নাটোর ফায়ার সার্ভিসে সিলিন্ডার বাণিজ্য

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০১৮      

নবীউর রহমান পিপলু, নাটোর

নাটোরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক এবং ফায়ারম্যানের বিরুদ্ধে সিলিন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (সিলিন্ডার) বাধ্যতামূলক হওয়ায় নাটোর শহরের মাদ্রাসা মোড় এলাকার ওষুধ ব্যবসায়ী মহসীন আলীর কাছ থেকে ৮৫০ টাকা মূল্যের ৫ লিটার এবিসি অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডারের জন্য ২২০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। একই এলাকার আরেক ওষুধ ব্যবসায়ী ইব্রাহীম হোসেন জানান, তার কাছ থেকে একটি সিলিন্ডারের জন্য নেওয়া হয়েছে ২৫০০ টাকা।

সিংড়া উপজেলার সেবা ক্লিনিকের পরিচালক হারুনুর রশীদ জানান, ২টি সিলিন্ডারের লাইসেন্স, নবায়ন ও রিফিল চার্জের কথা বলে ৫ হাজার টাকা নিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের দুই কর্মকর্তা। কিন্তু এখনও তিনি তা বুঝে পাননি। নলডাঙ্গা উপজেলার জুয়েলারি মালিক সাইফুল ইসলাম মোল্লা জানান, তার কাছ থেকেও ৫ লিটারের একটি অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডারের জন্য নেওয়া হয়েছে ২২০০ টাকা। এসব অনিয়মের বিষয়ে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার গোলাম মোস্তফা নামে এক ব্যক্তি দুদকের কাছে অভিযোগ করেন।

অভিযোগে বলা হয়, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রটি বাজারমূল্যের চারগুণ দামে বিক্রি করে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, লাইসেন্স নবায়ন, অগ্নিনির্বাপক উপকরণ রিফিলে অতিরিক্ত ফি আদায়ের মাধ্যমে প্রতারণা করা হয়েছে গ্রাহকদের সঙ্গে। সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে জেলার বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক, হাসপাতাল, জুয়েলার্স, পেট্রোল পাম্প, ইটভাটাগুলোতে অভিযুক্ত আকতার হোসেন ও সাইফুল ইসলাম সশরীরে গিয়ে অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন-২০০৩-এর আলোকে প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ক্রয়ের পরামর্শ দেন। রাজি না হলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানাসহ বিভিন্ন হয়রানির ভয়ভীতি দেখান। ফলে বাধ্য হয়েই অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কেনেন তারা।

শহরের উত্তরা সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মকবুল হোসেন বলেন, সমিতির সদ্যপ্রয়াত সভাপতি ৪টি অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডারের জন্য ৬ হাজার টাকা দিয়েছিলেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। সেগুলো রিফিলের জন্য ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হবে।

নলডাঙ্গা উপজেলার মোল্লা জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম মোল্লা বলেন, মোবাইল কোর্টের ভয় দেখিয়ে নলডাঙ্গা বাজারের বিভিন্ন দোকানে ২২০০ টাকা দামে একেকটি ৫ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি করেছেন ফায়ারম্যান সাইফুল। সিলিন্ডারের প্রকৃত দাম জানার পর বুঝতে পারছি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন-২০০৩ এবং অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ বিধিমালা-২০১৪ অনুযায়ী, সংশ্নিষ্ট ফায়ার সার্ভিস অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে শুধু উদ্দীপনামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। অথচ অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন-২০০৩ এর ১৯ থেকে ২১ ও ২৩ ধারা অনুযায়ী দাহ্য বস্তু সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, যাচাইকরণ, সংকোচন, সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাজে বাধাদান, ইতিপূর্বে শাস্তির বিধান সাপেক্ষে শাস্তি না দেওয়া হলে শাস্তির ব্যবস্থাজনিত কারণে সর্বনিম্ন ১ থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। মূলত এই ৪টির ধারার অপপ্রয়োগের মাধ্যমেই হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে কয়েক কোটি টাকা।

অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের আমদানি, সরবরাহ ও রিফিলকারী প্রতিষ্ঠান নিউটেক্স ফায়ার ফাইটিং ইকুইপমেন্টের মূল্য তালিকা অনুযায়ী আড়াই থেকে ৩ কেজি, ৪ কেজি, ৫ কেজি ও ৬ কেজির এবিসি সিলিন্ডারের মূল্য যথাক্রমে ৩৫০, ৫৫০, ৭০০, ৮৫০ ও ১০৫০ টাকা। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে প্রতিটি নির্বাপক যন্ত্রের রিফিল ব্যয় ওজনভেদে ১২৫ থেকে ১৫০ টাকা। অথচ নাটোরে এর ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, ৫ কেজির  সিলিন্ডারের দাম প্রকৃত দামের চেয়ে ৪ গুণ পর্যন্ত বেশি নেওয়া হয়েছে।

উপপরিচালক আকতার হোসেন অভিযোগটি ভিত্তিহীন উল্লেখ করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। অপরদিকে ফায়ারম্যান সাইফুল ইসলাম ১০ দিনের ট্রেনিংয়ে নাটোরের বাইরে রয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচালক নুরুল ইসলাম বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ওই কর্মকর্তা এবং ফায়ারম্যানের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হবে। অভিযোগ প্রমাণ হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।