হংকংয়ে প্রত্যপর্ণ বিলের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন নতুন মোড় নিয়েছে। এবার তারা চীনের কাছ থেকে 'স্বাধীনতা' চায়। আর তাদের স্বাধীন করে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছে তারা। গতকাল রোববার হংকংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট অফিসের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করার সময় এ অনুরোধ জানায় তারা। এ সময় হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর হাতে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা দেখা যায়। তারা চীনবিরোধী স্লোগানও দেয়। চীনের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হংকংয়ে আগে থেকেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল। গণতন্ত্রপন্থিরা সেই দাবিকেই আবার জোরালো করল। তবে এ বিষয়ে চীন কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটিই বড় কথা। প্রত্যর্পণ বিলের বিরুদ্ধে সাড়ে তিন মাসের আন্দোলনের শুরু থেকে বেইজিং অভিযোগ করে আসছে, এ বিক্ষোভের নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উস্কানি রয়েছে। গতকাল হংকং স্বাধীন করে দিতে ট্রাম্পের প্রতি বিক্ষোভকারীদের আহ্বানের মধ্য দিয়ে চীনের সেই অভিযোগই প্রমাণিত হলো বলা যায়। খবর রয়টার্স, বিবিসি ও এএফপির।

তীব্র গরমে ছাতা হাতে বিক্ষোভকারীরা গতকাল পুলিশের পাশে দাঁড়িয়েই যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা ও গণতন্ত্রের দাবিতে লেখা প্ল্যাকার্ড দুলিয়ে তাদের চীনবিরোধী অবস্থান পরিস্কার করে। যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটে এ সংক্রান্ত একটি আবেদন জমা দেয় বিক্ষোভকারীরা। এর পরই কজওয়ে বে জেলায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ বাধে। বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দেয় ও শহরের কেন্দ্রে একটি মেট্রো স্টেশনে ভাংচুর করে। তবে এর আগে তারা 'স্বাধীনতার জন্য লড়ো, হংকংয়ের পাশে দাঁড়াও', 'বেইজিংকে প্রতিরোধ করো, হংকং স্বাধীন করো'- স্লোগানও দেয়। গত মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প হংকং সংকট 'মানবিক উপায়ে' সমাধানের জন্য চীনকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। অবশ্য এর আগে হংকংয়ের এ বিক্ষোভকে 'দাঙ্গা' অ্যাখ্যা দিয়ে  একে চীনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে চীনের সঙ্গে যুক্ত হয় হংকং। তবে শুরু থেকেই হংকংয়ে চীনবিরোধী একটি গণতান্ত্রিক শক্তি সক্রিয় ছিল। বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন হলেও কঠোর হাতে তা দমন করেছে বেইজিং। হংকংয়ে বেইজিংয়ের পছন্দের প্রার্থীরাই নির্বাচনে জেতেন এবং সরকার চালান। বর্তমান প্রধান নির্বাহী ক্যারি লাম চীন সরকারের অনুগত। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, হংকংয়ে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার আন্দোলন দমন করতে প্রত্যর্পণ আইন করতে উদ্যোগী হন লাম। তবে বিক্ষোভের মুখে বিল প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তাতেও শান্ত হয়নি হংকং। এবার স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনে নেমেছে গণতন্ত্রপন্থিরা। কিন্তু বিক্ষোভ সহিংস হয়ে উঠলে তা কঠোর হাতে দমন করার প্রতিশ্রুতি আগেই দিয়ে রেখেছে চীন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এস্পার বেইজিংকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

রোববার বিক্ষোভে অংশ নেওয়া হংকংয়ের ২৬ বছর বয়সী বাসিন্দা চেরি বলেন, 'চীন ও যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় এখনই সময় যুক্তরাষ্ট্রকে দেখানো যে, চীনপন্থি গোষ্ঠীগুলো কীভাবে হংকংয়ে মানবাধিকার লংঘন ও পুলিশি বর্বরতাকে অনুমোদন দিচ্ছে। আমরা চাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন যেন হংকংয়ে মানবাধিকার রক্ষায় সহায়তা করে। ২২ বছর আগে চীনের 'এক দেশ, দুই নীতির' অধীনে যুক্তরাজ্য হংকংকে বেইজিংয়ের কাছে হস্তান্তর করে। সেই থেকে শহরটি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে আসছে। পশ্চিমা বিশ্নেষকদের মতে, স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে তারা যে পরিমাণ স্বাধীনতা ভোগ করে, তা চীনের মূল ভূখণ্ডেও দেখা যায় না। তবে এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর হংকংয়ের অনেক বাসিন্দা মনে করেন, বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই হংকংয়ের এ স্বায়ত্তশাসন খর্ব করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় বেইজিং সমর্থিত প্রশাসন জুন মাসে বিতর্কিত প্রত্যর্পণ বিল পাস করাতে চেয়েছিল। বিলটিতে বিচারের জন্য অভিযুক্ত বাসিন্দাদের চীনের মূল ভূখণ্ডে পাঠানোর সুযোগ রেখে আইন সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। বিতর্তিক এ বিল প্রত্যাহারের দাবিতেই হংকংয়ে গড়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আন্দোলন।

মন্তব্য করুন