দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হলেও বাড়ছে বৈষম্য, যা টেকসই উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন নীতির কারণেও ধনীরা বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। বৈষম্য আরও বাড়ছে। বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় তা বৈষম্য কমাতে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছে না। এ অবস্থায় বৈষম্য কমাতে সামাজিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গতকাল শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়নে 'অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন'বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে অর্থনীতিবিদরা এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর) দু'দিনের এ সেমিনারের আয়োজন করে। গতকাল নয়টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আকতারুজ্জান, অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক শফিক উজ জামান, বিইআরের চেয়ারমান অধ্যাপক এমএম আকাশ এ সময় বক্তব্য দেন।

এমএ মান্নান বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সব সুবিধা কৃষক ও মজুররা পাচ্ছেন না। এদের উন্নয়নের মূলধারায় আনা এখনও সম্ভব হয়নি। এদের মূলধারায় আনতে দৃশ্যমান বৈষম্য কমাতে হবে। একই সঙ্গে আইনি বৈষম্য, বিচার বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক বৈষম্যও কমাতে হবে। তিনি বলেন, সরকার দারিদ্র্য বিমোচনে সফল হয়েছে। এখন গবেষণার মাধ্যমে বৈষম্যের প্রকৃত চিত্র তুলে আনতে হবে। যাদের হাতে সম্পদ বেশি তাদের আয় বাড়বে; কিন্তু ভূমিহীনদের কীভাবে অর্থনীতির মূলস্রোতে যুক্ত করা যায় তা নিয়ে কাজ করতে হবে।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আইনের কারণেও অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হয়। আইনের মাধ্যমে গরিবদের জলাশয় থেকে মাছ আহরণ, বন থেকে কাঠ সংগ্রহ, কিংবা নদী বা ছড়া থেকে পাথর আহরণ করতে দেওয়া হয় না। এ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এগিয়ে যেতে হবে। কারণ সরকার শুধু উন্নয়নে বিশ্বাস করে না, রূপান্তরেও বিশ্বাস করে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

উদ্বোধনী অধিবেশনের পর অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে দারিদ্র্য ও বৈষম্য শীর্ষক অধিবেশন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিভার্সিটি অব উলস্টারের অধ্যাপক এসআর ওসমানী। এ অধিবেশনে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিডিপি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, সামাজিক কাঠামোগত সমস্যার কারণে বৈষম্য বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে যে ঋণ নেন তার ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ ফেরত আসে। উচ্চ শ্রেণির একটা অংশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করে না। তার পরও সরকার এদের ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়। এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের উৎপাদন খরচ উঠে আসে না। বৈষম্য কমাতে হলে আটো রাইস মিলে কৃষকের মালিকানা থাকতে হবে। অন্যদিকে মালিকদের আয় বাড়লেও শ্রমিকদের প্রকৃত আয় বাড়ে না। বৈষম্য বাড়ার এটাও একটা মূল কারণ। এক্ষেত্রে সরকারি শিল্পের মালিকানায় একটা অংশ শ্রমিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, মালিকানাবোধ তৈরি হলে উৎপাদন আরও বাড়বে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে ধনিক শ্রেণি সুবিধা পাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অধ্যাপক ওসমানী বলেন, দেশে সর্বোচ্চ আয়ের ওপরের দিকে থাকা ১০ শতাংশ মানুষের আয় বেড়ে যাচ্ছে। পুঁজি ব্যবহার করে এ আয় বাড়ছে। অন্যদিকে নিচের দিকের ৪০ শতাংশের প্রকৃত মজুরি ক্রমাগত কমছে। এতে বৈষম্যও বেড়ে চলেছে।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, কালো টাকার কারণে বৈষম্য বাড়ে। এটি কমাতে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, দারিদ্র্য নিরসন ও বৈষম্য কমাতে কৃষি খাত থেকে চলে আসা শ্রমিকদের প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পে আনার দিকে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে ছোট উদ্যোক্তা শ্রেণিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, বৈষম্য কমাতে সরকারি নীতিতে আয়ের ক্ষেত্রে নিচের দিকে থাকা ৪০ শতাংশ মানুষকে গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। ভূমিহীনদের জন্য ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ভূমি ব্যবহারের নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান বলেন, দারিদ্র্য ও বৈষম্যের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত তথ্য থাকা আবশ্যক। চর এলাকায় দারিদ্র্যের হার জাতীয় হারের দ্বিগুণ। ফলে চর-হাওর এলাকার মতো দারিদ্র্যের পকেটগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।

অধ্যাপক শফিক-উজ-জামান বলেন, ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদহার বেসরকারি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। তৈরি পোশাক খাতের ওপর রফতানি নির্ভরশীল। রফতানি বৈচিত্র্য তৈরি হচ্ছে না। এ অবস্থায় টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

মন্তব্য করুন