আকাশে রোদ যেন কৃষকের মুখে হাসির ঝিলিক। মেঘ দেখলেই বুকটা কেঁপে ওঠে, দুরুদুরু করতে থাকে ঝড়ের আশঙ্কায়। এমন অবস্থা সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে। সোনামাখা রোদে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের হলুদ ধানের শীষ ঝিকিয়ে উঠেছে। পাকা ধানের ম-ম গন্ধে মাতোয়ারা হাওরপাড়ের প্রতিটি জনপদ। কৃষকরা ব্যস্ত কে, কীভাবে ধান কেটে ঘরে আনবেন। কৃষকের ধ্যানজ্ঞান সবই এখন হাওরকে ঘিরেই।

সুনামগঞ্জের হাওরে হাওরে শুরু হয়েছে এখন ধান কাটার উৎসব। এ অঞ্চলে পহেলা বৈশাখ থেকে ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়ে থাকে বহুকাল আগে থেকেই। কিন্তু গত কয়েক বছর হয় আগাম জাতের ধান আবাদ হওয়ায় কিছু ধান আগেই কাটা-মাড়াই শুরু হয়। এখন হাওরজুড়ে চলছে সেটিই। গত শুক্রবার ধান কাটা উৎসব হয়েছে জামালগঞ্জের ছনুয়ার হাওরে। উপস্থিত ছিলেন কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মানবসম্পদবিষয়ক সম্পাদক শামীমা শাহরিয়ার এমপি, জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন। এর আগে বৃহস্পতিবার উৎসব হয়েছে বিশ্বম্ভরপুরের করচার হাওরে। বুধবার তাহিরপুরের শনির হাওরে ধান কাটা উৎসবে মেতেছিলেন কৃষক। পহেলা এপ্রিল ধান কাটা উৎসব হয়েছে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের হাওরে। উৎসবে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়েছিলেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকও।

ধান কাটার এই মৌসুমে প্রতিবছরের মতো এবারও আগাম বন্যা, ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কার পাশাপাশি হাওরের ঝাঙ্গালগুলো (মাটির সড়ক বা গোপাট) দিয়ে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় কাটা ধান ও বহন করা নিয়ে চিন্তিত কৃষক।

শনির হাওরপাড়ের মধ্য তাহিরপুরের কৃষক রফিকুল ইসলাম বললেন, ৪০-৫০টি গ্রামের কৃষক শনির হাওরে চাষাবাদ করেন। এমনও গ্রাম আছে, কয়েক কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে জমিতে যেতে হয় তাদের। হাওরের ৩০-৩৫টি ঝাঙ্গালের কোনটা দিয়ে ঠেলাগাড়িও চলে না। হাজার হাজার মণ ধান কৃষক বহন করবে কীভাবে। ধান বহনের দুর্ভোগের জন্য অনেকে কম দামে ধানখলাতেই ফড়িয়াদের হাতে তুলে দেন। হাওরপাড়ের অন্য কৃষকরা জানালেন, ধান কাটা শ্রমিকের অভাব আছে হাওরে হাওরে। হারভেস্টার মেশিনের স্বল্পতা রয়েছে প্রত্যেক হাওরে।

সুনামগঞ্জ জেলা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক এনাম আহমদ বলেন, জেলার বেশিরভাগ বড় হাওরেই কাটা ধান বহনের সংকট রয়েছে। ছোট ছোট খাল ভরাট হয়ে গেছে। হাওররক্ষা বাঁধের কাজ করার সময়ও খালগুলো সচল করার চিন্তা করা হয় না। হাওরের ঝাঙ্গালগুলোকেও ডুবন্ত পাকা সড়ক করা হচ্ছে না। এ কারণে কাটা ধান বহনের দুর্ভোগ জেলাজুড়েই রয়েছে।

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, শনির হাওরের ছোট-বড় ২৫টি জাঙ্গাল চিহ্নিত করে স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে উন্নয়ন প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।

জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, জেলায় এবার নতুন আরও হারভেস্টার মেশিন এসেছে। অন্য জেলা থেকে শ্রমিক আনারও চেষ্টা আছে। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় পাওয়া গেলে বেশিরভাগ ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে।

সুনামগঞ্জে এবার তিন লাখ ২৩ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে ধানের চাষাবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৬০ হাজার টন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক ফরিদুল হাসান জানিয়েছেন, হাইব্রিড কিছু ধান কাটার মধ্য দিয়ে এই জাতের ধান কাটা শুরু হয়েছে। ২০ থেকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে ২৮সহ অন্যান্য হাইব্রিড ধানা কাটা শেষ হয়ে যাবে। ২৯ জাতের ধানসহ কিছু ধান কাটতে ১০ মে পর্যন্ত সময় লাগবে। এবার ধানের ফলন ভালো হওয়ায় উৎপাদন বেশি হবে বলে দাবি তার।

মন্তব্য করুন