কাজে আসছে না কোটি টাকার সেচ প্রকল্প

কালাই

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

শাহারুল আলম, কালাই (জয়পুরহাট)

জয়পুরহাটের কালাইয়ে দেড় যুগ আগে কানমোনা-হারাবতি খালের ওপর নির্মাণ করা হয়েছিল কানমোনা-হারাবতি নামে উপসেচ প্রকল্প। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে ১৯৯৮ সালে একইভাবে আরেকটি নুনগোলা খালের ওপর নির্মাণ করেছিল 'কাদিরপুর-বাখড়া উপসেচ প্রকল্প'। দ্বিতীয় ক্ষুদ্রাকার পানিসম্পদ উন্নয়ন সেক্টর প্রকল্পের আওতায় এ দুটি সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নে এরই মধ্যে সরকারের খরচ হয়ে গেছে প্রায় এক কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করে প্রকল্প দুটি হাতে নেওয়া হলেও তা কার্যত কৃষকের কোনো উপকারেই আসেনি। শুস্ক মৌসুম দূরে থাক, এমনকি বর্ষাকালেও পানি আটকানো যায় না কানমোনা ও নুনগোলা খালের প্রকল্প এলাকায়। প্রকল্প এলাকার কৃষকদের অভিযোগ, সেচ প্রকল্প দুটি কৃষি আবাদে কোনো সুফল তো বয়ে আনেইনি, উল্টো ওই দুটি সেচ প্রকল্প এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত স্লুইসগেট দ্রুত পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্ট করায় পানির নিচে তলিয়ে যায় কৃষকের ফসল, ক্ষতি হয় সম্পদেরও। ফলে কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে সরকার মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে সেচ প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করলেও এখন কৃষকের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে তা রীতিমতো অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সেই থেকে নির্মিত সেচ প্রকল্প দুটি তদারকি ও দেখভাল করছে স্থানীয় এলজিইডি অধিদপ্তর।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ক্ষুদ্রাকার পানিসম্পদ উন্নয়ন সেক্টর প্রকল্পের আওতায় কৃষি আবাদে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে ১৯৯৮ সালে এ উপজেলার আহম্মেদাবাদ-মাত্রাই-উদয়পুর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত কানমোনা-হারাবতি খালের উপর কানমোনা-হারাবতি উপসেচ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় কানমোনা খালের রোয়াইর পয়েন্টে ৩০ লাখ টাকায় একটি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। খাল খনন, স্লুইসগেট নির্মাণসহ প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হয় প্রায় অর্ধকোটি টাকা। প্রকল্পটি যাতে এলাকার কৃষকদের উপকারে আসে, এ জন্য পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রকল্প এলাকার কৃষকদের নিয়ে গঠন করা হয় কানমোনা-হারাবতি পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি (পাবসস)। অন্যদিকে, ২০০৫ সালে একই প্রকল্পের আওতায় উপজেলার জিন্দারপুর ইউনিয়নের নুনগোলা খাড়িতে কাদিরপুর-বাখড়া উপসেচ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পেও ব্যয় করেছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে কাদিরপুর ও বাখড়ার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নুনগোলা খালের বেলগাড়িয়া পয়েন্টে ২৮ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭৬ টাকায় ৩ ভেন্ট রেগুলেটর (স্লুইসগেট) এবং রেগুলেটর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার অদূরে কাদিরপুর গ্রাম-সংলগ্ন প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প কার্যালয়ও (অপারেশন মেইনট্যান্স শেড) নির্মাণ করা হয়। অবশিষ্ট টাকায় খাল খনন করা হয়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য গঠন করা হয় কাদিরপুর-বাখড়া পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি। কিন্তু তদারকির দায়িত্বে থাকা এলজিইডির উদাসীনতা এবং সংশ্নিষ্ট পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির স্থবিরতার কারণে এ দুটি সেচ প্রকল্প কৃষকের নূ্যনতম উপকারে আসেনি।

বাখরা গ্রামের কৃষক লোকমান আলী ও কছিমুদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়ে যাওয়া কানমোনা-হারাবতি সেচ প্রকল্পটি এলাকার কৃষিক্ষেত্রে আশীর্বাদ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা না হয়ে প্রকল্পটি এখন আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ অপরিকল্পিতভাবে স্লুইসগেট নির্মাণ এবং তা ব্যবস্থাপনার অভাব। শুস্ক মৌসুমে এ খালে পানি না থাকায় যে যার মতো করে পুরো খালে ইরি ধানের ফসল লাগিয়েছে। কানমোনা-হারাবতি পানি ব্যবস্থাপনা সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুল ওহাব বলেন, 'নানা জটিলতার কারণে এ সেচ প্রকল্প কৃষকের কোনো উপকারে আসেনি।'

কাদিরপুর-বাখড়া পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন বলেন, এ সেচ প্রকল্পে কোনোভাবেই পানি আটকানো যাচ্ছে না। তা ছাড়া নতুন করে বরাদ্দ না থাকায় খাল খননও সম্ভব হচ্ছে না।

এলজিইডি-জয়পুরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফ আলী খান বলেন, 'কালাইয়ে দুটি সেচ প্রকল্পই কৃষকের কোনো উপকারে আসেনি এ কথা সত্যি। তবে প্রকল্প দুটি সচল করতে পানি ব্যবস্থাপনা সমিতির ফের নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্লুইসগেটগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিশেষ করে কাদিরপুর-বাখড়া সেচ প্রকল্পটিতে পানি আটকানো যাচ্ছে না।'