নীলকুঠি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই

বাগাতিপাড়া

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

নবীউর রহমান পিপলু,নাটোর

নীলকুঠি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই

অরক্ষিত বাগাতিপাড়া উপজেলার নওশেরা গ্রামের নীলকুঠি- সমকাল

ব্রিটিশ শাসনামলে নীল চাষের জন্য কৃষকদের ওপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ সাহেবদের নির্মম নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার নওশেরা গ্রামের নীলকুঠি। অযত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়া এ কুঠিবাড়িটি ধসে পড়ে ধীরে ধীরে বিলীন হচ্ছে। এরই মধ্যে ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে গেছে বাগাতিপাড়া সদর, পারকুঠি, নুরপুরকুঠি, বাঁশবাড়িয়া ও চিথলিয়া এলাকায় ইংরেজ নীলকরদের সময় তৈরি স্থাপনা। অনেক সম্পদ এখন বেদখল হয়ে গেছে।

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারত থেকে আদিবাসী 'বাগদি' সম্প্রদায়ের লোক এনে বাগাতিপাড়ার নওশেরা, পারকুঠি, নুরপুরকুঠি, বাঁশবাড়িয়া ও চিথলিয়া এলাকার জঙ্গলাকীর্ণ জমি পরিস্কার করে নীলচাষের উপযোগী করে তোলা হয়। এর পর নিরীহ কৃৃষকদের জোর করে সে জমিতে নীল চাষে বাধ্য করা হতো। নীলকরদের মধ্যে তখন যাদের নাম জানা যায়, তাদের মধ্যে কুরিয়াল টিসি চুইডি, সিনোলব ম্যাকলিইড, ডাম্বল, ব্রিসবেন নিউ হাউস উল্লেখযোগ্য। তারা রাজশাহী, ঝিনাইদহ, শিকারপুর, কেশবপুর ও নাটোরের বাগাতিপাড়া এলাকায় জোর করে কৃষকদের দিয়ে নীল চাষ করাত। ইংরেজদের কাছ থেকে ভারত ও পূর্ব বাংলা ভাগাভাগির পর রেনুইক অ্যান্ড কোং পূর্ব বাংলা এবং ভারতের সব কুঠির মধ্যে নওশেরা তথা পূর্ব বাংলার সব সম্পদ রফিক অ্যান্ড কোংয়ের নামে হয়ে যায়। এর পর সেখানে চিনিকল স্থাপন করা হয়। এর পরপরই সুগার মিল কর্তৃপক্ষ কোটি কোটি টাকার বিশাল গাছ কেটে ফেলে। কালের বিবর্তনে সে সময়ের স্থাপিত এ উপজেলার নীলকুঠিয়ালদের অফিস-আদালত এবং নীল সংরক্ষণাগারসহ বহু স্থাপনা ভূমিকম্পে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কিছু কিছু স্থানে এই নীলকুঠি ও কলকুঠিগুলোর কিছু অংশ কালের সাক্ষী হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। এরই অংশ বিশেষ নীলকর ইংরেজদের ডাকবাংলো। তবে সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এসব স্থাপনাও বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক নুর মোহম্মদ বলেন, পারকুঠি ও নওশেরা গ্রামে ইংরেজরা নীলচাষের উপযোগী করে কুঠিবাড়ি স্থাপন করেন। এর পর ভারত থেকে আদিবাসী 'বাগদি' সম্প্রদায়ের লোক এনে জঙ্গল পরিস্কার করে। এ ছাড়া খাজনা আদায়ের জন্য আনা হয় পাঠান খানদের। পরে এসব জমির মালিকদের নীলচাষে বাধ্য করা হয়। যারা অসম্মতি জানাত তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে ওই কুঠিবাড়িতে আটকে রেখে নির্মমভাবে নির্যাতন করে নীলচাষে বাধ্য করা হতো। কিন্তু কৃষকদের ন্যায্যমূল্যও দেওয়া হতো না।

নওশেরা গ্রামের আশরাফুল আলম খান ডাবলু এবং গণমাধ্যম কর্মী মুক্তিযোদ্ধা রেজাউন্নবী ধ্বংসপ্রায় কুঠিবাড়ি সংস্কার ও ইংরেজদের নির্মম নির্যাতনের ইতিহাস সংরক্ষণের দাবি জানান। তারা বলেন, নওশেরা গ্রামটিতে মূলত ব্রিটিশরা গেঁড়ে বসার জন্য আদিবাসী, পাঠান ও খানদের এনেছিল। সে সময় এখানকার চাষিদের দিয়ে জোরপূর্বক নীল চাষ করানো হতো। নীল তৈরির জন্য পুকুর, কুঠিবাড়ি, ডাকবাংলোসহ নানা স্থাপনা সে সময় তৈরি করা হয়। এসব স্থাপনা ইতিহাসের স্বার্থেই সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা। স্থাপনাগুলো সংস্কারের পাশাপাশি পর্যটক আকৃষ্ট করতে ইতিহাস সংরক্ষণের জন্যও দাব করেন তারা।

বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসরিন বানু বলেন, এর আগে উপজেলা পরিষদ থেকে নীলকুঠি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়; কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায় সম্পত্তিটি বর্তমানে চিনিকলের অধীন। ভারত ভাগের সময় ইংরেজরা রেনুইক নামে একটি কোম্পানিকে নীলকুঠিসহ কিছু সম্পত্তি দিয়ে দেয়। পরে ওই কোম্পাণি বাংলাদেশ সুগার করপোরেশনের কাছে বিক্রি করায় বর্তমানে তা চিনিকলের অধীন।