ঘরে-বাইরে বদলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২১

সমকাল ডেস্ক

ঘরে-বাইরে বদলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল হিলে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস শপথ গ্রহণের পর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন -এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সব বিতর্কিত নীতিতে পরিবর্তন আনতে ক্ষমতার প্রথম দিনই ১৭টি নির্বাহী আদেশে সই করতে যাচ্ছেন নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। করোনায় বিপর্যয়কর পরিস্থিতি, মহামারির ধাক্কায় নাজুক অর্থনীতি, ভেঙে পড়া পররাষ্ট্রনীতি, ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে ট্রাম্পের অসহযোগিতা আর সহিংসতার আশঙ্কায় শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার সকাল ১১টা ৪৮ মিনিটে ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ডেমোক্র্যাট জো বাইডেন। এর আগে বুধবার তার নতুন প্রশাসনকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে করা চুক্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে ফেরার পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন তিনি। এই অভিষেক দিবসেই জলবায়ু সংকট, অভিবাসন নীতি, করোনা মহামারি মোকাবিলা ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার-সংক্রান্ত ১৭টি নির্বাহী আদেশে নতুন প্রেসিডেন্টের সই করার কথা রয়েছে। খবর সিএনএন, রয়টার্স ও এএফপির।

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার আগের আমলের নীতিতে ফিরে গেছেন। আগে জানিয়েছিলেন, তিনি শপথ নেওয়ার পর ওই চুক্তিতে ফিরে যাবে তার প্রশাসন। গতকাল বুধবার এ-সংক্রান্ত আদেশে সই করার কথা রয়েছে তার। এর আগে তিনি কর্মকর্তাদের আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ওই চুক্তিতে ফেরার পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

বাইডেন প্রশাসনের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা জিনা ম্যাকার্থি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্যারিস চুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে আগের প্রশাসন। বর্তমান প্রশাসনের নীতি হচ্ছে, দ্রুত এই চুক্তিতে ফেরা।

তিনি আরও বলেন, 'জলবায়ু-সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র আগের অবস্থানে ফিরতে শুরু করবে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের স্থানে ফেরা খুবই জরুরি। আর এটা আমাদের জাতিকে বৈশ্বিক নেতৃত্বের অবস্থানে ফিরতে সহায়তা করবে।'

আগের প্রশাসন করোনা মহামারি মোকাবিলায় গুরুত্ব না দেওয়ায় দেশটিতে এই সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আগের প্রশাসন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকেও নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। এসব চুক্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে ফেরার জন্য নতুন প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন।

করোনায় দেশটিতে এরই মধ্যে দুই কোটি ৪৮ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন চার লাখ ১১ হাজারের বেশি। এক সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, করোনা মোকাবিলায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বাইডেন প্রশাসন। অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ডা. অ্যান্থনি ফুসির নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল প্রস্তুত-সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশেও এদিন সই করার সূচি রয়েছে প্রেসিডেন্টের।

বাইডেনের মহামারি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য জেফ জিয়েন্টস বলেছেন, করোনা মোকাবিলায় ১০০ দিনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বুধবার তিনি বলেন, একটা নতুন দিন শুরু হবে, আর করোনা সংকট মোকাবিলায় ভিন্ন মাত্রায় পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে। কর্মকর্তারা বলেছেন, অবৈধ অভিবাসী রোধে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ওই দেয়াল নির্মাণ বন্ধ এবং গণহারে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো থেকে দর্শনার্থী আসার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন তিনি, আগামী পাঁচ কর্মদিবসে তা বাতিল করা হবে।

বাইডেন অভিবাসন নীতি নিয়ে আট বছর মেয়াদি পরিকল্পনা এরই মধ্যে ঘোষণা করেছেন। অভিবাসীদের তথ্য পর্যালোচনা করে কয়েক লাখ মানুষকে নাগরিকত্ব দিতে শিগগিরই বিল কংগ্রেসে পাঠাবেন বাইডেন। তার প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, 'ট্রাম্প প্রশাসনের অভাবনীয় ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ভূমিকা ও নাগরিকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুয়ায়ী নবনির্বাচিত বাইডেনের প্রশাসন কাজ শুরু করেছে।'

কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০১৭ সালের ১৯ জানুয়ারির পর প্রশাসনের অনেক নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেগুলো যত দ্রুত সম্ভব সংশোধন করা হবে।

অন্যদিকে, গত মঙ্গলবার বাইডেন মনোনীত পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিনকেন নতুন প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে পরিস্কার ধারণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরান ও চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করা হবে। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো মিত্রদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক স্থাপনে জোর তৎপরতা চালাবে ওয়াশিংটন। তেহরান ও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করবে তারা।

বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানের আগ মুহূর্তে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্ব নেতৃত্বে ফেরার আশা পুনর্ব্যক্ত করে ব্লিনকেন বলেন, ওয়াশিংটন আবার বিশ্বে নেতৃত্ব দেবে; তবে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে। তিনি বলেন, 'বিশ্বকে আরও সমৃদ্ধ করতে অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় সক্ষমতার দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রই সেরা।' পাশাপাশি তিনি এও বলেন, বৈশ্বিক সংকট কোনো একক দেশ হিসেবে মোকাবিলা করতে পারে না, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী দেশও না। এ জন্য সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে কাজ করবে বাইডেন প্রশাসন।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে তাদের বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যায্যতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে ওয়াশিংটন। নতুন প্রশাসন মনোনীত অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন বলেছেন, বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক ও খামারিদের প্রণোদনা বাড়ানো হবে।

এ ছাড়া তালেবানের সঙ্গে চলমান চুক্তি কার্যক্রমের বিষয়ে পর্যালোচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সমন্বিতভাবে কাজ করারও ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির মনোনীত প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিইদ অস্টিন। অন্যদিকে, গতকাল বুধবার নতুন প্রশাসনের গোয়েন্দাপ্রধান সৌদি আরবের সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন।

এদিকে, বাইডেন প্রশাসনের ক্ষমতা গ্রহণের পর এশিয়ার বাজার চাঙ্গা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন বলেছেন, অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বিভিন্ন প্রস্তাব দেবেন প্রেসিডেন্ট।