ডোনাল্ড ট্রাম্প গোটা বিশ্বের জন্য এক বিস্ময়কর মানব। সবচেয়ে সমালোচিত, আলোচিত ও চর্চিত এক রাষ্ট্রনায়ক। ছোটবেলা থেকে তিনি ব্যতিক্রমী, দুষ্টু, বদমেজাজি ও বিদ্বেষী মনোভাবের। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও অন্যায্যতার মাধ্যমে তার আবির্ভাব। দেশটির সমাজে বিভেদ, বিভক্তি ও ঘৃণার বিষবাষ্প অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ছড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতায় আসেন ট্রাম্প। একে একে ভেঙেছেন দেশের আইন, লঙ্ঘন করেছেন সংবিধান, ঘটিয়েছেন অসংখ্য অঘটন। অভিবাসীবিদ্বেষী চেতনার ঘৃণ্য বীজ বপন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জমিনে। জীবনের নানা বাঁকে অগণিত নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছেন তিনি। স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর খড়গহস্ত চালিয়েছেন যখন তখন। কঠিন সংকটে বারবার মিথ্যা বলেছেন, মহামারিতে দিয়েছেন মনগড়া তত্ত্ব। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক সংকটকে তার অভিধানে একেবারে 'নাই' করে দিয়েছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক রীতি, নীতি ও শিষ্টাচারকে পদদলিত করেছেন বারবার। প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে নিজেই হয়েছেন উলঙ্গ। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদকে উস্কে দিয়ে, রাষ্ট্রে ধর্মের ভেদাভেদ সৃষ্টি করে প্রতিষ্ঠা করেছেন ট্রাম্পবাদ। ছড়িয়েছেন হিংসার আগুন। আর তার ওই হিংসার আগুনে পুড়েছে পার্লামেন্ট। পুড়েছে বহু মানুষের মন। তার এই বিদ্বেষী আগুন, ট্রাম্পবাদ বহুকাল পোড়াবে যুক্তরাষ্ট্রকে, বিশ্বকে। আর ইতিহাস তাকে ট্রাম্পবাদের 'খলনায়ক' হিসেবেই মনে রাখবে। এমন দানবের বিদায় আবেগঘন মুহূর্তের মধ্য দিয়ে কখনও হয় না, তার বিদায় হয় রক্ত মাড়িয়ে উত্তাল, সহিংস পথে।

নিউইয়র্কের বিত্তশালী রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ফ্রেড ট্রাম্পের পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে ট্রাম্প চতুর্থ। ট্রাম্প অর্ধেক স্কটিশ। তার মা মেরি ম্যাকলয়েডের জন্ম স্কটল্যান্ডে। ১৯৩০ সালে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে মেরি ম্যাকলয়েড চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে প্রথমে পরিচয় ও পরে পরিণয় হয় ফ্রেডের সঙ্গে। এই দম্পতির ঘরে ১৯৪৬ সালে নিউইয়র্কে জন্ম হয় ট্রাম্পের। ট্রাম্প একেবারে ছোটবেলা থেকেই অনেক দুষ্টু ছিলেন।

প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক ট্রাম্প। তার হিসাবে তার অর্থের পরিমাণ এক হাজার কোটি ডলার। তবে এর মধ্যে নিজেকে তিনি কয়েকবার অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া ঘোষণা করেছেন। বারবার মিথ্যা বলে কর ফাঁকি দিয়েছেন তিনি।

২০১৬ সালে অভিবাসনবিরোধী কূটতত্ত্ব ছড়িয়ে উগ্র শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে জনপ্রিয়তা চান ট্রাম্প। আর বর্ণবাদী বিভেদ উসকে দিয়ে ক্ষমতায় বসেন তিনি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার এক মাসের মধ্যেই কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিনকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হন। নির্বাচনের সময়ে ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার প্রাক্কালে ফ্লিন রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করেন- এমন সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর আলোচনার ঝড় ওঠে। এরপর অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে আফ্রিকার কিছু দেশ সম্পর্কে 'খুব বাজে ও বর্ণবাদী' মন্তব্য করে ফেঁসে যান তিনি। হাইতি, এল-সালভাদর এবং আফ্রিকার দেশগুলোকে ট্রাম্প 'নোংরা দেশ' বলে মন্তব্য করেন। 'তিনি জানতে চান, কেন তাদের এখানে আনা হবে?' এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ ওঠে।

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ট্রাম্পের ফাঁস হওয়া দুটি পৃথক ফোনালাপ তার কেলেঙ্কারিগুলোর অন্যতম। ওই ফোনালাপ ফাঁসের পর তখন ট্রাম্প বলেন, 'এ কথাটা তুমি কখনও গণমাধ্যমে বলতে যেও না। ওরা এটা নিয়ে পড়ে থাকবে এবং আমাকে বাঁচতে দেবে না!' পরে ট্রাম্পের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে রাশিয়ার কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয় অনুসন্ধানে গুরুত্বারোপ করার জন্য এফবিআইর প্রধান জেমস কোমিকে চাকরি হারাতে হয়েছে। সে সময়ে ওই অনুসন্ধান বন্ধ করার জন্য তাকে হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ওই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে ধাক্কা দেওয়াসহ বহু কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত কাজ করেছেন তিনি। ট্রাম্প তো একবার ফরাসি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জোর করে করমর্দন করেন। তার বিরুদ্ধে অন্তত ২৬ নারী যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন। তার মতো দানবের বিদায়ের জন্য প্রহর গুনছে ডেমোক্র্যাট শিবিরসহ গোটা বিশ্ব। আগামী ২০ জানুয়ারি বিদায় নেবেন তিনি। তারপর হাঁপ ছেড়ে বাঁচার পালা। তিনি বিদায় নিলেও ঘরে-বাইরে যে পরিস্থিতি রেখে যাচ্ছেন, তা সামাল দেওয়া নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জন্য কঠিনই হবে। করোনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা খুব ভয়াবহ। দেশটিতে আড়াই কোটির মতো মানুষ করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন, মারা গেছেন চার লাখের বেশি। শুরু থেকেই করোনার ভয়াবহতাকে অবজ্ঞা-অবহেলা করে আসছেন ট্রাম্প। ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগ থেকে শুরু করে তিন-চার মাস ধরে রাষ্ট্রীয় কাজে মন নেই ট্রাম্পের। শেষের দুই মাস তো তিনি ভোট জালিয়াতির ভুয়া অভিযোগ, মামলাবাজি করেই কাটালেন। বিশ্বে করোনার সংক্রমণ মৃত্যুতে সবার শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রে এই মহামারির অবসান ঘটানোর মতো এক গুরুভার এখন বাইডেনের কাঁধে চাপছে। পাশাপাশি অর্থনীতিসহ করোনার অন্যান্য ক্ষতি কাটানোর দায়িত্বও তাকে নিতে হবে। এ কাজ করাটাই হবে তার প্রশাসনের প্রথম ও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজনীতিকেও কলুষিত করেছেন ট্রাম্প। তিনি দেশটির বহু বছরের রাজনৈতিক ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিকে ভূলুণ্ঠিত করে অসংখ্য বাজে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর রাজনীতিতে ক্ষমতার অপব্যবহার, মাফিয়াতন্ত্র, দুর্বৃত্তায়ন, হানাহানি নিয়ে যে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় উচ্চকিত থাকে, সেই তারাই আজ ট্রাম্পের কারণে এসবের সাক্ষী। নির্বাচনে পরাজয় না মেনে, ফলাফল উল্টে দিতে ট্রাম্প তার উগ্র সমর্থকদের দিয়ে ৬ জানুয়ারি দেশটির কংগ্রেস ভবনে হামলা চালিয়ে ন্যক্কারজনক নজির স্থাপন করেছেন। ট্রাম্প চলে গেলেই যে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ফিরে আসবে, তেমনটা মনে করার কারণ নেই।

ট্রাম্প বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে অবজ্ঞা করেছেন। ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। টিপিপি থেকেও ওয়াশিংটনকে প্রত্যাহার করেছেন তিনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতি টেনেছেন অনেক আগেই। ইউনেস্কো থেকে দেশটিকে প্রত্যাহার করেছেন তিনি।

সর্বশেষ তার হিংসায় তছনছ হয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট ভবন ক্যাপিটল হিল। এতে উস্কানি দেওয়ার দায়ে তাকে কংগ্রেস দ্বিতীয় দফা অভিশংসন করেছে। দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো প্রেসিডেন্টকে দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসন করা হলো। ১৩ জানুয়ারি প্রতিনিধি পরিষদে ২৩২-১৯৭ ভোটে অভিশংসন প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এতে তার নিজের দলের ১০ আইনপ্রণেতা এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপে অভিশংসনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এর আগে ২০১৯ সালে ইউক্রেন কেলেঙ্কারির কারণে কংগ্রেসে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রথম দফা অভিশংসন করা হয়েছিল।

৬ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানে ওয়াশিংটন ডিসিতে জড়ো হওয়া সমর্থকদের তাণ্ডবে ক্যাপিটল ভবন রক্তে রঞ্জিত হয়। নিহত হন পাঁচজন। কংগ্রেসের অধিবেশনে যখন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনকে প্রত্যয়িত করা হচ্ছিল, তখনই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। লোকজন দরজা-জানালা ভেঙে ক্যাপিটল হিলে ঢোকে এবং অফিস তছনছ করে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ট্রাম্পের আহ্বানে সারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সমর্থকদের সমাবেশ ঘটেছিল ওয়াশিংটন ডিসিতে। ক্ষমতার শেষ সপ্তাহে এসে আবার অভিশংসনের মুখোমুখি হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কংগ্রেসের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়া অভিশংসন প্রস্তাবটি এখন সিনেটে যাওয়ার কথা। সিনেটে রিপাবলিকান পার্টির নেতা মিচ ম্যাককনেল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি ট্রাম্পের ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সিনেটে আলোচনায় আসবে না।

মিচ ম্যাককনেল বলেছেন, দেশের জন্য এখন নতুন প্রশাসনের ক্ষমতা গ্রহণ সাবলীল হওয়াটাই জরুরি। দেশের স্বার্থে প্রতিনিধি পরিষদে গৃহীত অভিশংসন প্রস্তাবটি নিয়ে সিনেটে আলোচনায় উঠবে ট্রাম্প ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পরই। গত বুধবার কংগ্রেসে দিনভর টানা বিতর্কে আইনপ্রণেতারা একের পর এক ট্রাম্পের লজ্জাহীন আচরণ নিয়ে কথা বলেন। ট্রাম্প সংবিধানের নামে নেওয়া শপথ ভঙ্গ করেছেন উল্লেখ করে তারা বলেছেন, ট্রাম্পের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র পদদলিত হয়েছে। খারাপ নজির সৃষ্টি হয়েছে।

পার্লামেন্টে হামলায় উস্কানি দেওয়ার দায়ে দেশটির প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত ট্রাম্প শেষ বেলায় এসে অপরাধীর মতো বিদায় নিচ্ছেন। ট্রাম্প আরেক দফায় ক্ষমতায় থাকছেন না, তার বিদায়ের ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে- এটাই এখন অনেকের কাছে স্বস্তির বিষয়। সূত্র :সিএনএন ও নিউইয়র্ক টাইমস।

মন্তব্য করুন