এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশিদ। ঢাকা চেম্বারের সাবেক এই সিনিয়র সহসভাপতি বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) সভাপতি। সম্প্রতি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, প্রকৌশল খাত এবং এনার্জি প্যাকের বিভিন্ন দিক নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসনাইন ইমতিয়াজ

সমকাল :এনার্জি প্যাকের শুরুটা কীভাবে?

হুমায়ুন রশিদ :১৯৮২ সালে। ট্রান্সফরমার আমদানি করে বাজারজাত করতে আমি ও এনামুল হক চৌধুরী মিলে কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করি। ১৯৮৫ সালে অনুভব করি নিজেদেরই ট্রান্সফরমার বানাতে হবে। অভিজ্ঞতা বাড়াতে তখন আমদানির পাশাপাশি মেরামতও শুরু করি। ১৯৮৬ সালের শেষে ট্রান্সফরমার বানানোর দিকে মনোযোগ দিই। নিজেরা নকশা করে ছোট আকারের ৫০ কেভি-১০০ কেভি (কিলোভোল্ট) ট্রান্সফরমার বানানো শুরু করলাম। সরবরাহ করতাম গণপূর্ত অধিদপ্তরে। ১৯৯১ সালে গাবতলীর ছোট ওয়ার্কশপ ছেড়ে সাভারে চলে আসি। এর পর প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি ও কারিগরিভাবে নিজেদের উন্নত করছি। বর্তমানে দেশে ২৩০ কেভির সিস্টেম ভোল্টেজ ট্রান্সফরমার তৈরি করছে এনার্জিপ্যাক। ৩০০ এমভিএ ট্রান্সফরমার তৈরির দিকে যাচ্ছি। আমদানির বদলে ট্রান্সফরমার রফতানিও হচ্ছে।

সমকাল :রফতানি বাজারটা কেমন?

হুমায়ুন রশিদ :এখন থেকে পাঁচ বছর আগে রফতানির প্রক্রিয়া শুরু করি। এ জন্য স্বাধীন ল্যাবের সার্টিফিকেট লাগে। ভারতে সিপিআরআই এ পরীক্ষা করে। আমাদের প্রতিটি ট্রান্সফরমার তাদের পরীক্ষা করা। এখন এনার্জি প্যাকের ট্রান্সফরমার ভারত ও নেপাল ছাড়াও সুদান, ঘানা ও ইয়েমেনে যাচ্ছে। প্রতি বছর বাড়ছে রফতানি।

সমকাল :প্রকৌশল পণ্য রফতানির চ্যালেঞ্জ কী রকম?

হুমায়ুন রশিদ :প্রকৌশল পণ্য যেমন- ট্রান্সফরমার, সুইচ গিয়ার, মিটারিং প্যানেল রফতানিতে নানা বাধা রয়েছে। দেশের বাইরে এসব পণ্য বিক্রির বড় চ্যালেঞ্জ বিক্রয়োত্তর সেবা ও ওয়ারেন্টি। এসব সেবার জন্য সংশ্নিষ্ট দেশে অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। বিনিয়োগ করতে হবে। এ জন্য যেতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। বিনিয়োগের জন্য অনুমতি নিতে হবে। এটা খুব জটিল প্রক্রিয়া। বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ না হলে লোকজন ঠিকই অর্থ বাইরে নিয়ে যাবে, অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় বাড়ি কিনবে। প্রকৌশল পণ্যের রফতানি বাড়াতে পৃথক নীতিমালা করতে হবে। দেশের বাইরে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা উচিত।

সমকাল :ট্রান্সফরমার তৈরি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এসেছেন। সেখানে কেমন করছেন?

হুমায়ুন রশিদ :আমরা এক সময় জেনারেটর আমদানি করতাম, এখন তা নিজেরা বানাচ্ছি। আমাদের তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। ঠাকুরগাঁওয়ে ১১৫ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র নির্মাণাধীন। এই প্রকল্পগুলো যৌথ উদ্যোগের। একই সঙ্গে বিভিন্ন বিদ্যুৎ প্রকল্পে ইপিসি ঠিকাদার হিসেবে কাজ করেছে এনার্জিপ্যাক। বিভিন্ন কোম্পানির সাবস্টেশন স্থাপন করেছি।

সমকাল :আর কোন খাতে আপনাদের ব্যবসা রয়েছে?

হুমায়ুন রশিদ :ইলেকট্রিক্যালের পাশাপাশি মেকানিক্যাল খাতেও বিনিয়োগ রয়েছে, যেমন- চীনের সঙ্গে যৌথভাবে গাড়ি (ট্রাক) সংযোজন করা হচ্ছে। এর বাইরে এলপিজি ব্যবসা আছে। খুলনার দাকোপে এলপিজি টার্মিনালসহ প্লান্ট আছে। জি গ্যাস ব্র্যান্ড নামে এই এলপি গ্যাস বাজারে পাওয়া যায়। পোশাক খাতেও আমাদের বিনিয়োগ আছে। এনার্জিপ্যাক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্যুট প্রস্তুতকারক। আমাদের ক্রেতা মূলত যুক্তরাজ্যের মার্ক অ্যান্ড স্প্যান্সার, জার্মান, ফ্রান্স ও কানাডিয়ান বিভিন্ন কোম্পানি। এ বছর ৬১ লাখ স্যুট পিস রফতানির লক্ষ্য রয়েছে। গত ছয় মাসে ২০০ কোটি টাকার ওপরে স্যুট রফতানি হয়েছে। কারখানাটি গাজীপুরের হোতাপাড়ায়। প্রায় পাঁচ হাজার ৬০০ শ্রমিক কাজ করেন। এনার্জিপ্যাক এখন ভারতেও স্যুট রফতানি করছে। লক্ষ্য রয়েছে চীনে রফতানি করারও। ব্যবসা করাই মূল ফোকস না। আমরা লোকজনের কর্মসংস্থান করতে চাই। আমাদের গ্রুপের কোম্পানিগুলোতে প্রায় ৮০০ স্নাতক পাস করা প্রকৌশলী কাজ করছেন।

সমকাল :দেশের বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে। এটাকে কীভাবে দেখেন?

হুমায়ুন রশিদ :বাংলাদেশ ব্যয়বহুল জ্বালানি কিনছে, এটার 'অপরচুনিটি কস্ট' দেখতে হবে। গার্মেন্টে যে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে তা দিয়ে উৎপাদিত পণ্য রফতানি হচ্ছে। তবে দাম সহনশীল পর্যায়ে রাখতে হবে। দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলে গ্যাস দিতে হবে, তাহলে শিল্পায়ন বাড়বে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে হবে। দেশের কয়লা দ্রুত তোলা উচিত। কারণ ২০-২৫ বছর পর কয়লার ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাবে। তখন এই কয়লা কোনো কাজে লাগবে।

সমকাল :শিল্পের বিকাশে সরকারের করণীয় কী?

হুমায়ুন রশিদ :খুলনার দাকোপের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে এলপিজি প্লান্ট গড়েছে এনার্জিপ্যাক। যেখানে কোনো শিল্প নেই, খাবার পানির সংকট তীব্র। এলাকার হতদরিদ্র লোকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চল অত্যন্ত অবহেলিত। এক সময়ের শিল্পনগরী খুলনা আজ মৃত। এটাকে আবার চালু করতে হবে। সে

সুযোগ আছে। শুধু সরকারি কিছু উদ্যোগ লাগবে। প্রত্যন্ত সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে শিল্পায়ন করতে হবে। এমন অঞ্চলে যারা শিল্প-কারখানা করবে, তাদের সাশ্রয়ী দামে জ্বালানি-বিদ্যুৎ দিতে হবে, শুল্ক্ক-ভ্যাট থেকে রেহাই দিতে হবে। গাজীপুরে যে দামে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কিনতে হয়, একই দাম যদি দাকোপে দিতে হয়, তাহলে ব্যবসায়ীরা কেন যাবেন? গাজীপুরে যে সুযোগ-সুবিধা আছে, দাকোপে তো তা নেই। এখানে অবকাঠামো নেই, খাওয়ার পানি মেলে না। এমন স্থানে শিল্প গড়তে সরকারকে ছাড় দিতে হবে।

সমকাল :এনার্জিপ্যাক কি পুঁজিবাজারে আসবে?

হুমায়ুন রশিদ :আমরা ছয় বছর আগে আবেদন করে রেখেছি সিকিউরিটি একচেঞ্জ কমিশনে। এখনও অনুমোদন মেলেনি। অনুমোদন পেলে আইপিওর মাধ্যমে মূলধন উত্তোলন করা হবে। কমিশনকে বুঝতে হবে বাজার চাঙ্গা করতে হলে ভালো কোম্পানিকে আনতে হবে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পুঁজিবাজার বা বন্ড বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন উদ্যোক্তারা। দেশে বড় অবকাঠামোগত কাজ হচ্ছে, বন্ড ছেড়ে এগুলোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করা যায়। লোকজনের হাতে টাকা-পয়সা আছে কিন্তু নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা পাচ্ছেন না। এসব অর্থ বিনিয়োগে কাজে লাগানো গেলে বিদেশের কাছে হাত পাততে হবে না। সরকার চাইলে ইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড নামে একটি বন্ড ছাড়তে পারে।

সমকাল :এনার্জিপ্যাককে সামনে কোথায় দেখতে চান?

হুমায়ুন রশিদ :আমাদের চিন্তা-ভাবনাগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে। শুধু বাংলাদেশকে বাজার না ধরে সারাবিশ্বকে বাজার ধরে কাজ করতে হবে। এনার্জিপ্যাককেও আমরা সেভাবে দেখতে চাই। আগামী পাঁচ বছরে এনার্জিপ্যাক ন্যাশনাল থেকে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি হতে চায়। ভারতীয়রা পারলে বাংলাদেশ কেন পারবে না।

মন্তব্য করুন