সুপার লিগ চালুর উদ্যোক্তারা বলেননি তারা ঘরোয়া লিগ খেলবেন না। বরং ফিফা ও উয়েফার সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে নিজেদের লিগটিকে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। যার মানে বর্তমান ফুটবল ব্যবস্থায় থাকার পাশাপাশি স্রেফ বেশি অর্থের জন্য তারা আলাদা একটি টুর্নামেন্ট করছেন। কিন্তু এমন অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, 'কেউ যদি নিজেদের মতো করে পথ বেছে নিতে চায়, তাহলে সে পথের সব দায়দায়িত্বও তাদের। যার অর্থ, আপনি হয় পুরোপুরিভাবে থাকবেন, নয়তো পুরোপুরিভাবে চলে যাবেন। এখানে অর্ধেক থাকা আর অর্ধেক না থাকা হয় না। এটা একেবারে পরিস্কার।' একসময় উয়েফার সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা ইনফান্তিনো আশাবাদী, 'বিদ্রোহী'রা ফিরে আসবেন, 'আমরা আশা করি সবকিছু স্বাভাবিকতায় ফিরে যাবে, সবাই স্থির হবে। বৈশ্বিক, ইউরোপীয় আর জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্মান ও সংহতি সবসময়ই থাকবে।' ফুটবলকে বাঁচাতে একতাবদ্ধ থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ফিফা প্রেসিডেন্ট। তবে সুপার লিগের উদ্যোক্তারাও বলছেন ফুটবল বাঁচানোর কথা। নতুন এই প্রতিযোগিতার প্রথম প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ সমালোচনাকারীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, 'এই টুর্নামেন্ট চালুর অন্যতম কারণ হচ্ছে ফুটবলকে বাঁচানো। ফুটবল বাঁচানো বলতে সবাইকে বাঁচানো। আমরা যত দ্রুত সম্ভব সুপার লিগ শুরু করে দিতে চাই। উয়েফা ও ফিফার সঙ্গে কথাও বলব। তবে এটা বুঝতে পারছি না যে, তারা কেন এত ক্ষুব্ধ।'



দেশে দেশে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ

ফুটবল ক্লাবের জনপ্রিয়তা ও আর্থিক উন্নতির প্রধান উৎস বলা হয় সমর্থকদের। তবে সুপার লিগে যোগ দেওয়া অধিকাংশ ক্লাব ওই সমর্থকদের কাছ থেকেই বড় বিরোধিতার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের ছয়টি ক্লাবের সমর্থকরা ব্যাপক ক্ষুব্ধ। লিভারপুল, ম্যানইউ, ম্যানসিটি, টটেনহাম, আর্সেনাল ও চেলসি- সব ক্লাবের প্রাঙ্গণেই দর্শক ও সমর্থকরা প্রতিবাদে জড়ো হয়েছেন। সোমবার রাতে লিডসে খেলতে গিয়েছিল লিভারপুল। সেখানে উভয় দলের সমর্থকরাই 'সে নো টু সুপার লিগ', 'রিপ ফুটবল'সহ নানান স্লোগান লিখে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। লিডসের খেলোয়াড়রা প্রতিবাদ জানিয়ে বিশেষ জার্সিও পরেছেন। এ ছাড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে এভারটনসহ প্রিমিয়ার লিগে আরও কয়েকটি ক্লাবও। ইতালিতে জুভেন্তাসের জার্সি পুড়িয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন সমর্থকরা। স্পেনে বার্সেলোনা সমর্থকরা ন্যু ক্যাম্পের সামনে 'নো টু সুপার লিগ' লেখা ব্যানার নিয়ে দাঁড়ান। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যমে প্রিয় দলের সুপার লিগে অংশগ্রহণের বিরোধিতা করে টুইট করেছেন সব ক্লাবের সমর্থকরাই। বেশিরভাগই ফুটবল মরে গেছে ধরনের বার্তা দিয়ে পোস্ট করেছেন।



তিন ইংলিশ ক্লাবের ইউটার্ন!

সুপার লিগে নাম লেখানো ১২ ক্লাবের ছয়টিই ইংল্যান্ডের। আর বিচ্ছিন্ন এই টুর্নামেন্টটির বিরুদ্ধে সরকারিভাবে প্রথম সরাসরি বিরোধিতাও এসেছে যুক্তরাজ্যেই। আবার সমর্থকদের কাছ থেকেও সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান প্রতিবাদের মুখোমুখি হয়েছে লিভারপুল, ম্যানইউর মতো ক্লাবগুলো। সরকার ও সমর্থকদের এই বিরোধিতায় ভীষণ চাপে পড়েছে ইংলিশ ক্লাবগুলো। ব্রিটিশ মিডিয়ার খবর, সুপার লিগে থাকার বিষয়টি নিয়ে এখন দোটানায় পড়ে গেছে অন্তত তিনটি ক্লাব- চেলসি, ম্যানসিটি ও লিভারপুল। গার্ডিয়ান ও স্পোর্টস মেইল নিশ্চিত করেছে, চেলসি ও ম্যানসিটি সুপার লিগে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে দোদুল্যমান। আর দ্য টাইমস জানিয়েছে লিভারপুলের ভেতর 'সংশয় বেড়ে যাওয়া'র। এই তিনটি ক্লাবের একটি এরই মধ্যে সুপার লিগে থাকা না থাকার সিদ্ধান্ত নিতে বৈঠক ডেকেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের আরেক দৈনিক ডেইলি স্টার। সমর্থকদের অব্যাহত প্রতিবাদের মুখে বেশ চাপে থাকায় অন্তত একটি ক্লাব সুপার লিগ থেকে সরে আসা প্রায় নিশ্চিত বলে জানিয়েছে দ্য টাইমস।



ঝুঁকিতে রিয়াল, চেলসি ও সিটি

পরিকল্পনা অনুযায়ী সুপার লিগ মাঠে গড়ালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। আপাতত উয়েফা আয়োজিত ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর টুর্নামেন্টটির সঙ্গেই আছে সবাই। এর মধ্যে চলতি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে জায়গা করেছে সুপার লিগে নাম লেখানো তিনটি ক্লাব- রিয়াল মাদ্রিদ, চেলসি ও ম্যানসিটি। যেহেতু এই দলগুলো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে, তাই এখনই তাদের বাদ দেওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন উয়েফার এক্সিকিউটিভ কমিটির মেম্বার জাসপার মলার, 'এদের অবশ্যই বাদ দিতে হবে। আমি আশা করছি শুক্রবারেই সেটা হয়ে যাবে। এরপর কীভাবে মৌসুম শেষ করা যায় ভাবা যাবে।' ধারণা করা হচ্ছে, শুক্রবার উয়েফার নির্বাহী কমিটির যে মিটিং আছে সেখানে বিষয়টি নিয়ে শোরগোল উঠতে পারে। রিয়াল, চেলসি ও সিটির মতো ঝুঁকিতে আছে আর্সেনাল আর ম্যানইউও, যারা সুপার লিগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও ইউরোপা লিগের সেমিফাইনালিস্ট।



সরকারপ্রধানরাও সুপার লিগের বিপক্ষে

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন প্রথম দিনই বলেছেন, কীভাবে তার দেশের ক্লাবগুলোকে আটকানো যায় সেই পথ খোঁজা হচ্ছে। এরই মধ্যে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে কাজ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। গতকাল বেশ কয়েকটি সমর্থক গোষ্ঠীর সঙ্গে বৈঠকও করেছেন জনসন। সেখানে তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, সুপার লিগে ইংলিশ ক্লাবগুলোর অংশগ্রহণ ঠেকাতে সম্ভব সবকিছুই তিনি করবেন। এমনকি শেষ অস্ত্র হিসেবে ইংল্যান্ডের মাটিতে সুপার লিগের খেলা না হতে দেওয়ার হুমকিও দেন তিনি। ওদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোনও সুপার লিগের বিরোধিতা করে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। ফ্রান্সের পিএসজিসহ কোনো ক্লাব বিচ্ছিন্ন এই টুর্নামেন্টে অংশ না নেওয়ায় তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে টুইট করেন মাক্রোন।



'হেটার্স লিগে' ক্লপ, গার্দিওলা

লিভারপুল ও ম্যানসিটি সুপার লিগে থাকলেও ক্লাব দুটির প্রধান কোচ এর বিরোধী। স্থায়ী ১৫টি ক্লাব প্রতিবছরই খেলবে বলে যে নিয়ম করা হয়েছে, সেটির প্রসঙ্গ তুলে গার্দিওলা বলেন, 'যেখানে প্রচেষ্টা ও পুরস্কারের সম্পর্ক নেই, সেটা খেলা হতে পারে না। যেখানে সফলতা নিশ্চিত, যেখানে পরাজয় কোনো ব্যাপার নয়, সেটা খেলা নয়।' লিভারপুল কোচ ক্লপ এমন কোনো প্রতিযোগিতার বিরোধিতা করেছেন আগেই। গতকাল সে কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেন, 'আমার মত এখনও আগেরটিই আছে। মানুষও এটা নিয়ে খুশি নয়।' রিয়াল কোচ জিনেদিন জিদান অবশ্য কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। কোচদের বাইরে এ বিষয়ে সরব হয়েছেন কয়েকজন সাবেক ফুটবলার। এরমধ্যে আছেন ডেভিড বেকহ্যাম, রিও ফার্ডিনান্ডরা। এছাড়া বর্তমান ফুটবলারদের মধ্যে মেসুত ওজিল, আন্দের হেরেরা সুপার লিগ নিয়ে নিজেদের অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন।



মজা নিচ্ছে 'ছোট'রা

'ছোট' দলগুলোর খেলা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয় না, আকর্ষণও থাকে না, আয় কম হয়- এমন একটি বার্তা দিতে চেয়েছে সুপার লিগের উদ্যোক্তারা। স্বভাবতই এ নিয়ে ক্ষুব্ধ ওই ক্লাবগুলো। তবে নিজেদের অসন্তুষ্টি প্রকাশে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে ইংল্যান্ডের দুটি ক্লাব। সুপার লিগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার এক দিনের মধ্যে লিভারপুলের বিপক্ষে খেলতে নেমেছিল লিডস ইউনাইটেড। খেলা শুরুর আগে 'ফুটবল ইজ ফর ফ্যানস' লেখা জার্সি পরে ওয়ার্মআপ করেন লিডসের খেলোয়াড়রা। ম্যাচে লিভারপুলকে রুখে দিয়ে ১-১ ড্র করে লিডস। এরপর অফিশিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে টুইট করা হয়, সুপার লিগের দলের সঙ্গে ১-১ ড্র করেছে লিডস। প্রিমিয়ার লিগের আরেক ক্লাব উলভসও মজা করতে ছাড়েনি। ২০১৮-১৯ মৌসুমে দলটি যখন সপ্তম হয়, প্রথম ছয়টি স্থানে ছিল সুপার লিগে যোগ দেওয়া ছয় দল। ওই আসরের পয়েন্ট টেবিল ব্যবহার করে তারা টুইট করে, ২০১৮-১৯ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল উলভস!

মন্তব্য করুন