বগুড়ায় পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থেকে এক লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হবেন- এমনটাই বিশ্বাস ছিল বিএনপি নেতাকর্মীদের। নির্বাচনী প্রচারে তারা প্রকাশ্যেই বলতেন, সুষ্ঠু ভোট হলে ধানের শীষ এক লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হবে। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে স্বীকার করা হলেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে দলটির ভোটের ব্যবধান মাত্র ছয় হাজারে নেমে এসেছে। এ ঘটনার জন্য জামায়াত ও প্রতীকনির্ভরতাকে দায়ী করে ফেসবুকে আলোচনা-সমালোচনা চলছে, যা নিয়ে চিন্তিত দলটির নেতাকর্মীরা। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী রেজাউল করিম বাদশার ধানের শীষ প্রতীকে পড়েছে ৮২ হাজার ২১৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল মান্নান আকন্দ পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৯০ ভোট। নৌকার প্রার্থী ওবায়দুল হাসান ববির নৌকায় পড়েছে ২০ হাজার ৮৯ ভোট। আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মান্নান আকন্দের 'জগ' আর ওবায়দুল হাসান ববির নৌকা প্রতীকের ভোটের যোগফল দাঁড়ায় ৭৬ হাজার। বিজয়ী ধানের শীষের সঙ্গে যার ব্যবধান ছয় হাজার।

এবারের নির্বাচনে স্বল্প ব্যবধানে ধানের শীষের জয়ের ঘটনাকে দলের ঘাঁটি হিসেবে দাবি করা বগুড়ায় বিএনপির রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত হিসেবেই মনে করা হচ্ছে। তাই রোববার রাতে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর পরই দলটির নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আত্মসমালোচনায় সরব হয়ে উঠেছেন। সেখানে অনেকেই জামায়াতনির্ভরতা ও জামায়াতের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তোলার পাশাপাশি প্রতীকনির্ভর রাজনীতিকে দায়ী করে দলকে আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছেন।

এর আগে ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বগুড়া পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী বর্তমান মেয়র অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম মন্টুর ভোটের ব্যবধান ছিল ৫৯ হাজার। এবার দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল সরকারের 'দমন-পীড়ন নীতি'র কারণে পাঁচ বছরের ব্যবধানে বগুড়ায় ধানের শীষের ভোটার সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তা ছাড়া মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী ওবায়দুল হাসান ববি ভোটের মাঠে একেবারেই নতুন এবং শাসক দলেরই সাবেক এক নেতা আবদুল মান্নানের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে সক্রিয় থাকায় নির্বাচনে ধানের শীষ আরও বাড়তি সুবিধা পাবে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, পাঁচ বছরের ব্যবধানে ধানের শীষের ভোট বাড়েনি, উল্টো ২৬ হাজার কমেছে। একইভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সঙ্গে ধানের শীষের ভোটের ব্যবধানও প্রায় ১০ ভাগের এক ভাগে (২০১৫ সালে ব্যবধান ছিল ৫৯ হাজার; এবার ছয় হাজার) নেমে এসেছে।

কিন্তু ঘাঁটি হিসেবে দাবি করা বগুড়ায় ভোটযুদ্ধে কেন বিএনপির এই পিছিয়ে পড়া? এমন প্রশ্নের জবাবে দলটির নেতারা প্রকাশ্যে কিছু না বললেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকের স্ট্যাটাস এবং তাতে করা কমেন্ট থেকে দুটি কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে। সেগুলো হলো- এক. 'ভোটযুদ্ধে ধানের শীষ থেকে জামায়াতে ইসলামীর মুখ ফিরিয়ে নেওয়া' এবং দুই, 'প্রতীকনির্ভর নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীলতা'। ফল ঘোষণার পর রোববার রাতে বগুড়া পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হামিদুল হক হিরু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, 'বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে'। তার এ কমেন্টে সাইফুল ইসলাম নামের একজন লিখেছেন, 'আপনাদের জামায়াত ছাড়তে হবে।' হাবিবুর রহমান রাজিব নামের অপর একজন লিখেছেন, 'সত্যি তাই ভাই, জামায়াতও কিছু বেইমানি করেছে।' তার প্রত্যুত্তরে উদয় রায় নামে একজন লিখেছেন, 'ভাই দু-একজন ছাড়া বাকিদের কখনও ইমান ছিল কি!' জিলহাজ উদ্দিন নামের একজন লিখেছেন, 'মার্কার দিন শেষ হতে আর বেশি দেরি নেই। জনগণের মেয়র হতে গেলে জনগণের পালস

বুঝতে হবে। জনগণের সঙ্গে মিশতে হবে। শুধু

মনোনয়ন পেলাম আর মেয়র হয়ে গেলাম, এইটা ভাবার দিন শেষ।'

বগুড়া জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম বলেন, এবারের নির্বাচনে কালো টাকার ব্যাপক প্রভাব ছিল। টাকার বিনিময়ে বিএনপি ভক্তদের বিভ্রান্ত করার কারণেই ধানের শীষের ভোট কিছুটা কমেছে। তবে তিনি এও বলেন, 'আরও অনেক কারণ রয়েছে, আমরা সেগুলো চিহ্নিত করেছি এবং খতিয়েও দেখা হচ্ছে।'

মন্তব্য করুন