কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করবে সুপ্রিম কোর্টের কমিটি?

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২১

বৃন্দা কারাত

কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে একগুচ্ছ আবেদনের শুনানির মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট যে ১১ পৃষ্ঠার আদেশ জারি করেছেন (কৃষি আইন স্থগিত করে পুনর্মূল্যায়ন কমিটি গঠন), এর মধ্য দিয়ে এই পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে কৃষক ও তাদের সংগঠনগুলোর সন্দেহই শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে এলো। অধিকাংশ গণমাধ্যম এই আদেশ নিয়ে মন্তব্য করছে, যেমন- 'সরকারের ওপর বিরাট আঘাত' অথবা 'সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধাক্কা', এটি কি সত্যিই তাই? সর্বোচ্চ আদালতের প্রথম দিনের শুনানিতে এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আদালত সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বলেছিলেন :'আপনারা যেভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন, তাতে আমরা সত্যিই হতাশ। যথেষ্ট পর্যালোচনা না করে আপনারা আইন করেছেন, যার ফলে বিশাল অবরোধ দেখতে হচ্ছে। অনেক রাজ্য আপনাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখিয়েছে। অথচ আপনারা বলছেন, ভুল বোঝাবুঝি কাটাতে আলোচনা চলছে। কী সেই আলোচনা? কী হচ্ছে এসব?'

আদালতের এই জোরালো মন্তব্য কৃষকদের বক্তব্যেকে বৈধতা দেয়। কারণ, কৃষকরাও দাবি করে আসছেন, তাদের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা না করে নতুন কৃষি আইন করা হয়েছে। কিন্তু একদিন পর (গত মঙ্গলবার) সুপ্রিম কোর্ট যে আদেশ দিয়েছেন, তাতে প্রকৃতপক্ষেই কি প্রথম দিনের ওই মন্তব্য প্রতিফলিত হয়েছে? সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে কৃষক আন্দোলন এবং তা বাতিল না করতে সরকারের অনড় অবস্থান ও লোক দেখানো কিছু পরিবর্তনের পাটাতনে ফেলে বিবেচনা করতে হবে। কৃষকদের সঙ্গে সরকারের সমঝোতার চেষ্টা আটবার ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়া এ নিয়ে জনরোষ বৃদ্ধি, এমনকি সরকারের শরিকদের মধ্য থেকে যখন প্রশ্ন উঠেছে, তখন কৃষকদের দাবির পক্ষে সমর্থন জোরালো হয়েছে। এ অবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের আদেশের মোদ্দা কথা কী? আদেশের মধ্যে যে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রধান হয়ে উঠেছে, সেটি হলো পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত নতুন তিনটি কৃষি আইন স্থগিত থাকবে। অন্যায্য আইন যখন সুপ্রিম কোর্ট স্থগিত করে, তখন বিষয়টি নিঃসন্দেহে ভালো। তবে এটি অধিকতর বিশ্নেষণের দাবি রাখে, যখন এই স্থগিতাদেশে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় এবং এই শর্ত প্রতিপালন করতে আখেরে লাভ কার, সেটিও বিবেচ্য বিষয়।

এই স্থগিতাদেশ কৃষকদের আবেদনের শুনানি বা কৃষকদের আন্দোলনের ওপর অধিকর মনোযোগ দেওয়ার জন্য নয়। এই স্থগিতাদেশ 'বিশেষজ্ঞ কমিটি' গঠন এবং এই কমিটির সুপারিশ প্রাপ্তির সময়সীমার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত (কমিটির প্রথম বৈঠকের দুই মাসের মধ্যে সুপারিশ প্রেরণ নিশ্চিত করা)। আদেশের অষ্টম দফায় কমিটির গুরুত্ব প্রসঙ্গে বলা হয়েছে :'সরকার ও কৃষকদের মধ্যে সমঝোতা চেষ্টায় এখনও কোনো ফল আসেনি। সেখানে আদালতের তৈরি করে দেওয়া বিশেষজ্ঞ কমিটি সমঝোতার ক্ষেত্রে একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করবে। আমরা মনে করি, স্থগিতাদেশের মধ্য দিয়ে কৃষকদের আহত অনুভূতি কেটে যাবে এবং বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে তারা সমঝোতার জন্য বসবেন।'

সুপ্রিম কোর্ট এই উদ্যোগ নিলেও কোনো কৃষক বা তাদের সংগঠন কৃষি আইনে স্থগিতাদেশ চায়নি। আন্দোলনরত লাখ লাখ কৃষক এ ধরনের কমিটি গঠনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন। তারা মনে করছেন, কালক্ষেপণ ও আন্দোলনের মোড় ঘোরাতে এটি করা হচ্ছে। সরকারও এ ধরনের কমিটির জন্য কোর্টে যায়নি। তবে সুপ্রিম কোর্ট এটি করার পরপরই তারা তা সাদরে গ্রহণ করেছে।

সরকার যে চারজনকে বিশেষজ্ঞ মনে করে কৃষি আইন পর্যালোচনার জন্য কমিটিতে রেখেছেন, তারা সবাই এই আইনের পক্ষেই উচ্চকণ্ঠ। তারা কৃষকদের দাবির বিরুদ্ধে এবং আইনের জন্য সরকারের পক্ষে সোচ্চার। তারা কৃষকদের দাবির পক্ষে কতটাই-বা করবেন? আদেশের ১৫তম দফায় উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও আমরা কৃষকদের এই অহিংস আন্দোলন বন্ধ করে দিতে পারি না, তবে আমরা মনে করি এই অসাধারণ স্থগিতাদেশ কৃষকদের ঘরে ফিরে যেতে উৎসাহিত করবে। আদালত হয়তো মনে করছে, স্থগিতাদেশের এই অন্তর্বর্তী সময়টা আন্দোলন গুটিয়ে কৃষকদের ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট সময়। সংক্ষেপিত।

লেখক : কলামিস্ট ও রাজনীতিক