আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর দিনগুলো স্বপ্নের মতো কাটছিল তাসকিনের। জীবনে খারাপ সময়ের কথা তখন কল্পনাও করেননি। তিন বছর পরই ইনজুরি এবং অফ ফর্মে ক্যারিয়ারের প্রায় শেষ দেখে ফেলেছিলেন জাতীয় দলের এ পেসার। খারাপ সময়ে অবহেলা আর উপেক্ষার শিকার হওয়ার কথা এবং কঠোর পরিশ্রম করে ফিরে আসার তাসকিনের এই গল্প শুনেছেন আলী সেকান্দার

সমকাল: ২০১৭ সালে টেস্ট অভিষেক, মাঝের খারাপ সময়, শ্রীলঙ্কায় দারুণ বোলিং, কীভাবে সম্ভব করলেন?

তাসকিন: আমি চাই সব সময় ভালো পারফর্ম করতে। মাঠে ও মাঠের বাইরে শতভাগ দিতে। পিচ কেমন হবে, দল নির্বাচন বা উইকেট পাওয়া না পাওয়া, ক্যাচ ড্রপ হওয়া এগুলোর নিয়ন্ত্রণ আমি করতে পারব না। কিন্তু মাঠের বাইরে সর্বোচ্চটা দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে তো বাধা নেই। এজন্য জীবন যাপন, পরিশ্রম, মনস্তাত্ত্বিক এবং খাবার সব ব্যাপারে শৃঙ্খলা নিয়ে এসেছি। জীবনে শৃঙ্খলা ফেরায় এটা সম্ভব হয়েছে।

সমকাল: শৃঙ্খলা আনা দরকার- এই উপলব্ধিটা কখন এলো?

তাসকিন: গত তিন বছরের বাস্তবতায় এই উপলব্ধি। ২০১৪ সালে অভিষেকের (ওয়ানডেতে) পরের তিন বছর ছিল স্বপ্নের মতো। ভালো খেলছিলাম, যেখানেই যাই খ্যাতি, টাকা, বিজ্ঞাপন, অ্যান্ডোর্সমেন্ট সবকিছু পাচ্ছিলাম। কখনও মনেই হয়নি ইনজুরি বা অফ ফর্ম বলে কিছু আছে। কারণ ওগুলোর স্বাদ তখনও পাইনি।

সমকাল: তার মানে হলো বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে এ উপলব্ধি?

তাসকিন: হ্যাঁ। ওই তিন বছর পার করতে খুব কষ্ট হয়েছে। ভালো খেলতে পারছি না, তার মধ্যে চোট... ধীরে ধীরে বাস্তবতা বুঝতে পারলাম। তার মনে এই নয় যে, এখন বাস্তব দুনিয়ার সব জেনে গেছি। একজন ক্রিকেটারের জীবন যাপন কেমন হওয়া উচিত, কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়, সেটা বুঝেছি। এজন্য সচেতনতা, প্রসেস, শৃঙ্খলায় উন্নতি এসেছে। বলতে পারেন উন্নতি করতে বাধ্য হয়েছি।

সমকাল: দলের বাইরে থাকা অবস্থায় এলো করোনা; আর সবকিছু থমকে যাওয়া ওই সময়েই জেগে উঠলেন আপনি...?

তাসকিন
: যখন অফ ফর্ম বা ইনজুরি ছিল, তখন আমি অনেক জায়গায় অবহেলার শিকার হয়েছি। ওই ব্যপারগুলো মনের ভেতরে ছাপ ফেলে দিয়েছিল। নিজের ওপর নিজে জেদ করলাম, সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। সামর্থ্য দেখাতে হবে। এত সহজে শেষ হয়ে যেতে চাইনি। তাই কভিডের মধ্যে নিজেকে তৈরি করেছি। লকডাউনের ভেতরে ফিটনেস ট্রেনার দেবু দা, সাইকিয়াট্রিস্ট সাবিদ ভাই, খালেদ মাহমুদ সুজন স্যার এবং মাহাবুব আলী জাকি স্যারকে ফোন দিয়ে প্রায় ভিক্ষা চাওয়ার মতো করে বলেছি, 'আমাকে একটু সময় দেন। নইলে আমি শেষ হয়ে যাব।' দেবু দার জিম বন্ধ ছিল, শুধু আমার একার জন্য তিন মাস জিম খুলেছেন। সাবিদ ভাই মোটিভেট করেছেন। সুজন স্যার আর জাকি স্যার স্কিল দেখেছেন। গ্যারেজে বোলিং করে উনাদের ভিডিও করে পাঠাতাম। উনারা দেখে দেখে ঠিক করে দিতেন।

সমকাল: ভালো করায় নতুন করে চ্যালেঞ্জও তো তৈরি হলো?

তাসকিন: হ্যাঁ, এটাও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। একটা দুটি সিরিজ ভালো খেলা মানেই তো আমার লক্ষ্য অর্জন হয়ে যায়নি। ক্যারিয়ারের শেষ দিন পর্যন্ত নিজেকে এগিয়ে নিতে হবে। এজন্য জীবনটাকেই পাল্টে ফেলেছি। খাদ্যাভ্যাস, ট্রেনিং প্যাটার্ন, পরিবার, বাইরে চলাফেরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছি। আমি চাই প্রতিটি সিরিজে আগের সিরিজ থেকে ভালো খেলতে। আমার স্বপ্ন বিশ্বমানের বোলার হওয়া। বড় বোলার হওয়া। আমি শুধু দুই সিরিজের জন্য এত কষ্ট করছি না।

সমকাল: নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা সিরিজের কোনটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

তাসকিন: আসলে দুটো দুই রকম। আমি সব সংস্করণে একই ফোকাস রাখার চেষ্টা করছি। কতটুকু প্রয়োগ করতে পারছি, জানি না। আমি বল করার জন্য বল করছি না। মন থেকে বল করছি। দেশের হয়ে যতদিন খেলব, চেষ্টা করব প্রতিটি বল সেরাটা দিয়ে করার।

সমকাল: সামনে তো অনেক খেলা?

তাসকিন: আমি প্রতিটি সিরিজেই উন্নতি করার চেষ্টা করব। ১৪০ বা ১৪১ কিলোমিটার গতিতে বল করব। সঙ্গে সুইং, ভেরিয়েশনে উন্নতি করব। বিশ্ব মানের বোলার হতে হলে এগুলো করতেই হবে। চেষ্টা করব যখন যেটা খেলব সেরাটা দিয়ে খেলতে।

সমকাল: ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ খেলতে না পারা নিশ্চয়ই এখনও কষ্ট দেয়...?

তাসকিন: অবশ্যই। বিশ্বকাপ কে না খেলতে চায়। বিশ্বকাপের তিন মাস আগে আমি বিপিএলের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ছিলাম। শেষ ম্যাচে গোড়ালি মচকে নিউজিল্যান্ডে যেতে পারিনি; বিশ্বকাপও খেলা হয়নি। তবে আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে। ওগুলো মিস না হলে, আজকের উপলব্ধি হতো না।

সমকাল: বোলিং কোচ ওটিসের কাছ থেকে কেমন সাপোর্ট পান?

তাসকিন: তিনি খুব টেকনিক্যাল। তবে খুব বড় কানো পরিবর্তন করেন না। তিনি আমাকে মাঠে বেশ সময় দিচ্ছেন। রিস্ট পজিশন আর একটু ভালো করতে, অ্যাকুরেসি আনতে সাহায্য করছেন। রিদম ও ফিট থাকলে ১৪০ কিমি গতিতে বল হবেই।

মন্তব্য করুন