ইরানের সঙ্গে চুক্তি রক্ষায় ইইউর নতুন উদ্যোগ

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০১৯      

সমকাল ডেস্ক

ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তি বহাল রাখতে বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইউরোপীয় নেতারা। গতকাল সোমবার ব্রাসেলসে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে এ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওবামা বিদ্বেষেই ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরে যাওয়ার রহস্য ফাঁস হওয়ার পরই ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট এ বৈঠকের ডাক দেন। বৈঠকে ইরানের পারমাণবিক চুক্তির অবসান ও উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা কমাতে নতুন পদক্ষেপের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা যে কোনো সময় যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছে ফ্রান্স। অন্যদিকে পারমাণবিক ইস্যুতে চুক্তি অনুসারে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ইইউ নেতাদের প্রতি ইরান আহ্বান জানিয়েছে। তা না হলে তেহরান চুক্তির চার বছর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে বলে গতকাল সোমবার হুমকি দিয়েছে। খবর বিবিসি, এএফপি ও সিএনএনের।

ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরি থেকে বিরত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উদ্যোগে ২০১৫ সালের জুনে ভিয়েনায় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দেয় তেহরান। এর বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপ করা অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। তবে ওবামা আমলে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিকে 'ক্ষয়িষ্ণু ও পচনশীল' আখ্যা দিয়ে গত বছরের মে মাসে তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এর পর থেকে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ওই বছরের নভেম্বর থেকে তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল শুরু করে ওয়াশিংটন।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রতি বিদ্বেষ থেকেই ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি থেকে ওয়াশিংটনকে প্রত্যাহার করে নেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ দূত কিম ড্যারোচ লন্ডনে পাঠানো ই-মেইলে এ কথা জানান। রোববার দ্য মেইল নতুন ওই নথি প্রকাশ করেছে। এরপর শুরু হয় নতুন আলোচনা।

এদিকে, ইউরোপীয় দেশগুলো চুক্তি বাস্তবায়নের কথা মুখে বললেও কার্যত তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করে আসছে ইরান। ইউরোপীয় দেশগুলোর ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়ে এ বছরের মে মাসে চুক্তি থেকে আংশিক সরে আসার ঘোষণা দেয় তেহরান। ইইউকে সমঝোতা বাস্তবায়নের জন্য দুই মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। ৭ জুলাই সেই সময়সীমা শেষে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৫ শতাংশে উত্তীর্ণ করার ঘোষণা দেয় ইরান। ২০১৫ সালের চুক্তিতে এই মাত্রা ৩.৬৭ শতাংশে সীমিত রাখার প্রতিশ্রুতি ছিল তেহরানের।

সোমবার ব্রাসেলসে তিন ইউরোপীয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইরানকে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় উৎসাহিত করার বিষয়টি প্রাধান্য দেওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠক সামনে রেখে তিন দেশের এক যৌথ বিবৃতিতে ওই চুক্তির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে গভীর সমস্যায় পড়েছেন তারা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এতে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, আমরা বিশ্বাস করি দায়িত্বশীল আচরণ করার এখন সময় এসেছে। উত্তেজনা কমাতে একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে।

এর মধ্যে ৪ জুলাই জিব্রালটার উপকূলে ইরানের তেল ট্যাঙ্কার জব্দ করে যুক্তরাজ্য। ইইউর নিষেধাজ্ঞায় থাকা সিরিয়ার একটি শোধনাগারের জন্য তেল নিয়ে যাচ্ছে সন্দেহে ব্রিটিশ নৌবাহিনী গ্রেস ১ নামের ওই ট্যাঙ্কার জব্দ করে। এতে এ বিষয়ে উত্তেজনা আরও বেড়ে গেছে। গত শনিবার হান্ট বলেন, ট্যাঙ্কারটি সিরিয়ায় যাবে না এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে ইরানকে, তাহলে এটি ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ তাকে জানিয়ে দেন- নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী তেল বিক্রির অধিকার তেহরানের রয়েছে।

তেহরানের সঙ্গে এই উত্তেজনা সত্ত্বেও ব্রাসেলসের বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন জেরেমি হান্ট। ওই বৈঠক সামনে রেখে তিনি জানিয়েছেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের পাশাপাশি পারমাণবিক চুক্তি রক্ষায় যা কিছু করা সম্ভব তার সবকিছুই করা হবে। একই সঙ্গে ইরানকে চুক্তি মেনে চলতে উৎসাহ দিতে কাজ করা হবে।

এদিকে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ ইভ লু দ্রিঁয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের ঝুঁকি দেখছেন বলে জানান। ইরানের সঙ্গে হওয়া ছয় জাতি চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বের হয়ে যাওয়া এবং ওয়াশিংটনের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সিদ্ধান্ত উভয়কেই বাজে আখ্যা দিয়ে এ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। বাস্তিল দিবস উপলক্ষে প্যারিসে সামরিক প্যারেডে উপস্থিত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা জানান।