ে তার লড়াই ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। সত্যিই, বেন স্টোকস মনে হয় নিজেও জানেন না তিনি ঠিক কী করেছেন। যত দিন ক্রিকেট থাকবে, অমর হয়ে থাকবে এই ইনিংস। অমর হয়ে থাকবে এই ম্যাচের স্মৃতি। এবং অবশ্যই অমর হয়ে থাকবেন বেঞ্জামিন এন্ড্রু স্টোকস!

সংক্ষিপ্ত স্কোর

অস্ট্রেলিয়া : ১৭৯ ও ২৪৬ (ল্যাবুশেন ৮০, ওয়েড ৩৩, হেড ২৫, প্যাটিনসন ২০, হারিস ১৯; স্টোকস ৩/৫৬, আর্চার ২/৪০, ব্রড ২/৫২, ওকস ১/৩৪, লিচ ১/৪৬)

ইংল্যান্ড :৬৭ ও ৩৬২/৯ (স্টোকস ১৩৫*, রুট ৭৭, ডেনলি ৫০, বেয়ারস্টো ৩৬, আর্চার ১৫, লিচ ১*; হ্যাজেলউড ৪/৮৫, লাওন ২/১১৪, কামিন্স ১/৮০, প্যাটিনসন ১/৪৭)

ফল :ইংল্যান্ড ১ উইকেটে জয়ী
ম্যাচসেরা :বেন স্টোকস

সিরিজ :৫ ম্যাচ সিরিজে ১-১-এ সমতা।