গণবিক্ষোভের মুখে লামের নতিস্বীকার

প্রত্যর্পণ বিলের মৃত্যু হয়েছে

বিল প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালাবে বিক্ষোভকারীরা

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০১৯      

সমকাল ডেস্ক

হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি লাম বলেছেন, গণবিক্ষোভের মুখে হংকংয়ের প্রত্যর্পণ বিলের 'মৃত্যু' হয়েছে। এ বিল নিয়ে সরকারের সব চেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার হংকংয়ে সরকারের প্রধান দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি। তবে বিক্ষোভকারীদের দাবি মেনে নিয়ে এ বিল প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে কি-না, সে বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেননি তিনি। এমনকি এ বিষয়ে তার কাছ থেকে কোনো আশ্বাসও পাওয়া যায়নি। ফলে বিক্ষোভকারীরা রাজপথের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে। খবর বিবিসি ও রয়টার্সের।

প্রত্যর্পণ বিল কেন্দ্র করে হংকংয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। অস্থিরতা চলার মধ্যেই বিলটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন ক্যারি লাম। সংবাদ সম্মেলনে লাম বলেন, 'সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে সৃষ্ট সন্দেহ এবং সরকার আইন পরিষদে বিলটি পাসের প্রক্রিয়া আবার শুরু করবে কি-না, তা নিয়ে উদ্বেগ এখনও রয়ে গেছে। তাই আমি এখানে আবার বলছি, এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা নেই। বিলটি মৃত।'

এর আগে তিনি বলেছিলেন, ২০২০ সালে বর্তমান আইন পরিষদের মেয়াদ শেষে বিলটি 'মারা যাবে'। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে ক্যারি লামের বক্তব্য সন্তুষ্ট করতে পারেনি বিক্ষোভকারীদের। এ বিষয়ে বিক্ষোভ আয়োজনকারী সিভিল হিউম্যান রাইটস ফ্রন্টের নেতা বনি লিউং বলেন, 'আমাদের পাঁচটি মূল দাবি রয়েছে। বিলটি পুরোপুরি প্রত্যাহার তার মধ্যে একটি। সরকার যদি এটি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা না দেয়, তাহলে বিক্ষোভ থামবে না, অব্যাহত থাকবে।' সিভিক পার্টির সংসদ সদস্য আলভিন ইউং বলেন, বিলটির ব্যাপারে যা বলা হয়েছে, সেটা রাজনৈতিক বক্তব্য মাত্র। এটিকে আইনগতভাবে প্রত্যাহার করার কথা খোলাসা করা হয়নি।' এ বিলটি হংকংয়ের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং চীন সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে ব্যবহূত হতে পারে বলে বিরোধীদের আশঙ্কা রয়ে গেছে। সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশ হংকং চীনের অংশ হলেও 'এক দেশ, দুই নীতি পদ্ধতিতে' এটি পরিচালিত হয় এবং আধা-স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে হংকং। হংকংয়ের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা ও চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে পৃথক আইনি ব্যবস্থা আছে। হংকং সরকার মধ্য জুনে প্রস্তাবিত প্রত্যর্পণ বিলটি স্থগিত করার পরও প্রতিবাদ বিক্ষোভ চলতে থাকে। প্রতিবাদ কখনও কখনও সহিংসও হয়ে ওঠে। ১ জুলাইয়ে প্রতিবাদকারীরা কয়েক ঘণ্টা ধরে হংকংয়ের পার্লামেন্ট অবরোধ করে রাখার একপর্যায়ে পার্লামেন্টের কেন্দ্রীয় চেম্বারে ঢুকে ভাংচুর চালায়। বিক্ষোভকারীরা লামের পদত্যাগ দাবি করে। বিলটি নিয়ে তাদের উদ্বেগ তুলে ধরতে ৭ জুলাই মূল ভূখণ্ডের চীনা পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়- হংকংয়ের এমন একটি এলাকায় কয়েক হাজার প্রতিবাদকারী সমাবেশ করেছিল।

প্রত্যর্পণ বিলটি পাস করার পক্ষে সরকারের যুক্তি ছিল, হংকং যেন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত না হয়। বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রস্তাবিত আইনটিতে বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক মামলা এই আইনের আওতাভুক্ত হবে না। সরকার আরও দাবি করেছিল, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে এই প্রস্তাবিত আইন সঙ্গতিপূর্ণ। শুধু গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবিশেষকেই এ আইন প্রয়োগ করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কথা বিবেচনা করা হবে।

তবে আইনটির সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন, এ আইনের কারণে স্বায়ত্তশাসিত এই অঞ্চলটির ৭৩ লাখ বাসিন্দা, এমনকি বিমানবন্দর ব্যবহারকারী ব্যক্তিবিশেষ চীন সরকার প্রভাবিত আদালতের নির্দেশের আওতাভুক্ত হয়ে যেতে পারে। উল্লেখ্য, ১৮৪১ সাল থেকে ব্রিটিশ কলোনির অধীন ছিল হংকং। প্রথম আফিম যুদ্ধের পর ব্রিটিশদের কাছে দ্বীপটি সমর্পণ করে দিয়েছিল চীন। পরে ১৯৯৭ সালে সার্বভৌমত্ব অর্জনের পর 'ওয়ান কান্ট্রি, টু সিস্টেম' শর্তের আওতায় ফের চীনের কাছে হস্তান্তরিত হয় হংকং। এতে হংকং চীনের অধীনে থাকলেও তাদের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। তখন থেকে এখন পর্যন্ত এবারের বিক্ষোভই ছিল অঞ্চলটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের একটি।