চিকিৎসক সংকটে সেবাবঞ্চিত আড়াই লাখ মানুষ

প্রকাশ: ২৩ মে ২০১৯

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু, মুন্সীগঞ্জ

মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও কর্মচারী সংকট এবং দালাল ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্যে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত উপজেলার আড়াই লাখ মানুষ। বর্তমানে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবা চলছে মাত্র আটজন চিকিৎসক দিয়ে। কাগজে-কলমে ১০ জন চিকিৎসক থাকলেও চার বছর ধরে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞসহ দু'জন চিকিৎসক রয়েছেন প্রেষণে। ফলে হৃদরোগ, মেডিসিন, চর্ম ও যৌন, নাক, কান, গলা ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ নেই জেলা সদর-ঘেঁষা এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

অন্যদিকে, হাসপাতালের স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সহকারী পরিদর্শক, পরিসংখ্যানবিদসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে কয়েক বছর ধরে। এমনিতেই চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ শূন্য থাকায় হাসপাতালটি নিজেই রোগাক্রান্ত, তার ওপর রয়েছে ওষুধ সংকট। ফলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির কার্যক্রম চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

এদিকে বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালদের উপদ্রবে চিকিৎসা নিতে আসা নিরীহ মানুষ আর্থিকসহ নানা হয়রানির কবলে পড়ে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে জানা গেছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৪ সালে ৩১ শয্যাবিশিষ্ট টঙ্গিবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ রোগীকে আউটডোরে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। কর্মচারী সংকট থাকায় প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর টিকিট পেলেও হৃদরোগ, নাক, কান, গলা, চক্ষু বিশেষজ্ঞ না থাকায় চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে রোগীরা বাধ্য হয়ে প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডাক্তার চেম্বারের দ্বারস্থ হতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন উপজেলাবাসী। সরকারি এ হাসপাতালে শুধু রক্ত ও মলমূত্র পরীক্ষা এবং মাঝে মধ্যে এক্স-রে করতে পারলেও চিকিৎসকের দেওয়া অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা রোগীদের প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি সেন্টারে করতে হচ্ছে।

রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালরা তাদের নির্ধারিত ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি সেন্টারে নিয়ে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি থাকা রোগীদেরও উন্নত চিকিৎসার প্রলোভনে ফেলে হাসপাতাল থেকে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছে কমিশনের লোভে। আবার হাসপাতালের কিছু ডাক্তার, নার্স, কর্মচারীর যোগসাজশে দালালরা প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডাক্তার চেম্বারে নিয়ে যাচ্ছে রোগীদের। বিনিময়ে উভয়ে পাচ্ছে মোটা অঙ্কের কমিশন।

রোগীদের আরও অভিযোগ, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা চিকিৎসকদের কমিশন দেওয়ায় প্রয়োজন না হলেও অতিরিক্ত ওষুধের নাম লিখে দিচ্ছে ব্যবস্থাপত্রে। সরকারি এই হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে রোগীরা বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে ক্রয় করছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবুল বাশার জানান, অনেক চিকিৎসক কাগজে-কলমে টঙ্গিবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক হলেও প্রেষণে অন্যত্র কাজ করছেন। এ কারণে চিকিৎসক সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি আরও জানান, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের জন্য জেলা ও সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দিয়ে অবহিত করা হলেও এখনও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।