সুদহার বাড়ছে বিদেশি ঋণের

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন

বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিকরণ অনুযায়ী বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর থেকে বিদেশ থেকে নেওয়া ঋণের সুদহার বাড়ছে। এ অবস্থায় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে যথাসম্ভব নমনীয় ঋণ ও অনুদান আদায়ের কৌশল নিয়েছে সরকার।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ এখন নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ। তাছাড়া গত বছর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশকে মনোনয়ন দিয়েছে জাতিসংঘ। ২০২৪ সাল থেকে চূড়ান্তভাবে এলডিসি থেকে বের হয়ে যাবে বাংলাদেশ। এলডিসি থেকে বের হলে নমনীয় ও কম সুদের ঋণপ্রাপ্তি এখনকার চেয়ে কমে যেতে পারে। এ অবস্থায় জাতিসংঘের সবুজ জলবায়ু তহবিলসহ নতুন উৎস থেকে নমনীয় ঋণ পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবে ইআরডি।

২০১৫ সালের জুলাই মাসে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়। নিম্ন আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে এতদিন শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে ঋণ পেতে। ৩৮ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত সময় এ ঋণ পরিশোধের সুযোগ ছিল। ঋণের রেয়াতকাল ছিল ৬ থেকে ১০ বছর। নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পর থেকে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের সুদহারসহ ঋণের শর্ত বেড়েছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের ঋণের সুদহার প্রায় ২ শতাংশ। এ ঋণ ৫ বছর রেয়াতকালসহ ৩০ বছরে পরিশোধ করতে হয়।

নিম্ন আয়ের দেশ হিসেবে জাপানের কাছ থেকে সবচেয়ে কম সুদহারে ঋণ পেত বাংলাদেশ। ঋণের সুদহার ছিল শূন্য দশমিক ০১ শতাংশ। ঋণ পরিশোধের সময় ছিল ৪০ বছর এবং সঙ্গে ১০ বছর রেয়াতি সুবিধা পেত বাংলাদেশ। কিন্তু জাপানের ঋণের সুদহার এখন বেড়ে হয়েছে শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ। রেয়াতকাল একই থাকলেও ঋণ পরিশোধের সময় ১০ বছর কমেছে। এখন জাপানের ঋণ ৩০ বছরে পরিশোধ করতে হয়।

তবে নিম্ন আয়ের দেশ হওয়ার পর এখনও পর্যন্ত ঋণের শর্তে কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসেনি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটি সাধারণ ২ শতাংশ হারে অথবা লাইবরের ওপর ভিত্তি করে ঋণ দেয় বাংলাদেশকে। পাঁচ বছরের রেয়াতিকালসহ এই ঋণ পরিশোধ করতে হয় ২৫ বছরে।

ইআরডি সচিব মনোয়ার আহমেদ জানান, নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার কারণে নমনীয় ঋণ কমে যাচ্ছে। কিন্তু এলডিসি থেকে চূড়ান্ত উত্তরণ অর্থাৎ, ২০২৪ সাল পর্যন্ত কীভাবে সহজ শর্তের ঋণ নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে কর্মপন্থা তৈরি করা হচ্ছে। এরপরও ২০২৪ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো যাতে নমনীয় ঋণ হঠাৎ করে বন্ধ না করে, সে বিষয়ে কৌশল নেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সাল পববর্তী নমনীয় ঋণ পেতে অন্য দেশগুলোকে নিয়ে কর্মকৌশল নির্ধারণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের ঋণ এলডিসি উত্তরণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। দুই বছরের বেশি সময়ে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ১৬৫ ডলারের বেশি হলে আগের মতো সহজ শর্তে বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশন ডেভেলমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডা) ঋণ পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ গত জুলাই মাসের ১ তারিখ থেকে আইডা গ্যাপ কান্ট্রিতে চলে গেছে। তবে বাংলাদেশ এখনও আইডা সহায়তা পাবে। কিন্তু আগের মতো সহজ শর্তে পাবে না। ফলে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশের সঙ্গে ১ দশমিক ২৫ সুদহার যোগ হয়েছে। রেয়াতিকাল কমে হয়েছে ৫ বছর। রেয়াতিকালসহ টাকা ফেরত দেওয়ার সময় হয়েছে ৩০ বছর। আইডা গ্যাপের পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশ সহজ শর্তে আইডা ঋণও পাবে আবার কঠিন শর্তে আইবিআরডি ঋণও পাবে। এ সময় কঠিন শর্তের ঋণ ব্যবহারের ও ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা অর্থনীতিতে আছে কি-না সে বিষয়ে একটি পর্যালোচনা হয়। এরপর বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের আইডার পরিবর্তে বিশ্বব্যাংকের আরেকটি সহযোগী সংস্থা আইবিআরডিতে (পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংক) চলে যাবে বাংলাদেশ। তবে আইবিআরডিতে যেতে আরও ছয় বছর লাগতে পারে। ফলে আরও দুটি আইডা-১৯ এবং আইডা-২০ ঋণ পাবে বাংলাদেশ। এ সময় ঋণের সুদহার এখনকার চেয়ে আর বাড়বে না। এরপর পুরোপুরি আইবিআরডি ঋণ নিতে হবে বাংলাদেশকে।

তিনি আরও বলেন, আইবিআরডি সুদহার নির্ভর করবে মেয়াদ এবং বাজারের ওপর। অর্থাৎ, লাইবরের ভিত্তিতে সুদহার নির্ধারণ হবে। সুদহার বেশি হলেও ঋণ নেওয়ার কোনো সীমা থাকে না। ফলে এতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। যেমন তিন বছরের আইডা-১৮-এ ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঋণ নেওয়ার সীমা নির্ধারণ করা আছে। আইবিআরডি ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১৬ থেকে ১৮ বিলিয়ন পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। ফলে ঋণ পাওয়ার সুযোগ আইবিআরডিতে বেড়ে যাবে।

জাহিদ হোসেন জানান, কিছু দ্বিপক্ষীয় সহযোগী সংস্থা এবং কিছু জলবায়ু তহবিলের অর্থায়ন শুধু এলডিসি দেশগুলোকে দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে আর এ ধরনের অনুদান সহায়তা পাবে না।