এক সময় নিভৃত গ্রামের মানুষের চিত্তবিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল যাত্রাপালা, যা ছিল নির্মল ও নিখাদ বিনোদনের। রাত জাগা হাজারো দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া যাত্রাপালা মূলত বহু ঐতিহ্যে মোড়ানো গ্রাম বাংলার পুরোনো একটি উৎকৃষ্ট বিনোদন ছিল। কথাগুলো বলছিলেন এক সময়ের স্থানীয় মঞ্চ কাঁপানো যাত্রাশিল্পী তাড়াশের জহির উদ্দিন (৫৮)।

পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি আরও জানান, গত দুই দশকে থেমে থেমে যাত্রাপালা নানা ঘাত-প্রতিঘাতে এখন অতীত বিনোদন হিসেবে খাতায় নাম লিখিয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার শিল্পী এখন কাজ না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অথচ যাত্রাপালার সেই বাঁশের বাঁশি, বিউগল, কর্নেট, হারমোনিয়াম, ডুগি-তবলা, নাল, ঢোল, জুড়ি, খঞ্জনির সুর মূর্ছনা এখনও অনেক যাত্রাশিল্পীকে ডাকে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে যাত্রা আয়োজকদের বাণিজ্যিক চিন্তাধারা, জুয়া, হাউজি, কিছু দর্শকের রুচির পরির্বতন, অশ্নীল নৃত্য, নিরাপত্তার অভাবসহ নানা কারণে যাত্রা শিল্পে ধস নেমেছে। অনেকেই পেশা পরিবর্তন করছেন বাধ্য হয়ে। সেই সঙ্গে গ্রামবাংলার যাত্রাপাগল বিনোদনপ্রত্যাশী দর্শকরা তাদের চিরচেনা সুস্থ বিনোদন যাত্রাপালা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে আক্ষেপ করেন যাত্রাশিল্পী জহির উদ্দিন।

তাড়াশের মাধাইনগর ইউনিয়নের কাঞ্চেশ্বর গ্রামের চির সবুজ যাত্রাশিল্পী জহির উদ্দিন ১৯৭৯ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বাবা গোলাম আলী সরকারের অনুপ্রেরণায় নিজ গ্রামের স্কুল মাঠে পুষ্পমালা যাত্রাপালায় নায়কের চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে অভিনয় জীবন শুরু করেন। এরপর একে একে গত ৪২ বছরে প্রখ্যাত লেখক সচীন সেনগুপ্তের নবাব সিরাজ উদ দৌলা, লেখক ভৈরবনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের দেবী সুলতানা, মা মাটি মানুষ, একটি পয়সা, নাচমহল, লেখক রঞ্জন দেবনাথের সাত পাকে বাঁধা, অনুসন্ধান, মায়ের চোখে জলসহ শতাধিক সুস্থ ধারার যাত্রাপালার মঞ্চে খলচরিত্রে অভিনয় করে দর্শকপ্রিয়তা পান।

তিনি জানান, ১২-১৪ বছর বয়সেই যাত্রাপালায় অভিনয়ের নেশা তাকে পেয়ে বসেছিল। তাই যাত্রাশিল্পী জহির উদ্দিন পাবনার চাটমোহর, সাঁথিয়া, নাটোর সদর, সিংড়া, দুর্গাপুর, বগুড়ার সুকানপুকুর, শেরপুর, সিরাজগঞ্জের জুটমিল, শাহজাদপুর. রায়গঞ্জ, তাড়াশসহ বিভিন্ন এলাকার মাদকমুক্ত ও সুশৃঙ্খল যাত্রা মঞ্চে চার দশক অভিনয় করেন। এতে তখনকার সময়ে প্যান্ডেলভর্তি নারী-পুরুষ দর্শক সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত যাত্রাপালা দেখতেন।

সে সময় অভিনয় করে যৎসামান্য রোজগারেই অনেক শিল্পীর সংসার চলত। অথচ এখন বড় দুঃসময় যাচ্ছে চলনবিল অঞ্চলসহ দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা যাত্রা শিল্পীদের। এ জন্য যাত্রাপাগল জহিরের মন কাঁদে। অনেক সম্মাননা পেয়েছেন এ গুণী শিল্পী। বর্তমানে ব্যবসা ও কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন এলাকায় যাত্রাপাগল নামে পরিচিত জহির উদ্দিন। বললেন, সুস্থ ধারায় যাত্রাশিল্প ফিরে আসার অপেক্ষায় আছেন তিনি।

মন্তব্য করুন