সুনামগঞ্জে তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীতদের ভরাডুবি হয়েছে। ১৭ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলের মনোনীত দুই, বিদ্রোহী পাঁচ, স্বতন্ত্রের মোড়কে বিএনপি পাঁচ, জাপা দুই, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম এক এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী দুই ইউনিয়নে জয়ী হয়েছেন। কোনো কোনো ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী চার-পাঁচ নম্বর অবস্থানেও ছিলেন।

দলের বিপর্যয়ের জন্য অযোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন, মনোনয়ন বাণিজ্য, উন্নয়ন কাজে দলীয় কর্মীদের যুক্ত না করা, দলের এমপি না থাকাসহ নানা কথাই বলেছেন দায়িত্বশীলরা। কেউ কেউ বলেছেন, এমন ফলাফলে লজ্জাবোধ করছেন, সংগঠনের দায়িত্বশীলদের দোষারোপও করেছেন তারা।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ৯ ইউনিয়নের মধ্যে কোরবাননগর ও মোহনপুর ছাড়া অন্য কোনো ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলতে পারেননি। কোরবাননগরে স্বতন্ত্র  প্রার্থী আবুল বরকত ৩০৫২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। নিকটতম আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী শামস উদ্দিন ২৯২১ ভোট পান। মোহনপুরে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মইনউল হক ৩১৭২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সীতেশ রঞ্জন দাস তালুকদার ৩০৩০ ভোট পান।

শান্তিগঞ্জের পশ্চিম বীরগাঁও, পাথারিয়া, পূর্ব পাগলা ও দরগাপাশা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী তিন, চার নম্বর হয়েছেন। এ উপজেলায় অবশ্য আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। তারা হলেন পশ্চিম পাগলায় জগলুল হায়দার ও পূর্ব বীরগাঁওয়ে রিয়াজুল ইসলাম।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালাম বলেন, সদর ও শান্তিগঞ্জে ৫ বছর আগের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত ৫ জন নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার তিনজন কমেছে। মনোনীত দুইজন জয়ী হয়েছেন। এ বিপর্যয়ের জন্য তিনি উন্নয়ন কাজে দলীয় কর্মীদের সম্পৃক্ত না করাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, সুনামগঞ্জ সদরে দীর্ঘদিন বিএনপি নেতা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যও নেই চার মেয়াদ হয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তৃণমূল সমর্থকরাও দলের প্রতি বিমুখ। নতুন কর্মীও তৈরি হচ্ছে না। এসব বিষয় কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদেরও অবহিত করা হয়েছে। নির্বাচনে এ কারণে দলীয় প্রার্থীদের পরাজয় হয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম বললেন, 'ভোট বিপর্যয়ে আমরা লজ্জিত-বিব্রত, তবে হাইব্রিড বা নবাগতরা খুশি।' পরাজয়ের জন্য প্রার্থী মনোনয়নে ভুল সিদ্ধান্ত অর্থাৎ অযোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়াকে দায়ী করে তিনি বলেন, দলীয় কোন্দলেও ক্ষতি হয়েছে, প্রার্থীর সঙ্গে থেকেছে অথচ ভোট দেয়নি- এমন ঘটনাও ঘটেছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এনামুল কবির ইমন বললেন, তৃণমূলের সুপারিশেরও ব্যত্যয় ঘটেছে কোনো কোনো ইউনিয়নে। সুনামগঞ্জ সদরের জাহাঙ্গীরনগর, গৌরারং, সুরমা ও মোহনপুর ইউনিয়নে দলের মনোনীত প্রার্থীর নাম তৃণমূল থেকে যায়নি, আমরা জেলা থেকেও দেইনি। সদর উপজেলা আওয়ামী লীগেরও দুর্বলতা ছিল।

জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুট বললেন, 'প্রার্থী মনোনয়নের পর প্রচারণায় যুক্ত হতে বিব্রত হয়েছিলাম যোগ্যরা মনোনয়ন না পাওয়ায়। এরপরও প্রচারণায় গিয়েছি। ভোটের পর রীতিমতো লজ্জাবোধ করছি।' তিনি বলেন, প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন, উপজেলা হয়ে জেলা কমিটিতে আসে, জেলা কমিটি বসে সিদ্ধান্ত নেবার কথা। কিন্তু প্রার্থী নিয়ে জেলা কমিটি কোনো আলোচনা করেনি। জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ঢাকায় বসে নিজেদের ইচ্ছামতো তালিকা কেন্দ্রে সুপারিশ করে পাঠিয়েছেন। মনোনয়ন বাণিজ্যও হয়েছে। জনপ্রিয়-যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন পাননি বলে বিদ্রোহী প্রার্থী বেশি হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান একদিনও প্রচারণায় যুক্ত হননি। তিনি সুনামগঞ্জে আসেননি। এমন অদায়িত্বশীল আচরণে দল ও দলের প্রতীক নৌকার অসম্মান হয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান গণমাধ্যমকর্মীদের বললেন, 'আমি কাদা ছোড়াছুড়ি  করব না। ভুল কার হয়েছে ধরা পড়বে। যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা ইউনিয়ন-উপজেলা কমিটির দায়িত্ব। আমরা তাদের তালিকায় সুপারিশ করেছি। আমি ভার্চুয়ালি সব ইউনিয়নে প্রচারণায় যুক্ত হয়েছি।'

মন্তব্য করুন