তীর-ধনুকে লক্ষ্যভেদ

আরচারিতে ছয় স্বর্ণ

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

ক্রীড়া প্রতিবেদক, নেপাল থেকে

তীর-ধনুকে লক্ষ্যভেদ

আরচারির কম্পাউন্ড মহিলা দলগত ইভেন্টে শ্রীলংকাকে হারিয়ে স্বর্ণ জেতা শ্যামলী রায়, সুমা বিশ্বাস ও সুস্মিতা বণিকের উচ্ছ্বাস- সমকাল

পোখারায় প্যারেড গ্রাউন্ডে একবার নয়, ছয়বার বেজেছে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। লাল-সবুজের পতাকা উড়ছে, আর গ্রাউন্ডে দাঁড়ানো আরচাররা স্যালুট ভঙ্গিতে সম্মান করছেন। সাউথ এশিয়ান গেমসের এবারের আসরে এর আগে মোট সাতবার বেজে উঠেছিল 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।' কিন্তু এগুলো ছিল ভিন্ন ভিন্ন ইভেন্টে। গতকাল এক আরচারির কারণেই ছয়বার পোখারার আকাশে সবার ওপরে ছিল বাংলাদেশের পতাকা। সব স্বর্ণই রিকার্ভ ও কম্পাউন্ড দলগত এবং মিশ্র দলগত ইভেন্টে। এসএ গেমসের ইতিহাসে এবারই প্রথম সোনালি হাসি রোমান সানা-মোহাম্মদ তামিমুলদের। অতীতে কখনোই এই ডিসিপ্লিনে স্বর্ণ জিততে পারেনি বাংলাদেশ। এবার ভারত না থাকায় স্বর্ণ জয়ের পথটা সহজ হয়ে যায়।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় অ্যাথলেট হিসেবে সরাসরি অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা রোমান সানার হাত ধরে আসে প্রথম স্বর্ণ। সকালে রিকার্ভ দলগত ইভেন্টে তীর-ধনুক হাতে নিয়ে মাঠে নামেন রোমান, মোহাম্মদ তামিমুল ও হাকিম আহমেদ রুবেল। তারা ৫-৩ সেট পয়েন্টে হারান শ্রীলংকার রবিন কাভিশ, সজীব ডি সিলভা ও সান্দান কুমার হেরাথকে। এর পরই রিকার্ভ নারী দলগত ইভেন্টের ফাইনালে বিউটি রায়, ইতি খাতুন ও মেহনাজ আক্তার মনিরা ৬-০ সেট পয়েন্টে ভুটানকে পরাজিত করে বাংলাদেশকে এনে দেন দ্বিতীয় স্বর্ণ। ইতি খাতুনকে নিয়ে রিকার্ভ মিশ্র দলগত ইভেন্টে ৬-২ সেট পয়েন্টে ভুটানকে হারিয়ে দেশকে আরেকটি স্বর্ণ এনে দেন রোমান সানা। দুপুরের পর আসে কম্পাউন্ড ইভেন্ট থেকে আরও তিনটি সোনা। কম্পাউন্ড পুরুষ দলগত ইভেন্টের ফাইনালে সোহেল রানা, অসীম কুমার দাস ও মোহাম্মদ আশিকুজ্জামান ২২৫-২১৪ স্কোরের ব্যবধানে ভুটানকে হারিয়ে স্বর্ণ জেতেন। নারী দলগত ইভেন্টে সুস্মিতা বনিক, সুমা বিশ্বাস ও শ্যামলী রায় জুটি ২২৬-২১৫ স্কোরে শ্রীলংকাকে হারায়। আর দিনের শেষ স্বর্ণটি আসে কম্পাউন্ড মিশ্র দলগত ইভেন্ট থেকে। সোহেল রানা ও সুস্মিতা বনিক জুটি ১৪৮-১৪০ স্কোরের ব্যবধানে নেপালের প্রতিযোগীকে হারিয়ে সোনালি হাসি হাসেন।

এক দিনে ছয় স্বর্ণ। সানা একাই জিতেছেন দুটি। ইনজুরির কারণে ২০১৬ এসএ গেমস খেলতে পারেননি। এবার হিমালয়ের দেশে ওড়াচ্ছেন দেশের পতাকা। স্বপ্নপূরণের আনন্দে ভাসছেন রোমান, 'আসলে আমার স্বপ্ন ছিল ২০১৬ এসএ গেমসে খেলব; কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে চোটের কারণে আমি ওই আসরে খেলতে পারিনি। তখন অনেক দুঃখ লেগেছিল। আল্লাহর রহমতে এবার খেলতে আসতে পেরেছি। আর আমার প্রথম দিনটাই শুরু হয়েছে দলগত স্বর্ণ দিয়ে। এরপর রিকার্ভ মিশ্রতেও স্বর্ণ জিতেছি। দুটো গোল্ড হয়েছে। মোট তিনটি আমার লক্ষ্য। এটা ধরতে গেলে আমার ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন। আগামীকাল ব্যক্তিগত ইভেন্টের ফাইনাল আছে, আশা করি সেটাতেও গোল্ড জিততে পারব।' রোমানের মতো তামিমুলেরও প্রথম স্বর্ণ এটি। ২০১৬ সালে খেললেও স্বর্ণ জিততে পারেননি বিকেএসপির এ তীরন্দাজ, '২০১৬ সালে আমি নিজেও খেলছিলাম, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানে স্বর্ণ আসেনি। এবারই আমার প্রথম স্বর্ণ। যেভাবে কাজ করে আসছি, তার ফল পেয়ে আমরা খুশি।' প্রথম এসএ গেমসে এসেই স্বর্ণ। হাকিম আহমেদ রুবেল আনন্দে আত্মহারা, 'আমার আন্তর্জাতিক বেশ কিছু পদক রয়েছে। তবে এসএ গেমসে এবারই প্রথম গোল্ড জিতলাম। ভালো লাগাটা অন্যরকম। এর আগে আমি ২০১৬ সালে রাশিয়ায় গোল্ড জিতেছিলাম। ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে রুপা জিতেছি।'

অনেকেরই মতে, ভারত না থাকায় আরচারিতে স্বর্ণ জয় সহজ হয়ে গেছে। এটা মানছেন না রোমান সানা, 'আসলে কোনো প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখতে হয়ই না। আপনারা দেখেন, আমি যখন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে অলিম্পিক কোয়ালিফাইংয়ে যাই, তখন আমি অলিম্পিক মেডেলিস্টসহ অনেক বড় তারকাকে হারিয়েছি; তারা কিন্তু চিন্তাও করেনি যে, বাংলাদেশের রোমান সানা আমাকে হারাবে। আমি কিন্তু সবসময় প্রতিপক্ষকে শক্তিশালী ভাবি। আর কখন কোন সময় অঘটন ঘটে যায়, এটা কিন্তু কেউ বলতে পারে না। তাই আমাদের শেষ তীর মারা পর্যন্ত মনোসংযোগ ধরে রাখতে হয়। একটু এদিক-সেদিক হলে সব শেষ হয়ে যায়।'