রাজনীতির জ্বলন্ত চুলোয় বিশ্ব যেন এক তপ্ত খোলা। যখন তখন যেখানে সেখানে মিসাইল ফুটছে মুড়িমুড়কির মতো। আজ রাশিয়া ফোটাচ্ছে তো কাল উত্তর কোরিয়া, পরদিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পরের দিন ইরান। আমরা যেন এখন মিসাইল যুগে বাস করছি। মিসাইল ফোটার শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমাচ্ছি আবার মিসাইলের শব্দেই ঘুম ভাঙছে। সংবাদমাধ্যমগুলো গলদঘর্ম কোন দেশ কয়টা মিসাইল ফোটাল সে হিসাব রাখতে। চলতি সপ্তাহের রোববার, শুক্রবার ও শনিবার, এই তিন দিনে পরপর মিসাইল পরীক্ষা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়া।

গত শতকের শেষ দিকে শীতল যুদ্ধে দুই প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে একটি চুক্তি করেছিল। আইএনএফ নামের এই চুক্তিতে দুটো দেশের সব ধরনের পরমাণু অস্ত্রসহ স্বল্প ও মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। ফলে শীতল যুদ্ধের অবসান হয়েছে ভেবে সারাবিশ্ব সাময়িক স্বস্তি পেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে এটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৮৭ সালে। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের এই চুক্তিতে সব ধরনের পরমাণু অস্ত্র এবং স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। চুক্তিতে সই করেছিলেন সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ ও যুক্তরাষ্ট্র্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান। ১৯৯১ সালের মধ্যে প্রায় দুই হাজার ৭০০ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়। দুটো দেশকেই একে অপরের স্থাপনা পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।

কিন্তু চলতি শতকের শুরু থেকেই আবার যেন মিসাইল তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ২০০৭ সালে ঘোষণা করেন, আইএনএফ চুক্তি রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষা করছে না। এর আগে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবিরোধী এক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।

উত্তর কোরিয়া আগে থেকে মিসাইল পরীক্ষা করে আসছিল। গতকাল শনিবারও নিজেদের উপকূল থেকে সাগরে দুটি স্বল্পপাল্লার মিসাইল ছুড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ আলোচনার মধ্যেও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কাজ বন্ধ করেনি তারা। মিসাইল তৈরি এবং পরীক্ষা পিছিয়ে নেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানও। ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর থেকে তারাও শামিল হয়েছে মিসাইল পরীক্ষায়। শুক্রবার তারা নতুন আরেকটি মিসাইল পরীক্ষা চালিয়েছে। ইরানে বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার মেজর জেনারেল হোসেইন সালামি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নিজেদের নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আমরা কারও থেকে পিছিয়ে নেই। আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

সবচেয়ে উদ্বেগের ব্যাপার হলো, যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া আইএনএফ চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে ফের মিসাইল পরীক্ষা চালাতে শুরু করেছে। পেন্টাগন জানিয়েছে, রোববার ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে সফলভাবে মিসাইলটি উৎক্ষেপণ করা হয়। এই খবর শোনার পর রাশিয়া এবং চীন ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করেছে। তারা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন মনোভাব সামরিক সংঘাত আরও বাড়াবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করার পর পরই রাশিয়া নিজেরাও মিসাইল পরীক্ষা শুরু করেছে।

মন্তব্য করুন