বছরজুড়ে আউটসোর্সিং খাতে অবদান রাখায় ৯৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করেছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস [বেসিস]। বর্ষসেরা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ কোম্পানি এবং নারী ক্যাটাগরিতে দেওয়া হয় এবারের পুরস্কার। বিস্তারিত জানাচ্ছেন ইমদাদুল হক।
নগর ছাড়িয়ে দেশের নানা প্রান্তে বিশেষ করে মফস্বলে বসেই যুক্তরাজ্য, কানাডা, ব্রাজিল, ইতালির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজ করছেন তরুণ ফ্রিল্যান্সাররা। রোজগার করছেন বৈদেশিক মুদ্রা। তরুণ এসব ফ্রিল্যান্সারকে কাজের স্বীকৃতি দিতে পুরস্কৃত করে আসছে বেসিস। এটি তাদের পঞ্চম আয়োজন। গত ২ নভেম্বর রাজধানীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজয়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয় বেসিস। অনুষ্ঠানে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান, বেসিস সভাপতি শামীম আহসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এবারের আয়োজনে স্টার্টআপ কোটাসহ মোট ৫টি বিভাগে দেওয়া হয় 'বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড-২০১৫' শীর্ষত পুরস্কার। দেশের ৬৪টি জেলা থেকে ৫৮ জন, ১০ স্টার্টআপ কোম্পানি, ১৫টি প্রযুক্তি কোম্পানি, ৮ ব্যক্তি এবং ৩ নারী ফ্রিল্যান্সার এই পুরস্কার পেয়েছেন।
সেরা পেশাদার ফ্রিল্যান্সার
আউটসোর্সিংকে পেশা হিসেবে নিয়ে ইতিমধ্যেই যারা সফল হয়েছেন তাদের মধ্য থেকে ব্যক্তিগত বিভাগে ৮ জনকে এ বছর বর্ষসেরা একক আউটসোর্সিং প্রফেশনাল সম্মাননায় ভূষিত করেছে বেসিস। তারা হলেন_ খালেদ মো. শাহরিয়ার, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, মেহেরুল ইসলাম, শাহজাহান রাসেল, আরিফুর রহমান, শরীফুল ইসলাম, আরাফাত জাহান ও মোহাম্মদ মনির হোসাইন। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে ডিপ্লোমা এবং ২০০৬ সালে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [ডুয়েট] থেকে বিএসসি সম্পন্ন করে চাকরি জীবনে প্রবেশ করেন মনির হোসাইন। ২০১৩ সালে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণে চাকরি ছাড়তে হয় তাকে। এক পর্যায়ে পারিবারিক সমস্যা মিটিয়ে কিছুতেই যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির নাগাল পাচ্ছিলেন না তিনি। পরে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংয়ে পা বাড়ান। শুরুতে মার্কেট প্লেসগুলো থেকে কাজ নিয়ে করলেও এখন তার নিজেরই ক্লায়েন্ট গড়ে উঠেছে।
দেশসেরা ১৫ প্রতিষ্ঠান
মহাখালীর কাদেরিয়া টওয়ার। এখানে রয়েছে ভিজার্টি বাংলাদেশ নামে সফটওয়্যার কোম্পানির কার্যালয়টি। এখান থেকেই ৫০ জন তরুণ বাংলাদেশি ডেভেলপারের তৈরি সফটওয়্যারে বিশ্ব মাতাচ্ছে সিএনএন, বিবিসি, আলজাজিরা, স্কাই, ফক্স, এনডিটিভি, জি নেটওয়ার্ক, স্টার নেটওয়ার্ক, ভারতের ৮৩টি চ্যানেল। প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করছে রিয়েল টাইম গ্রাফিক্স, ডিজিটাল কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রোপ্রাইটরি সফটওয়্যার। ফিফা বিশ্বকাপ ২০১৪, ফুটবলের এই আন্তর্জাতিক আসরেও দাপ্তরিকভাবে খেলার চুলচেরা বিশ্লেষণে ব্যবহৃত ভিজার্টি স্পোর্ট অ্যানালাইসিস টুলটিও তৈরি হয়েছে এখান থেকেই। ভিজার্টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান গবেষণা কর্মকর্তা মাহমুদুল হক আজাদ জানালেন, বিশ্বের ৪০টি দেশে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সফটওয়্যার কোম্পানি ভিজার্টির শাখা রয়েছে। এর মধ্যে ভিজার্টি বাংলাদেশ এই বহুজাতিক সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় বৃহত্তম আরঅ্যান্ডডি হিসেবে বিবেচিত। দশ বছর ধরে প্রফেসনাল সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করলেও ব্যক্তিগত জীবনে কখনও আউট সোর্সিং করেননি মাহমুদুল হক আজাদ। বললেন, দেশে এনটিভি, চ্যানেল ৭১, চ্যানেল ২৪, চ্যানেল ৯ তাদের সফটওয়্যারগুলো ব্যবহার করছে। ভির্জাটির মতোই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রযুক্তি সেবা দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বছরের সেরা আউটসোর্সিং প্রযুক্তি কোম্পানি এফএম এশিয়া লিমিটেড, স্টাকচার্ড ডাটা সিস্টেমস লিমেটেড, বোর্ডি ভিসতা লিমিটেড, টপ অব স্টাক সফটওয়্যার, গ্রাফিক পিপল লিমিটেড, সিমপ্লেক্স হাব লিমেটেড, সার্ভিস ইঞ্জিন লিমিটেড, নাসেইনিয়া লিমিটেড, বিজেআইটি লিমিটেড, বিভি ক্রিয়েটিভস লিমিটেড, ব্রেইন স্টেশন-২৩, সেফালো-আমরাভি লিমিটেড এবং এম অ্যান্ড এইচ ইনফরমেটিকস লিমিটেড এ বছর অর্জন করেছে আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড।
সেরা স্টার্টআপ কোম্পানি
২০১০ সাল। বুয়েটে অধ্যয়নরত অবস্থায়ই সে বছর অক্টোবরে মহাখালীতে একটি সফটওয়্যার ফার্মে যোগ দেন জিএম তাসনিম আলম। সেখানে তার কাজ ছিল টিমমেটদের সঙ্গে আইওএস অ্যাপ্লিকেশন তৈরি। বেতন ৩৫ হাজার। কিছুদিন কাজ করার পর জানতে পারেন, অফিস থেকে বাড়ি ফিরেও কাজ করেন টিম লিডাররা। দেশের বাইরের সেসব কাজের সম্মানিও অনেক বেশি। মনে মনে ঠিক করলেন তিনিও আউটসোর্সিং করবেন। অবশেষে ২০১১ সালের এপ্রিলে ওডেস্কে অ্যাকাউন্ট খোলেন। মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের আইনি প্রতিষ্ঠানের আইফোন অ্যাপ তৈরির কাজ পান। কিন্তু কোথায় কাজ করবেন। তার তো কোনো ম্যাক পিসিই নেই। ফলে বন্ধুদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকার ওপর ধার করে ১ লাখ ১ হাজার টাকা দিয়ে একটি পিসি কিনে ঘণ্টায় ৭ ডলার চুক্তিতে কাজটি শুরু করেন। প্রকল্পটি শেষ করতে ১০০ ঘণ্টা লেগে যায়। কাজে খুশি হয়ে প্রতিষ্ঠানটি তাকে ১০০০ ডলার পুরস্কার দেয়। ২০১৪ সালে ব্যক্তিগত বিভাগে মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপার ক্যাটাগরিতে বেসিস বর্ষসেরা ফ্রিল্যান্সারে ভূষিত হন। এ পর্যায়ে তার কাজের গতি আরও বেড়ে যায়। ফ্রিল্যান্সিং থেকে অর্জিত লাখ পাঁচেক টাকা দিয়ে ২০১৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ধানমণ্ডি-১ নম্বরে গড়ে তোলেন নিজের সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান এনক্রিপ্টো মোবাইল অ্যাপস। এখন তার এই প্রতিষ্ঠানটিতে ফুলটাইম ৫ জন এবং ২ জন শিক্ষানবিশ কাজ করছেন। আইওএস প্লাটফর্মে তৈরি করছেন ক্যামেরা, স্বাস্থ্য, কিডস ইত্যাদি অ্যাপ। আইওএস অ্যাপ স্টোরে রয়েছে তাদের ৫০টির অধিক অ্যাপ। এর মধ্যে পাইপস পাজল গেম, টাইলস ট্যাপিং চ্যালেঞ্জ, পর্যায় সারণি নিয়ে প্রিয়ডিক টেবিল নিয়ে তৈরি অ্যাপটি বেশ জনপ্রিয়। এই ক'দিনেই এগুলো ১০ হাজারের বেশি বার ডাউনলোড হয়েছে। কথা প্রসঙ্গে তাসনিম আলম বললেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রাজিল থেকেই এখন মোবাইল গেমস ও অ্যাপ্লিকেশনের কাজ বেশি পাচ্ছেন। কিন্তু যোগ্য কর্মীর অভাবে এগুতে পারছেন না। চলতি বছরে স্টার্টআপ কোম্পানি ক্যাটাগরিতে এনক্রিপ্টো মোবাইল অ্যাপসের মতো আরও ৯টি নবীন প্রতিষ্ঠান এ পুরস্কার পেয়েছে। সেগুলো হলো_ মুহাম্মাদ জে এইচ লস্করের মোবিওঅ্যাপ লিমিটেড, মো. নিজাম উদ্দীনের উইডেভস, গোলাম জিলানীর জরা সলিউশন লিমিটেড, এস এম শোয়েব আমিনের সিলিকন অর্চার্ড লিমিটেড, শফিউল আলম বিপ্লবের অ্যাডভান্সড অ্যাপস বাংলাদেশ, রবিউল ইসলামের ইমপ্লিভিসতা বিডি, লিটন আলী খানের ইকরাসেইস সলিউশন, সাদমান তানজিম রহমানের সিকিউপেন্ট এবং আতাউর রহমান মোল্লা সুজনের আউটসোর্সিং এক্সপার্ট লিমিটেড।
জেলা কোটায় সেরা যারা
ঢাকায় সরকারি তিতুমীর কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়ে ইন্টারনেটের সঙ্গে পরিচয় হয় রাজবাড়ী জেলার বসন্তপুর; মজলিস পুর গ্রামের আবদুর রহমান পাটোয়ারীর। বন্ধুর সহযোগিতায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে ২০১০ সালে অনলাইন আর সিডি দিয়ে কম্পিউটারের হাতেখড়ি নেন গণিত পড়ূয়া এই যুবক। ২০১২ সালে ওডেস্কে অ্যাকাউন্ট খুলে ঘণ্টায় ৩ ডলারের বিনিময়ে যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠানে এসইওর কাজ পান। এই এসইওতেই ওই বছর ৪০০ ঘণ্টা কাজ করেন। পাশাপাশি পিএইচপি, জাভা স্ক্রিপ্ট রপ্ত করে ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজে আবেদন করতে থাকেন। ২০১৪ সাল থেকে ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে কাজ করেন। এখন ঘণ্টায় গড়ে আয় করছেন সাড়ে ১২ ডলার। কাজের চাপে প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে। এবার যোগ্য সহযোগী পেলেই একটি সফটওয়্যার ফার্ম দিয়ে উদ্যোক্তার খাতায় নাম লেখাতে চান এই স্নাতকোত্তর পরীক্ষার্থী। এ বছর ঢাকার মশিউর রহমান তালুকদার, ফরিদপুরের শাহাদাত হোসাইন, নারায়ণগঞ্জের বাদশাহ ফাহাদ, নরসিংদীর মামুন মিয়া, শরীয়তপুরের সাদিয়া আফরোজ, গাজীপুরের সাইফুল ইসলাম, গোপালগঞ্জের উত্তম বড়াই, মৌলভীবাজারের নন্দীপ সিনহা, মুন্সীগঞ্জের সবুর খান, ময়মনসিংহের রফিক রহমান, নওগাঁর আবু ফিরোজ মাহমুদ, নড়াইলের সৈয়দ মুহাম্মাদ হাসান, নাটোরের আতিক-বিন জহুর, নেত্রকোনার জাহিদুল ইসলাম, নীলফামারীর সঞ্জয় কুমার রায়, নোয়াখালীর কাজী জিয়াউল হক, পাবনার তৌহিদুজ্জামান, পঞ্চগড়ের আবদুল্লাহ আল মামুন, পটুয়াখালীর আইয়ুব হাওলাদার রিপন, পিরোজপুরের শহিদুল ইসলাম, রাজশাহীর নাসিরুল হক, রংপুরের মওদুদ ইসলাম, সাতক্ষীরার ফিরোজ আহমেদ, শেরপুরের আবদুল্লাহ, সিরাজগঞ্জের রাশেদুল ইসলাম, সুনামগঞ্জের রাহসালাহ সালাক, সিলেটের মহিউদ্দীন আহমেদ মহসিন, টাঙ্গাইলের জুবায়ের রহমান, ঠাকুরগাঁওয়ের সানোয়ার হায়দার, জামালপুরের নুরুল্লাহ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাজিউর রহমান অর্জন করেছেন জেলা কোটায় বর্ষসেরা মুক্ত পেশাজীবীর সম্মাননা। একই ক্যাটাগরিতে সম্মাননা পেয়েছেন_ বাগেরহাটের শেখ বাসাহারুল আলম সানি, বরগুনার পুর্ণেন্দু বিশ্বাস, বরিশালের শংকর দাশ, বগুড়ার শাহানুর এ আলম, চাঁদপুরের ইসমাইল করিম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের জাহিদুল ইসলাম, চট্টগ্রামের হিরো বড়ুয়া, চুয়াডাঙ্গার আসলাম হাসিব, কুমিল্লার মো. আতাউর রহমান, কক্সবাজারের আরিফ ইসলাম, দিনাজপুরের শাকিল হোসাইন, ফেনীর মোহাম্মদ হাসান মেহেদী, গাইবান্ধার মোস্তাফিজুর রহমান, হবিগঞ্জের মোহাম্মদ আনোয়ার উল কবির চৌধুরী, যশোরের এসএম সাইফুল আলম, ঝিনাইদহের মাহবুব হাসান রুমন, জয়পুরহাটের রাকিবুল ইসলাম, খুলনার শাহারিয়ার কবির, কিশোরগঞ্জের আশরাফুল মবিন, কুড়িগ্রামের জেনসিন আবেদিন, কুষ্টিয়ার রবিউল ইসলাম, লক্ষ্মীপুরের মিয়া রায়হান মাহমুদ আরমান, লালমনিরহাটের আহসান উদ্দিন নোমান, মাদারীপুরের কাজী নেয়ামুল বাসির, মানিকগঞ্জের প্রকাশ চন্দ্র মণ্ডল এবং মেহেরপুরের এনামুল হক। তবে এ বছর জেলা কোটায় বান্দরবন, ভোলা, ঝালকাঠি, খাগড়াছড়ি, মাগুরা ও রাঙামাটি থেকে এই পদক পাননি কোনো ফ্রিল্যান্সার।

মন্তব্য করুন