পিচ হলো খোলা বইয়ের পাতার মতো। বিষয় পড়ে বুঝে নিতে হয়, ক্রিকেটের পিচও পড়তে জানতে হয়। উইকেট প্রস্তুত হলে তাই কেউ আঙুল দেবে দেখে, কেউ বল ফেলে বুঝে নেয়। ক্রিকেটের উন্নত দেশগুলোতে পিচ নিয়ে কথা হয় কম। ওইসব দেশে কিউরেটররাও পিচ নিয়ে কথা বলতে পারেন। বাংলাদেশে পিচ নিয়ে কিউরেটরদের মিডিয়ায় কথা বলা যেখানে বারণ, সেখানে ক্রিকেটাররা পিচ নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। পারফরম্যান্স খারাপ হলে তো কথাই নেই। তারা পরোক্ষে কিউরেটরকে তুলে দেন মিডিয়ার কাঠগড়ায়। মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, আকরাম খান, হাবিবুল বাশার- জাতীয় দলের সাবেক এই তিন ক্রিকেটারও স্বীকার করে নিচ্ছেন, দেশে পিচ নিয়ে কথা হয় বেশি। এর চর্চা থেকে বেরিয়ে ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সে ফোকাস করতে বলছেন তারা।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বুধবার প্রথম ওয়ানডে শেষে সাকিব তার বোলিং নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'আমি জায়গায় বল করেছি, বাকি কাজ পিচ করেছে।' ম্যাচ শেষে অধিনায়ক তামিম বলেছেন ব্যাটিংয়ের জন্য উইকেট কতটা কঠিন ছিল, 'ব্যাটিংয়ের জন্য উইকেট খুব কঠিন ছিল। আক্রমণাত্মক কিছু শট খেলতে চাইলেও হচ্ছিল না। কন্ডিশনের কারণেই উইকেট কঠিন হয়ে উঠেছিল।' মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টাইগারদের আজ দ্বিতীয় ম্যাচ। কে জানে আজও আলোচনার বিষয়ে পরিণত হবে না পিচ। টাইগারপ্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীনের প্রত্যাশা, কন্ডিশন নিয়ে কথা না বলে নিজের খেলায় ফোকাস করবেন ব্যাটসম্যান এবং বোলাররা। তিনি বলেন, 'পিচ নিয়ে অভিযোগ বিশ্বের কোথাও নেই। বাংলাদেশে অবশ্যই এই সংস্কৃতি পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। উইকেট সব দলের জন্যই সমান। উইকেট মেনে নিয়ে খেলতে হবে। কেউ তো বলতে পারে না উইকেট কেমন আচরণ করবে। বুধবার বৃষ্টি হওয়ার পর উইকেটের আচরণ পরিবর্তন হয়েছে। এখানে কী করার আছে। ওসব না বলে নিজের সেরা খেলার দিকে ফোকাস করা উচিত।'

মিরপুরের উইকেট কখনও ব্যাটিং সহায়ক ছিল না। সাকিব, তামিমরা এই কন্ডিশনে ২০০৬ সাল থেকে খেলে অভ্যস্থ। এরপরও রান না পেলে বা স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাটিং করা সম্ভব না হলে ঢাল হিসেবে সামনে আনা হয় পিচকে। প্রথম ওয়ানডেতে উইন্ডিজকে ১২২ রানে বেঁধে ফেলে ১২৩ রান করতে গিয়ে চার উইকেট হারিয়েছে স্বাগতিকরাও। যে কন্ডিশনে উইন্ডিজ স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারেনি, সেই উইকেট টাইগাররা সাবলীল খেলবে আশা করা যায় না। বিসিবি পরিচালক আকরাম খানও মানছেন সেটা। জাতীয় দলের সাবেক এ অধিনায়ক উইকেট মেনে নেওয়ার পরামর্শ দিলেন খেলোয়াড়দের, 'উইকেট নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই। গতকাল আবহাওয়াও অন্যরকম ছিল। এরকম তো হয়। উইকেট মনের মতো না হলে অনেকে অনেক কথা বলে। সবাই উইকেট ভালো চায়, কিন্তু নানা কারণে মনের মতো হয় না। এটা মেনে নিতে হয়। আমরা খেলোয়াড় হিসেবেও এটা মেনে নিয়েছি। এখন যারা ক্রিকেটার, তাদেরও মেনে নেওয়া উচিত।' হাবিবুল বাশার চান, এই চর্চা ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে বন্ধ হোক। তার মতে, বাংলাদেশে উইকেট নিয়ে আমরা অনেক বেশি চর্চা করি। এই চর্চাটা অনেক আগে থেকেই হয়েছে। আমরা খারাপ খেললে উইকেটের ওপর চাপিয়ে দিই। বিশেষ করে ঘরোয়া ক্রিকেটে। ভালো খেলতে না পারলে দোষটা উইকেটের ওপর চাপিয়ে দেয়। জাতীয় দলে অতটা হয় না। যাতে নিয়ন্ত্রণ নেই, সেটা নিয়ে কথা বলে কোনো লাভ হয় না। কারণ, কন্ডিশনটা তো দুই দলের জন্য একই।' ভারতের সাবেক অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে এক সংবাদ সম্মেলনে পিচ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, 'উইকেট সবার জন্যই সমান।' ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে উইকেট এবং কিউরেটরকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি নেই বললেই চলে। পিচ নিয়ে প্রশ্ন করাকে বরং বাঁকা চোখে দেখেন উন্নত ক্রিকেটখেলুড়ে দেশের ক্রিকেটাররা। সেখানে বাংলাদেশে পিচ নিয়ে চর্চা চর্বিতচর্বণের মতো। প্রতিটি সিরিজ বা টুর্নামেন্টে পিচ প্রসঙ্গে প্রশ্ন যেমন থাকে, তেমনি ঝাঁজালো উত্তরও।

মন্তব্য করুন