গুগল :যে কারণে সেরা কর্মস্থল

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০১৫      

হাসান জাকির

গুগল :যে কারণে সেরা কর্মস্থল

ঘরে বসে কাজ করার মতো পরিবেশ পান গুগল কর্মীরা

কাজের সবচেয়ে ভালো পরিবেশ কোন প্রতিষ্ঠানে এমন জিজ্ঞাসা নিয়ে গত ১৮ বছর ধরে জরিপ চালিয়ে আসছে ফরচুন। সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মতামত এবং নিজস্ব গবেষণা দলের মাধ্যমে এ জরিপ কাজ করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। আর এই জরিপে টানা ষষ্ঠবারের মতো শীর্ষ কর্মীবান্ধব অফিসের স্বীকৃতি পেয়েছে বিশ্বসেরা প্রযুক্তি কোম্পানি গুগল। গুগল অফিসে কী এমন বিশেষত্ব আছে যা বিশ্বের অন্য শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের নেই_ এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে চমকপ্রদ সব তথ্য। গুগলের অফিস কক্ষে ঢু দিয়ে চমকে গেছেন অনেকেই। কেননা গুগল যে অফিস ধারণার খোলনলচেই প্রায় বদলে দিয়েছে। প্রথাগত চেয়ার-টেবিল, ড্রেস কোড, ধরাবাঁধা সময় ফ্রেম কোনো কিছুতেই তোয়াক্কা নেই গুগলের। অফিস ইন্টেরিয়রেও ক্লিশে ধারণা বদলে দিয়েছে তারা। ফলে গুগল অফিস দেখলে কখনো মনে হবে, এটি বন্ধুবান্ধবদের চমৎকার আড্ডাস্থল, রকমারি খাবারে ঠাসা কোনো দোকান কিংবা সাজানো-গোছানো খেলার মাঠ! গুগল তার কর্মীদের আরাম-আয়েশ এবং বিনোদনের সব ধরনের ব্যবস্থাই রেখেছে অফিসে। অফিস না বলে একে বাড়ি বললেও অত্যুক্তি হয় না। গুগল অফিসকে কেন বাড়ি বলা যায়। এটি জানার আগে আপনি চাকরিজীবী হলে কয়েকটি প্রশ্ন। আপনি কি দুপুরের খাওয়ার পরে অফিসে বসের সামনে হালকা ঘুম দিতে পারেন? কিংবা কাজ করতে ভালো লাগছে না এটা বলে একটু সাইকেল চালিয়ে আসতে পারেন? অফিসে কাজের ফাঁকে ইচ্ছে হলে কখনো ঝুপ করে ডুব দিতে পারেন সুইমিং পুলে? অথবা
একটু জিম সেরে আসার মতো কাজটি অফিসের মধ্যে কি কল্পনা করা যায়? অন্যরা যেটা কল্পনা করতে পারে না সেটি করে দেখায় গুগল। কর্মীদের জন্য সব ধরনের আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করাই যেন গুগলের মূলমন্ত্র। কাজ পরে আগে স্বাচ্ছন্দ্য এমন মন্ত্রে দীক্ষিত যারা তাদের অফিস তো এমনই হবে। ঠিক গুগল এখানেই অন্যদের চেয়ে এগিয়ে কিংবা ব্যতিক্রম। কেননা গুগল জানে, মন আর শরীর যদি চাঙ্গা থাকে কাজটা এমনিতেই বের হয়ে আসবে। নতুন নতুন চিন্তা আর প্রোগ্রামিংয়ের জটিল সব তত্ত্ব অনায়াসে সমাধান করতে হলে তো উৎফুল্ল মন আর মস্তিষ্ক প্রয়োজন। ফলে নিজের ল্যাপটপটি ডিভানে নিয়ে বাসার মতো পা মেলে বসেই দিব্যি কাজ চালিয়ে যেতে পারেন গুগল কর্মীরা। গুগলের কাছে কাজের পদ্ধতির বাধ্যবাধকতা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে চাহিদামতো কাজটি সম্পন্ন হচ্ছে কি-না সেদিকে নজর রাখা। গুগল তার কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কাজ কিংবা প্রজেক্ট দিয়ে দেয়। এরপর সময়মতো প্রজেক্টটি ডেলিভারি দিলেই হলো। শরীর আর মনের খেয়াল রাখার এই মন্ত্রে গুগল কিন্তু দারুণ সফল। তাদের কর্মীরা খুশি। কাজেও রয়েছে স্বাভাবিক গতি। এ বিষয়ে গুগলের কর্মীরা বলেন, আমরা চাইলেই দরকার মতো জামাকাপড়গুলো অফিসে পরিষ্কার করে নিতে পারি। এখানে অফিসের লন্ড্রিও রয়েছে। ক্লান্তিবোধ করলে একটু ঘুমিয়েও নিতে পারি।
কর্মীদের জন্য অফিসের মধ্যেই রয়েছে গুগলের নিজস্ব ফার্ম যেখানে টাটকা সবজি-ডিম-দুধ-মাংস। বড় পরিসরের অফিসের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা যেতে কর্মীরা ব্যবহার করতে পারেন রঙিন সব সাইকেল, গুগলের নিজস্ব গাড়ি কিংবা লিফট। একতলা থেকে অন্য তলায় নামার জন্য রয়েছে স্লিপ। ঠিক যে রকমটা আপনি বাচ্চাদের পার্কে দেখেন, তেমনই। তফাতের মধ্যে তার আকার একটু বড়, এই যা!
মন আর শরীর নিয়ে যাদের এত ভাবনা, তাদের অফিসে শারীরিক কোনো সমস্যায় ডাক্তার দেখানোর সুযোগ থাকবে না তা কি হয়। এজন্যই গুগল ক্যালিফোর্নিয়া অফিসে রয়েছে নিজস্ব হাসপাতাল। তবে হাসপাতালে খুব একটা ভিড় দেখা যায় না কখনোই। কারণ মন আর শরীরের এত যত্ন যারা নিয়ে থাকে তাদের কর্মীদের শরীরে রোগ ভিড়বে কী করে!
তবে গুগল সেরা কর্মস্থল নির্বাচনের পেছনের কারণ হিসেবে দেখছেন কর্মী এবং বিশ্লেষকরা। গুগল কর্মীরা মনে করেন, গুগলে কাজ করায় বাইরের দুনিয়ায় তাদের সম্পর্কে একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এটি ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখানে কর্মীরা পিতৃত্বকালীন তিন মাসের ছুটি ভোগ করতে পারেন। সম্প্রতি পিতৃত্বকালীন এমন ছুটিতে দেশে ঘুরে গেছেন গুগলে বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মী ভিকি রাসেল। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, 'জিনিয়াস সহকর্মী'। তথ্যপ্রযুক্তি অঙ্গনের শীর্ষ মেধাবীরাই প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করে থাকে। আর এসব মেধাবী সহকর্মীদের সংস্পর্শ থাকার লোভটাও কিন্তু কম নয়। কেননা তাদের সঙ্গে সহকর্মী হিসেবে কাজের সুযোগটি ক্যারিয়ারের জন্য যে কোনো তরুণের জীবনে মাইলফলক হিসেবে ধরা দিতে পারে। অফিসের পরিবেশের কথা তো ইতিমধ্যে বলাই হয়েছে। আর সর্বোপরি ক্যারিয়ার অপরচুনিটি। কেননা গুগল জাতীয়তা ধর্ম এসবের গুরুত্ব না দিয়ে তার কর্মীর মেধা এবং ডেডিকেশনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ফলে গুগলের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিয়োগ পান ভারতীয় সুন্দর পিসাই। আর বিশ্বসেরা যে প্রতিষ্ঠানটির কর্মপরিবেশ এবং নিয়োগবিধি এমন সেখানে শীর্ষ পদে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশি কাউকে দেখার প্রত্যাশা করতেই পারি।