গণকবর দখলমুক্ত হলো না আজও

সাটুরিয়া

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

মো. জাহাঙ্গীর আলম, সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ)

১৯৭১-এ পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসর আলবদর-আলশামসের নির্যাতনের সাক্ষী স্মৃতিবিজড়িত সাটুরিয়ার গণকবরটি এক এনজিও এবং এক মুক্তিযোদ্ধার দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত হলো না আজও। তবু ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস ও ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস এলে এ গণকবর জিয়ারত করেন উপজেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধারাসহ এলাকার গণ্যমান্য মানুষ। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পেরিয়ে গেলেও সাটুরিয়ার গণকবর দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার করা যায়নি বলে এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে এ গণকবরের একটা অংশ আগাছা ও কলাগাছে ঢাকা পড়ে আছে।

১৯৭১ সালে সাটুরিয়া উপজেলার সরকারি আদর্শ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়টি ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প। স্কুলের পেছনে ছিল একটি খাল। সে খালের ঢালে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বাঙ্কার। পাকিস্তানি সেনারা সাটুরিয়ায় এলে মুক্তিযোদ্ধারা এখান থেকে চলে যান। সাটুরিয়াসহ আশপাশের উপজেলার শতাধিক নিরীহ নারী-পুরুষকে ধরে এনে হত্যা করে ওই বাঙ্কারে লাশ পুঁতে ফেলত রাজাকাররা। বর্তমানে সেই গণকবরের জায়গাটি একটি এনজিও ও এক মুক্তিযোদ্ধা দখল করে নিয়েছেন। সেখানে গড়ে তুলেছেন বসতবাড়ি ও এনজিওর স্থাপনা। গণকবর দখলকারী মুক্তিযোদ্ধা ও এনজিও কর্তৃপক্ষের দাবি, এখানে গণকবর নেই। গণকবর হচ্ছে সাটুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের পেছনের জায়গাটি।

সাটুরিয়া উপজেলা প্রশাসন থেকে জানা গেছে, ৭২ শতাংশ জমির ওপর সাটুরিয়ার গণকবর সংরক্ষণ করার জন্য দুইবার বাজেট আসে। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতার কারণে টাকাগুলো দু'বারই ফেরত চলে গেছে। সারাদেশে গণকবর ও বধ্যভূমি সংরক্ষণ করার নির্দেশ থাকলেও সাটুরিয়ার গণকবর চিহ্নিত করার পরও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয়রা জানান, হাইস্কুলের পেছনে খালের ঢালে ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প। ওই ক্যাম্পে রাজাকাররা নারী-পুরুষদের নির্মমভাবে হত্যা করে ওইসব বাঙ্কারে পুঁতে রাখত। বাঙ্কারে জায়গা না হওয়ায় কিছু লাশ মাটির উপরে ছিল। সেই লাশ শিয়াল-কুকুর টেনে সাটুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের পেছনে নিয়ে খেত। সেখানে মানুষের কিছু হাড় পাওয়া গেলে ধারণা করা হয় ওখানেই গণকবর। কিন্তু আসলে ওখানে গণকবর নয়। গণকবর হচ্ছে স্কুলের পেছনে। যেখানে উপজেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধারা জিয়ারত করে থাকেন।

সাটুরিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাধারণ সম্পাদক হাসান আলী বলেন, আমাদের একজন মুক্তিযোদ্ধা গণকবরের পূর্বপার্শ্বের অংশ দখল করে বসতবাড়ি নির্মাণ করেছেন। আর পশ্চিম পার্শ্বের অংশ একটি এনজিও দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে। আমিসহ এলাকার সব মুক্তিযোদ্ধার দাবি, অরক্ষিত গণকবরের জমি উদ্ধার করে সরকার এখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করুক।

সাটুরিয়া উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আ খ ম নূরুল হক জানান, গণকবরটি উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন। গণকবরটি ৪৯ বছর ধরে বেদখল হয়ে আছে। বিষয়টি অতি কষ্টের। সাটুরিয়ার ইউএনও আশরাফুল আলম বলেন, গণকবরটি কোথায় আছে, কে দখল করে নিয়েছে তা জেনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে গণকবরটি সার্ভে করার জন্য ভূমি অফিসকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ইতিহাসযুক্ত একটি সাইনবোর্ড লাগানোর কথা বলা হয়েছে। গণকবরের জমি উদ্ধার করে সেখানে স্মৃতিস্মম্ভ নির্মাণ করা হবে।