বিশ্ব বদলে দিচ্ছে উইকিপিডিয়া

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০১৬

২০০১ সালের ১৫ জানুয়ারি বিনামূল্যে ইন্টারনেটে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে জিমি ওয়েলস চালু করেছিলেন উইকিপিডিয়া। প্রতিটি মানুষের কাছে বিনামূল্যে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য আজ অকেটাই বাস্তবতা। উইকিপিডিয়ার তথ্যভাণ্ডারকে হাতিয়ার করে বদলে যাচ্ছে ইন্টারনেট বিশ্ব। লিখেছেন হাসান জাকির
১৬ বছরে পদার্পণ করেছে অনলাইন তথ্যভাণ্ডার বিশ্বকোষখ্যাত উইকিপিডিয়া। দীর্ঘ ১৫ বছরের পথচলায় ইন্টারনেটভিত্তিক জ্ঞানকোষ বিশ্বজুড়ে দারুণ সমাদৃত হয়েছে। বর্তমানে সাইটটিতে ২৫০টিরও বেশি ভাষায় তিন কোটি ৮০ লক্ষাধিক আর্টিকেল রয়েছে। এর মধ্যে ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় রয়েছে ৫০ লাখের বেশি আর্টিকেল। ভিজিটরের হিসেবে এটি বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তর ওয়েবসাইট। শিক্ষামূলক ওয়েব ট্রাফিকের ২৪ শতাংশ দখলে রয়েছে উইকিপিডিয়ার।
উইকিপিডিয়ার বর্ষপূর্তিতে টেলিগ্রাফে এক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কেউ বলে পৃথিবী বদলে দিই, সেটা হবে কাল্পনিক ব্যাপার। কিন্তু উইকিপিডিয়ার ক্ষেত্রে এটিই বাস্তবতা।
২০০১ সালে বিনামূল্যে ইন্টারনেটে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে জিমি ওয়েলস চালু করেছিলেন উইকিপিডিয়া। যার মূলমন্ত্র ছিল, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছে বিনামূল্যে মানব সভ্যতার পুরো জ্ঞানভাণ্ডারকে সহজে পেঁৗছে দেওয়া। ১৬তম বর্ষে পদার্পণ করে জিমি ওয়েলসের স্বপ্ন আজ অনেকটাই বাস্তব। প্রতি মাসে পোর্টালটিতে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ ঢুঁ মারছে। প্রতিদিন নানা ভাষায় একটু একটু করে সমৃদ্ধ হচ্ছে অনলাইনভিত্তিক বিশ্বকোষটি। উইকিপিডিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নানা ভাষার স্বেচ্ছাসেবীরা। উইকিপিডিয়া প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধকরণে বর্তমানে ৮০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবী নিরলস কাজ করছে। তাদের মধ্যে অনেকের একক আর্টিকেল সংখ্যা ঈর্ষণীয়। আইবিএমের সাবেক এক কর্মী উইকিপিডিয়ার ব্যাকরণগত ভুল ঠিক করতে ৮০ হাজারেরও বেশি সংশোধন করেছেন। উইকিপিডিয়ার বিপুল জনপ্রিয়তার পেছনে আরেকটি কারণ হচ্ছে, তথ্যপ্রাপ্তিতে ভাষাবৈচিত্র্য। মোটামুটি জানাশোনা যে কোনো ভাষাতেই বলা যায় তথ্য পাওয়া যাবে উইকিপিডিয়ায়। উইকিপিডিয়ায় একক ভাষা হিসেবে ইংরেজি সবচেয়ে সমৃদ্ধ হলেও শতকরা হারে তা কেবল ১৫ ভাগ মাত্র। বাকি ৮৫ ভাগ তথ্যই পাওয়া যাবে অন্যান্য ভাষায়। উইকিপিডিয়ায় যেসব ডাটা সংকলিত হয়, তাতে থাকে শিক্ষক, একাডেমিক, গবেষক, ডাক্তার থেকে শুরু করে বিষয়সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ প্যানেলের রেফারেন্স। তথ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য হওয়ায় এখান থেকে গবেষকরাও চাহিদামতো উপাত্ত ব্যবহার করছেন।
পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গেও এগিয়ে যাচ্ছে উইকিপিডিয়া; নাকি উইকিপিডিয়া বিশ্বকে বদলে দেওয়ার রসদ জুগিয়ে যাচ্ছে সেটি নিয়ে বির্তক হতে পারে। তবে ইন্টারনেটে 'সার্চ অ্যান্ড লার্ন' তথা 'খোঁজ এবং শেখ' ধারণাটি এখন ডেস্কটপের বদলে স্মার্টফোন-ট্যাবের মতো ডিভাইসে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে উইকিপিডিয়া। স্মার্ট ডিভাইসের কল্যাণে উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলোতেও ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামীতে এসব দেশ থেকেই ইন্টারনেটে লাখ লাখ মানুষ যুক্ত হবে। স্মার্টফোন মার্কেটের প্রবৃদ্ধির তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষ দশে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শীর্ষে থাকা অন্য দেশগুলো হচ্ছে_ ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল প্রভৃতি। এর মধ্যে বাংলাদেশের নাম বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। বাংলা ভাষাপ্রেমী স্বেচ্ছাসেবীদের নিরলস পরিশ্রমে ক্রমেই সমৃদ্ধ হচ্ছে বাংলা উইকিপিডিয়া। বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রশাসক নূরুন্নবী চৌধুরী জানান, বাংলা ভাষায় উইকিপিডিয়ায় বর্তমানে ৪০ হাজারেরও বেশি আর্টিকেল রয়েছে। বাংলা উইকিপিডিয়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পড়া হয়ে থাকে। আর এ জন্য বিভিন্ন ভাষাভাষী উইকিপিডিয়ার মধ্যে বাংলা উইকিপিডিয়া ডেপথের দিক থেকে তৃতীয়। বাংলা ভাষায় উইকিপিডিয়ার স্বেচ্ছসেবক লক্ষাধিক হলেও নিয়মিত সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবক বেশ কম। এ ক্ষেত্রে নজর দেওয়ার পাশাপাশি বাংলা উইকিপিডিয়া সমৃদ্ধকরণে জোর দেওয়ার কথা জানালেন তিনি।
ব্যবসা নয়; বিনামূল্যে সবার জন্য তথ্য মূলমন্ত্র
ইন্টারনেট ভিত্তিক বিশ্বখ্যাত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গুগল, ফেসবুক, ইয়াহু, অ্যামাজনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উইকিপিডিয়ার মূলমন্ত্রে রয়েছে বিশদ পার্থক্য। বছর শেষে ফেসবুক কিংবা গুগলের মতো কোম্পানি লভ্যাংশ হিসেবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঘরে তুলছে। কিন্তু উইকিপিডিয়া বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তর ব্রাউজিং সাইট হলেও কনটেন্ট থেকে কানাকড়িও আয় নেই প্রতিষ্ঠানটির। এজন্য ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ কিংবা গুগল প্রতিষ্ঠাতা সার্জিও ব্রিন এবং ল্যারি পেজ জিমি ওয়েলসকে বোকাই ভাবতে পারেন। কেননা জিমি ওয়েলস চাইলেই বিজ্ঞাপন বাণিজ্য থেকে গুগল-ফেসবুকের মতো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঘরে তুলতে পারেন। উইকিপিডিয়ার পেজগুলোতে কেবল গুগল কিংবা ফেসবুকের মতো বিজ্ঞাপন জুড়ে দিলেই অর্থের ভাণ্ডার যোগ হতে থাকবে উইকিপিডিয়ার কোষাগারে। কিন্তু জিমি তেমনটি চাননি। আর্থিক হিসাব-নিকাশ পাশে রেখে তিনি কেবল চেয়েছেন, মানুষের জন্য বিনামূল্যে তথ্যের ভাণ্ডারটিকে উন্মুক্ত রাখতে। যেখানে যে কেউ তার প্রয়োজন মতো তথ্যটুকু সংগ্রহ করে নিতে পারবেন। আর এতে দারুণভাবে সফল হয়েছেন তিনি এটি বলাই যায়। আর লাভের হিসাব-নিকাশ বাদ দিতে উইকিপিডিয়ার মতো বৃহত্তর সাইট চালাতে তাকে উল্টো আর্থিক সহায়তা নিতে হয়। আর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কমিউনিটির লোকজনই এ কাজে তাকে সহায়তা করে থাকেন।
তবে উইকিপিডিয়ার কোনো বাণিজ্যিক মডেল না থাকায় কপিরাইট ভুক্ত আর্টিকেল পোর্টালটিতে যুক্ত করা যায় না। এটি উইকিপিডিয়ার একটি সীমাবদ্ধতা হিসেবে বলা যায়। আবার যারা ইন্টারনেট বাণিজ্যে বিশ্বাসি তাদের কথা হচ্ছে, ইন্টারনেটে বিনামূল্যে এভাবে তথ্যের দ্বার উন্মোচন করা আত্মঘাতি। কিন্তু তাতে জিমি ওয়েলসের কিছু যায় আসে না। কেননা তার জীবনের অন্যতম লক্ষ্যই হচ্ছে, পৃথিবী বদলে দিতে হলে প্রতিটি মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। আর তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হলে চিন্তা-চেতনায় মানুষ আরও উন্নত হতে পারবে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। আর এতে করে বদলে যাওয়া আরও উন্নত বিশ্বের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারব আমরা।