যুক্তরাষ্ট্রের সরকারে অচলাবস্থার (শাটডাউন) টানা ২০ দিন অতিবাহিত হয়েছে গতকাল শুক্রবার। তবে সেই অচলাবস্থাকে থোড়াই কেয়ার করে নিজের প্রতিশ্রুতি মেক্সিকো সীমান্ত দেয়াল নির্মাণে অটল রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু তাই নয়, দেয়াল নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ পেতে আবারও জরুরি অবস্থা জারির হুমকি দিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার টেক্সাসে সীমান্ত পরিদর্শনে গিয়ে এ হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এদিকে তার এ অনড় অবস্থানের বিরুদ্ধে এবং সরকারের অচলাবস্থা নিরসনের দাবিতে হোয়াইট হাউসের সামনে বিক্ষোভ করেছেন কয়েকশ' সরকারি কর্মচারী। তারা ট্রাম্পের আদলে বেলুন নিয়ে বিক্ষোভে শামিল হন। খবর বিবিসি ও এএফপির।

টেক্সাস সফরকালে ট্রাম্প জানিয়েছেন, মেক্সিকোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য যদি প্রয়োজনীয় অর্থ না পান, তাহলে তিনি জরুরি অবস্থার বিষয়ে বিবেচনা করবেন।

২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রচারণাকালে অন্যতম আশ্বাস ছিল মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ। কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের বিরোধিতায় আটকে আছে তার সে পরিকল্পনা। ডেমোক্র্যাটরা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দাদের করের টাকা দিয়ে দেয়াল নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভে ডেমোক্র্যাটরা একটি বাজেট বিল পাস করলেও তাতে মেক্সিকো সীমান্তের জন্য তহবিল বরাদ্দ রাখা হয়নি। অন্যদিকে ট্রাম্প বলছেন, তার দাবিকৃত বরাদ্দ না রাখলে কোনো বাজেট বিলই তিনি অনুমোদন দেবেন না। উপরন্তু কংগ্রেসকে এড়িয়েই দেয়াল নির্মাণে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন ট্রাম্প- এমন হুমকি দিয়ে আসছেন গত কয়েকদিন ধরে। মূলত এ দ্বন্দ্বের কারণে যুক্তরাষ্ট্র সরকারে সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা। আটকে আছে ফেডারেল সরকারের ৮ লাখ কর্মকর্তার বেতন।

টেক্সাসে গিয়ে আবারও সেই হুমকি দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প বলেন, মেক্সিকো সীমান্তে অনুপ্রবেশকারী, সন্ত্রাসবাদী, মাদক পাচারকারীদের রুখতে দেয়াল তৈরি অত্যন্ত জরুরি। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে অবিলম্বে এ কাজ শুরু করা প্রয়োজন।

তার এমন সাবধানবাণী সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে শক্তিশালী বিরোধী ডেমোক্রেটিক দল ট্রাম্পের প্রকল্পের জন্য কিছুতেই ৫৭০ কোটি ডলার মঞ্জুর করতে রাজি হচ্ছে না। অন্যদিকে, দেশের জনগণের মধ্যেও দেয়াল তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এমন অবস্থায় সমর্থন বাড়ানোর আশায় টেক্সাস রাজ্যে মেক্সিকো সীমান্ত সফর করলেন ট্রাম্প। কয়েকজন সীমান্তরক্ষী, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজন নেতার উপস্থিতিতে ট্রাম্প বলেন, অবশ্যই একটা সংকট চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধের অনেক ঘটনার জন্য সীমান্ত পেরিয়ে আসা মানুষ দায়ী।

এ সময় ডেমোক্রেটিক পার্টির ওপর চাপ বাড়াতে ট্রাম্প আবার জাতীয় স্তরে জরুরি অবস্থা ঘোষণার হুমকি দেন। তিনি বলেন, এখনও সেই পথে না গেলেও প্রয়োজনে তিনি এ পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবেন না। সে ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য বরাদ্দ করা জরুরি তহবিল থেকে অর্থ নিয়ে দেয়াল নির্মাণের কাজে লাগানো হবে। এ জরুরি তহবিলে ১,৩৯০ কোটি ডলার জমা আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হোয়াইট হাউস এই লক্ষ্যে প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে।

তার পরও ডেমোক্রেটিক পার্টি ট্রাম্প প্রশাসনের দেয়াল তৈরির প্রস্তাবের বিরোধিতায় অটল রয়েছে। এ মুহূর্তে সীমান্তে কোনো সংকটও তারা দেখছে না। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভে ডেমোক্র্যাট স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বলেন, সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে প্রযুক্তির প্রয়োগসহ বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। দেয়াল নির্মাণ এমন এক বিলাসিতা, যা কোনো অবস্থায় দেশের সামর্থ্যের মধ্যে থাকতে পারে না। ট্রাম্প প্রশাসনের শাটডাউন বন্ধ করে এ বিষয়ে আলোচনার আহ্বান জানান তিনি।

যদিও আগের দিনই ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে এ-বিষয়ক আলোচনা থেকে ওয়াকআউট করেন ট্রাম্প। বৈঠকে ন্যান্সি পেলোসি ও সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার দেয়াল নির্মাণে অর্থ ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানান। এতে ওই বৈঠককে সময়ের অপচয় বলে আখ্যায়িত করে 'বাই বাই' বলে বেরিয়ে যান ট্রাম্প।

এদিকে চলমান শাটডাউন বন্ধের দাবিতে মিছিল করেছেন দেশটির সরকারি কর্মীরা। ট্রাম্পের টেক্সাস সফরের প্রাক্কালে বৃহস্পতিবার 'আমাদের বেতন চাই' স্লোগান দিয়ে হোয়াইট হাউস অভিমুখে মিছিল করেন তারা। তাদের হাতে ব্যানারে লেখা ছিল- 'ট্রাম্প : শাটডাউন বন্ধ করুন' 'অবরোধ নয়, কাজ চাই আমরা।'

পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার বিজ্ঞানী ইলাইনি সুরাইনো বলেন, এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে তাকে অবসরে যেতে হবে।

শান্তি করপোরেশনের কর্মী ম্যাথিউ ক্রিচটন বলেন, শাটডাউন কতদিন চলবে তার নিশ্চয়তা না থাকায় তারা কোনো খাবারসহ অন্যান্য কোনো পরিকল্পনা করতে পারছেন না। এটা খুবই লজ্জার যে, আমি কাজ করতে সক্ষম কিন্তু করতে পারছি না।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থবছর শুরু হয় ১ অক্টোবর। তার আগেই বাজেট অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও সমঝোতার অভাবে কখনও কখনও কংগ্রেস তা পাস করাতে ব্যর্থ হয়। এমন অবস্থায় অস্থায়ী বাজেট বরাদ্দের মধ্য দিয়ে সরকার পরিচালনার তহবিল জোগান দেওয়া হয়। অস্থায়ী এই বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে দুই কক্ষের অনুমোদনসহ প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের তিন-চতুর্থাংশ কার্যক্রম পরিচালনার অর্থ বরাদ্দ করা আছে। বাকি এক-চতুর্থাংশের বাজেট ফুরিয়ে যাওয়ায় অচলাবস্থা ঠেকাতে গত ২১ ডিসেম্বর নতুন অস্থায়ী বাজেট বরাদ্দ ছিল অপরিহার্য। তবে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের বরাদ্দ প্রশ্নে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় সৃষ্টি হয় 'অচলাবস্থা'। বরাদ্দ কম পড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ১৫টি কেন্দ্রীয় দপ্তরের মধ্যে ৯টিতে আংশিক শাটডাউন চলছে।

মন্তব্য করুন