রূপগঞ্জে স্কুলছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা

খুনিদের ভয়ে এলাকাছাড়া নিহতের পরিবার

হত্যায় জড়িতদের এলাকায় মহড়া, বিচার দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন, বিক্ষোভ

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৯

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে জিসান হোসেন (১৬) নামের এক নবম শ্রেণি পড়ূয়া স্কুলছাত্রকে পিটিয়ে ও আছড়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনার পর থেকেই খুনিদের ভয়ে জিসানের পরিবারের লোকজনসহ আত্মীয়স্বজন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদিকে, পেরাব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ক্লাস বর্জন করে জিসানের খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার করে ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। এ সময় এলাকাবাসীও ওই কর্মসূচিতে অংশ নেয়। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে গোলাকান্দাইল এলাকায় সন্ত্রাসীরা জিসান হোসেনকে পিটিয়ে ও আছড়ে গুরুতর আহত করলে শুক্রবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায় সে। জিসান হোসেন ঢাকা জেলার সূত্রাপুর থানার ধোলাইখাল রায়সাহেব বাজার এলাকার গোপাল হোসেনের ছেলে। স্থানীয় পেরাব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণি পড়ূয়া ছাত্র জিসান। জিসানের বাবা গোপাল হোসেন পরিবার নিয়ে রূপগঞ্জ উপজেলার কান্দাপাড়া এলাকায় প্রায় ১৫ বছর ধরে বসবাস করে আসছেন। বর্তমানে তারা পশ্চিম কান্দাপাড়া এলাকার মনোয়ার হোসেনের বাড়িতে বসবাস করছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৫ দিন আগে গোলাকান্দাইল মধ্যপাড়া এলাকার ছাত্রলীগের নামধারী নেতা সৌরভের ছোট ভাই সিয়ামসহ তার লোকজন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নাগেরবাগ বউবাজার এলাকার মাসুদ রানাকে পিটিয়ে আহত করে। এ সময় বউবাজার এলাকার বাদল নামের একজন প্রতিবাদ করলে তাকেও পিটিয়ে আহত করা হয়। ওই সময় নাগেরবাগ বউবাজার এলাকার লোকজনও পাল্টা সিয়ামের দুই স্বজনকে পিটিয়ে আহত করে।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার সকালে নাগেরবাগ বউবাজার এলাকার হৃদয় হাসান শুভ স্কুলছাত্র জিসান হোসেনকে নিয়ে গোলাকান্দাইল মধ্যেপাড়া এলাকায় ক্রিকেট খেলা দেখতে যায়। নাগেরবাগ বউবাজার এলাকার হওয়ায় গোলাকান্দাইল মধ্যেপাড়া এলাকার সৌরভসহ তার ছোট ভাই সিয়াম, বিদ্যুৎ, ইকরাম, শাওন, রোহান, আলামিন, নীরব, আরমান, ইমন, সাকিব, হৃদয়, ইয়ামিন, ফাহিম, মাসুম, মোস্তাকিমসহ আরও বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী হৃদয় হাসান শুভ ও জিসান হোসেনকে জোরপূর্বক উঠিয়ে গোলাকান্দাইল হাট সংলগ্ন বালুর মাঠে নিয়ে রড ও কাঠ দিয়ে পিটিয়ে শরীর থেঁতলে দেয়। পরে সেখান থেকে তুলে এনে সৌরভের অফিস কক্ষে দুই দফা পেটানো হয়। সেখান থেকে কৌশলে পালিয়ে যায় হৃদয় হাসান শুভ। এক পর্যায়ে প্রকাশ্য দিবালোকে জিসানকে প্রায় ১০ ফুট উঁচু থেকে মাটিতে বেশ কয়েকবার আছড়ে ফেলা হয়। পরে বালুর মাঠে গুরুতর অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায় সন্ত্রাসীরা। খবর পেয়ে পরিবারের লোকজন তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। ঘটনার পরদিন শুক্রবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জিসান মারা যায়। ঘটনার পর থেকেই হত্যার সঙ্গে জড়িতরা এলাকায় মহড়া দিয়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহসও পাচ্ছেন না। তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জমি দখলসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছে এলাকাবাসী। এদিকে, আহত হৃদয় হাসান শুভর খোঁজ নিতে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তারাও সন্ত্রাসীদের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ফুলজান বেগম বলেন, 'উদ্ধারের সময় আহত জিসান বলছিল আমার কোনো অপরাধ নেই, আমাকে অন্যায়ভাবে পিটিয়ে ও আছড়ে আহত করা হয়েছে। পায়ে ধরেও রেহাই পাইনি আমি।' কথাগুলো বলার সময় আমিসহ আশপাশের লোকজন কান্না ধরে রাখতে পারিনি।

জিসানের চাচি সুমি বেগম জানান, গোপাল হোসেনের ছেলে ইমন হোসেন, জিসান হোসেন ও মেয়ে মীম আক্তার রয়েছে। গোপাল হোসেন কান্দাপাড়া এলাকার ইস্রাফিল হাজিবাড়িতে চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিন বছর আগে বড় ছেলে ইমন হোসেন রূপসী এলাকায় ট্রাকচাপায় নিহত হন। ছোট ছেলে জিসানকে হত্যা করার পর এখন বাবা গোপাল হোসেনসহ পরিবারের লোকজন হত্যার ভয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। খুনিরা প্রভাবশালী হওয়ায় এবং তারা গরিব ও অসহায় বলে মামলা-মোকদ্দমা করতে সাহস পাচ্ছেন না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নিয়ে জিসানের লাশ জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। জিসানকে হারিয়ে বাবা গোপাল হোসেন ও মা রিনা বেগম পাগলের মতো হয়ে গেছেন। ঠিকমতো কথা বলতে পারছেন না। ছেলে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন তারা।

ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর শহিদুল ইসলাম বলেন, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দিলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি।