আরও 'উন্নতমানের এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক প্রতিযোগিতা' এবং 'টেকসই আর্থিক মডেল'র আওয়াজ তুলে ফুটবলে আবির্ভাব হয়েছে ইউরোপিয়ান সুপার লিগের। ইউরোপের ১২টি শীর্ষস্থানীয় ক্লাব 'সুপার লিগ' নামের এই টুর্নামেন্টের ঘোষণা দিয়েছে রোববার রাতে, যা রীতিমতো ভয়াবহ মাত্রার কম্পন ধরিয়ে দিয়েছে ফুটবলবিশ্বে। ইউরোপীয় ফুটবলের কর্তৃপক্ষ সংস্থা হুমকি দিয়েছে, যারা এই লিগে খেলবে তাদের অন্যান্য প্রতিযোগিতায় নিষিদ্ধ করা হবে। ফিফা বলেছে, তারা নতুন এই টুর্নামেন্টের অনুমোদন দেবে না। তবে ক্লাবগুলোর পক্ষ থেকে হুমকির বিপরীতে পাল্টা আইনি ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। পক্ষে-বিপক্ষে নানান কথা বলছে বিভিন্ন ক্লাব, সংগঠক, সাবেক খেলোয়াড়রাও। সব মিলিয়ে বিশ্ব ফুটবল এখন সুপার লিগে তোলপাড়।

যাদের 'সাহসী' সিদ্ধান্তে শুরু

প্রতিষ্ঠাতা ক্লাব ১৫টি বলা হলেও টুর্নামেন্ট চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় যুক্ত হয়েছে ১২টি ক্লাব। এর মধ্যে ইংলিশ ক্লাব ছয়টি- যথাক্রমে ম্যানইউ, ম্যানসিটি, চেলসি, লিভারপুল, আর্সেনাল ও টটেনহাম; স্প্যানিশ তিনটি- রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদ; ইতালিয়ান তিনটি- জুভেন্তাস, ইন্টার মিলান ও এসি মিলান। এই ১২টি ক্লাবের মধ্যে অ্যাতলেটিকো ছাড়া বাকি ১১টিই পৃথক বিবৃতিতে সুপার লিগে অংশগ্রহণের কথা নিশ্চিত করেছে। প্রতিষ্ঠাতা ও স্থায়ী ক্লাব হিসেবে ফ্রান্সের পিএসজি এবং জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ ও বরুশিয়া ডর্টমুন্ডেরও আসার কথা ছিল।

পিএসজি, বায়ার্ন কেন নেই?

ইউরোপের বাকি সব শীর্ষস্থানীয় ক্লাব সুপার লিগে গেলেও পিএসজি ও বায়ার্ন কেন নেই তার তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে জার্মান ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের প্রধান নির্বাহী হ্যান্স-জোয়াকিম ওয়াকে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা এবং বায়ার্ন নতুন টুর্নামেন্টে যোগ দিচ্ছে না। বরং ইউরোপিয়ান ক্লাব অ্যাসোসিয়েশন (ইসিএ) ২০২৪ সাল থেকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সংস্কার আনার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তারা সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে থাকবে বলে জানিয়েছেন। বায়ার্নের কেউ অবশ্য সরাসরি মন্তব্য করেননি। মন্তব্য নেই পিএসজি থেকেও। তবে ধারণা করা হচ্ছে, পিএসজি প্রেসিডেন্ট নাসের আল খেলাইফি যেহেতু উয়েফার বিভিন্ন দায়িত্বে আছেন, এবং গতকাল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নতুন মডেলে ভোটও দিয়েছেন, সুপার লিগে থাকছে না তারা। পর্তুগিজ ক্লাব পোর্তো জানিয়েছে, সুপার লিগের প্রস্তাব পেলেও উয়েফা এবং ইইউর কারণে তারা 'না' করে দিয়েছে।

'লোভী'দের 'ননসেন্স প্রজেক্ট' বলল উয়েফা

সুপার লিগ সরাসরিই চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। উয়েফা এটিকে সহজভাবে নেয়নি। বরং যারা এই প্রতিযোগিতায় খেলবে, তাদের জাতীয় দলের খেলায় নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে তারা। গতকাল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নতুন একটি মডেল চূড়ান্ত করার পর সুপার লিগ নিয়ে উয়েফার অবস্থান তুলে ধরেন এর প্রেসিডেন্টে আলেক্সান্ডার ক্যাফেরিন। সুপার লিগকে 'ননসেন্স প্রজেক্ট' অভিহিত করে এর উদ্যোক্তাদের 'লোভী' আখ্যায়িত করেন তিনি। একই সঙ্গে জুভেন্তাস ও ম্যানইউ প্রেসিডেন্টদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অভিযোগও করেন তিনি।

কী বলছে ফিফা

এমন কিছুর গুঞ্জন ওঠার পর প্রথম দিকে ফিফাও কড়া অবস্থান নিয়েছিল। বলেছিল, যে খেলোয়াড়রা সুপার লিগে যোগ দেবে তাদের জাতীয় দলে বহিস্কার করা হবে। তবে পরে সুর কিছুটা নরম করে তারা। যদিও গতকাল এক বিবৃতিতে এই টুর্নামেন্টকে অনুমোদন না দেওয়ার কথা জানিয়েছে ফিফা। বরং ফুটবলের গভর্নিং বডিগুলোকে আহ্বান করেছে যেন ইউরোপিয়ান সুপার লিগ আটকানোর জন্য নিজেদের সব ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়।

ফুটবলাররা কী ভাবছেন

বর্তমান ফুটবলাররা এখনও চুপই বলা চলে। যা বলার খেলোয়াড়দের অ্যাসেসিয়েশনের পক্ষ থেকে হয়তো বলা হবে। তবে বিচ্ছিন্নভাবে মন্তব্য করেছেন কয়েকজন। এর মধ্যে সবার আগে এই টুর্নামেন্টের সমালোচনা করেছেন পিএসজিতে খেলা স্প্যানিশ ফুটবলার আন্দের হেরেরা। টুইটে 'মানুষের তৈরি ফুটবল'কে ধনী কর্তৃক দখল করে নেওয়ার অভিযোগ তোলেন তিনি। এ ছাড়া মেসুত ওজিল ও দেজান লেভরানও সুপার লিগ নিয়ে হতাশার কথা জানিয়েছেন। তারা দু'জন এখন তুরস্ক ও রাশিয়ার লিগে খেলছেন।

সুপার লিগ এলো কীভাবে

ইউরোপের এলিট ক্লবাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আলাদা একটি টুর্নামেন্ট চালুর কথা ভাবছিল। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ম্যাচ কম পাওয়ায় টিভি ও অন্যান্য স্বত্ব থেকে আয়ও কম হয় বলে পর্যবেক্ষণ তাদের। উয়েফার নীতিনির্ধারণ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আপত্তি জানিয়েছে তারা। ওই ভাবনা থেকেই গত বছর দুয়েক ধরে সুপার লিগ নিয়ে আলাপ করছিল ক্লাবগুলো। ধারণা করা হয়, জুভেন্তাস সভাপতি আন্দ্রেয়া আগ্নেলির মস্তিস্ক থেকে এসেছে সুপার লিগের পূর্ণ রূপ। তবে সব ক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগসহ দৌড়ঝাঁপ বেশি করেছেন রিয়াল প্রেসিডেন্ট পেরেজ। শোনা যাচ্ছে, মাদ্রিদে সংস্কারকৃত বার্নাব্যু স্টেডিয়াম হবে সুপার লিগের হোম ভেন্যু।

অঢেল বিনিয়োগ, চড়া লাভের আশা

নতুন প্রবর্তিত টুর্নামেন্টটির জন্য শুরুতেই প্রতিটি দল পাচ্ছে ৩.৫ বিলিয়ন ইউরো করে। আর অঢেল এই অর্থের জোগান দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যান। আনুষ্ঠানিক বার্তায় ক্লাবগুলো জানিয়েছে, সুপার লিগ প্রকল্পে মোট ১০ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করা হবে। এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ক্লাবের লাভের অঙ্কও বেশ চড়া। চ্যাম্পিয়ন দলের প্রাইজমানি হতে পারে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ইউরো, যা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ১২০ মিলিয়ন। এ ছাড়া অর্থ বণ্টনের অন্যান্য অঙ্কও বেশ বড়। যা আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও প্রকাশ করেনি সুপার লিগ কর্তৃপক্ষ।

সমর্থক-প্রতিক্রিয়া

ফুটবল ক্লাবগুলোর মূল শক্তি বলা হয়ে থাকে সমর্থকদের। গতকাল খুব বেশি ক্লাবগুলোর সমর্থকগোষ্ঠী তাৎক্ষণিকভাবে মতামত জানায়নি। তবে অ্যানফিল্ডে ব্যানার টানিয়ে সুপার লিগের বিপক্ষে মত জানিয়েছে লিভারপুল সমর্থকগোষ্ঠীর একাংশ। স্পেনেও নেতিবাচক মত প্রকাশ করেছেন অনেকে।

ইউরোপিয়ান সুপার লিগ কী?

ইউরোপের ২০টি ক্লাব নিয়ে আয়োজিত হবে বাৎসরিক টুর্নামেন্ট। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠাতা ক্লাব ১৫টি, যারা প্রতিবছরই থাকবে। বাকি পাঁচ দল বাছাইয়ের মাধ্যমে পরিবর্তন হবে। ২০ দল দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে হোম অ্যাওয়ে ভিত্তিতে নিজেদের মধ্যে খেলবে। দুই গ্রুপ থেকে শীর্ষ ছয়টি দল সরাসরি খেলবে কোয়ার্টারে, বাকি দুই দল নির্ধারণ হবে চতুর্থ ও পঞ্চম হওয়াদের মধ্যে প্লে-অফ থেকে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতোই কোয়ার্টার ও সেমি হবে দুই লেগ করে, ফাইনাল এক লেগের।

খেলাগুলো হবে সপ্তাহের মাঝখানে; অর্থাৎ, যে সময়টিতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ হয়ে থাকে। নতুন এই প্রতিযোগিতা শুরু হবে সামনের আগস্টেই। রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজকে সুপার লিগের প্রথম প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন