করোনা, করোনা, করোনা- ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের পর বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া এক মারণ ভাইরাস আদৌ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই ধরায়। তাতে জীবনের সঙ্গে থমকে যায় ক্রীঙ্গাঙ্গনও। তালগোল লাগে ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিশ্বের বিভিন্ন খেলার সূচিতে। সেই জট খুলতে পিছিয়ে পড়ে বড় বড় টুর্নামেন্ট। এই যেমন ফুটবলের মহাযজ্ঞ ইউরো। ৬০ বছর পূর্তিতে জাঁকজমক করেই ২০২০ সালে হওয়ার কথা ছিল আসরটি। কিন্তু পিছিয়ে এলো '২১-এর মাঝে। তবুও সব ভুলে এখন ইউরোপ মেতেছে ইউরো-উৎসবে। যে উৎসব ছুঁয়েছে গোটা বিশ্বকে, প্রাণে লেগেছে ফুটবলদোলা।

১১ জুন থেকে ১১ জুলাই; মাসব্যাপী ফুটবলের এই রোমাঞ্চ বাংলাদেশের মানুষের কাছেও ভিন্ন এক আবহে হাজির হলো। করোনার ক্রান্তিকালে গম্ভীর মনের আঙিনায় ইউরোই পারে একটুখানি রসদ জোগাতে। তা ছাড়া ফুটবলের মধুমাসেই এলো ইউরো। এবার বর্ষার ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর আম-কাঁঠালের সুবাসের সঙ্গে ফুটবলে হারিয়ে যেতেও নেই মানা। হয়তো কখনও প্রিয় দলের ম্যাচ দেখতে উঠতে হবে মাঝরাতে, জাগতে হবে ঘুম ছেড়ে। তার পরও থাকবে আনন্দ, থাকবে বেদনা, আবার উপভোগ্য কিছু সময়।

রোম টু লন্ডন ইউরোর দীর্ঘ ভ্রমণ ১১ দেশের ১১ শহরে। ২০১২ সালে মিশেল প্লাতিনির উয়েফার মিটিংয়ে রাখা প্রস্তাব অনুসারে 'ইউরো সিজন ১৬' হবে আরও মনোমুগ্ধকর। মূলত প্রতিযোগিতার ৬০ বছর পূর্তিতে রাখা হয়নি কোনো একক আয়োজক দেশ। রোম থেকে আজ যাত্রা শুরু হওয়া ইউরোর মহাযজ্ঞ শেষ হবে লন্ডনে। প্রথম দিন মুখোমুখি হবে তুরস্ক-ইতালি। শক্তিমত্তায় এই ম্যাচের পরিস্কার ফেভারিট ইতালি। যারা কিনা গত কয়েক মেগা টুর্নামেন্টে পারেনি সেভাবে আলো ছড়াতে। এমনকি সর্বশেষ ফুটবল বিশ্বকাপেও খেলার সুযোগ পায়নি তারা। ২০১৬ ইউরোয় কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয় ইতালি। তবে দুই মহাআসরে মহত্ব দেখাতে না পারলেও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ দ্যুতি ছড়াচ্ছে আজ্জুরিরা। নিজেদের শেষ ছয় ম্যাচের একটিতেও হারেনি ইতালি। দলে আছে বারেল্লা, ইমোবিলে, লোকাতেল্লির মতো একাধিক তারকা। সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে এসি মিলান মাতানো গোলকিপার দন্নারুম্মার ওপর। স্যানল গুনেজের তুর্কিও পারে চমক দেখাতে। তারুণ্যনির্ভর দল নিয়ে এবার ইউরো মিশনে নামছে তারা। মূল মঞ্চে পা রাখার আগে এরই মধ্যে নিজেদের আগমনীর জানান দিয়েছে দলটি। গত বছরের শেষ দিকে জার্মানি, ক্রোয়েশিয়ার মতো প্রতিপক্ষকে আটকে দেয় তারা। আগের বছর বিশ্বজয়ী ফ্রান্সকেও জিততে দেয়নি। সেক্ষেত্রে তুর্কিকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। ২৪ দলের ধ্রুপদী এই লড়াইয়ে শিরোপা দৌড়ে এগিয়ে রাখা যায় ফ্রান্স, পর্তুগাল, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, ইতালিকে। তবে আন্ডারডগের খাতায় থাকলেও বিস্ময়কর গল্প লিখতে পারে স্পেন, রাশিয়া, সুইজারল্যান্ডের মতো দেশ।

সব ভালোর আবার মন্দও থাকে। এই যেমন ইউরো কারও জন্য প্রাপ্তির কারও হয়ে থাকবে হতাশার। তবে এর মাঝে যারা ক্যারিয়ারের ইতি টানবে তাদের হয়তো আসরটা একটু বেশিই বিশেষ। হতে পারে পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়নো রোনালদো কিংবা ক্রোয়েশিয়ার লুকা মডরিচ, হতে পারে পোল্যান্ডের রবার্ট লেভানডস্কির শেষ ইউরো। তাই তো ফুটবলপ্রেমীদের বাড়তি নজরও থাকবে তাদের দিকে। আবার কিছু চেনামুখকে মিস করবেন অনেকে। দেখা যাবে না স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপ জেতা ডিফেন্ডার সার্জিও রামোসকে, নেই ইব্রাহিমোভিচ, বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে খেলা ক্লাব ফুটবল মাতানো তরুণ হাল্যান্ডের দেশ নরওয়ে পায়নি ইউরোর টিকিট। প্রতিযোগিতাটা কেবল ইউরোপের গি তে হওয়ায় সুযোগ নেই সময়ের বড় দুই তারকা লিওনেল মেসি, নেইমারের ফুটবলশৈলী দেখারও। তবু রোনালদো, এমবাপ্পে, লেভানডস্কি, গ্রিজম্যান, মুলারদের পানে চেয়ে ফুটবলবিশ্ব।

গ্যালারিতে বসেই দেখা যাবে তাদের দ্বৈরথ। নেই আর ক্লোজডোর, উয়েফা খুলে দিল স্টেডিয়ামের দ্বার। যদিও দর্শকদের মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। উয়েফা জানিয়েছে, আয়োজক দেশগুলো তাদের ধারণক্ষমতার ২৫ থেকে ৩০ ভাগ দর্শক রাখতে পারবে। তবে নিজ দেশের সরকারে বিধিনিষেধ থাকলে এটা কম-বেশি হতেও পারে। যেমন সেন্ট পিটার্সবার্গ ও বাকু আশা করছে ৫০ শতাংশ দর্শক ঢোকানোর। আবার হাঙ্গেরি বলছে, পুসকাস অ্যারেনায় তারা শতভাগ দর্শক রাখতে প্রস্তুত।

বদলে যাওয়া বিশ্বে নতুন করে আবার ফুটবলের মিলনমেলা। যে মেলায় মিলবে কোটি প্রাণ, জাগবে পৃথিবী। করোনার দুঃশাসন ভুলে একসঙ্গে উঠবে গোল-ধ্বনি। তারই মাঝে থাকবে কারও অতৃপ্তি, আক্ষেপ। ৩০ দিন পর ট্রফিটা যখন এক দলের হাতে যাবে তখন সব আফসোস ভুলে বাকি ২৩ দলও দেবে একটুখানি করতালি, বিজয়ীদের জানাবে অভিনন্দন। এটাই যে ফুটবল, এটাই ফুটবলের রূপ। যে রূপের পাগল বিশ্ববাসী।

বিষয় : ইউরো ফুটবল

মন্তব্য করুন