নিষেধাজ্ঞায় ঘরে-বাইরে চাপে সেনা সরকার

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১

সমকাল ডেস্ক

নিষেধাজ্ঞায় ঘরে-বাইরে চাপে সেনা সরকার

মিয়ানমারে সেনাদের গুলিতে নিহত এক বিক্ষোভকারীর মরদেহ নিয়ে শেষকৃত্যের যাত্রা রূপ নেয় প্রতিবাদ মিছিলে। মঙ্গলবার মান্দালয়ের ছবি এএফপি

মিয়ানমারে সেনাবিরোধী বিক্ষোভ-আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকে এই প্রতিবাদ চলছে। ক্রমে জোরালো হচ্ছে আন্দোলন। গণতান্ত্রিক এ আন্দোলনে সামরিক বাহিনী দমন-পীড়ন চালানোয় নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে জান্তা সরকার। সবশেষ দেশটির সেনাবাহিনীর আরও দুই নেতার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জি-সেভেন। বহির্বিশ্বের নিষেধাজ্ঞা এবং দেশের মধ্যে দিন দিন বড় হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছে সামরিক সরকার। খরব এএফপি ও রয়টার্সের।

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গত সোমবার রাতে মিয়ানমারের বিমানবাহিনীর প্রধান মং মং কিয়াও ও জান্তা সরকারের লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোয়ে মিন্ট টানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তাদের সম্পদ জব্দ ও দেশটিতে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

মিয়ানমারে বিক্ষোভকারী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর হামলা বন্ধ করতে সামরিক সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিনকেন। তিনি বলেন, 'যারা সহিংসতা ঘটাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিতে আমরা দ্বিধা করব না।' এদিন সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংসহ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে এর আগেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।

গতকাল মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন শহর-নগরে ছোট ছোট বিক্ষোভ হয়েছে। ইয়াঙ্গুনেও এদিন প্রতিবাদী কর্মসূচি পালিত হয়।

এদিকে, গতকাল মিয়ানমারে বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে উন্নত দেশগুলোর জোট জি-সেভেন। দেশটির সেনাবাহিনী ক্রমাগতভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে জোটভুক্ত কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র।

জি-সেভেনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর সরাসরি আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার অগ্রহণযোগ্য। শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সহিংসতাকারীদের প্রত্যেককে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।' বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, 'আমরা সেনা অভ্যুত্থানের বিরোধিতাকারীদের ওপর হামলা ও তাদের ভীতি প্রদর্শনের নিন্দা জানাচ্ছি। বাক-স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং ইন্টারনেট বন্ধের মাধ্যমে মৌলিক অধিকার হরণ করায় উদ্বেগ জানাচ্ছি।'

এর এক দিন আগে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইইউর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে জোটভুক্ত দেশগুলো। আগামী মাসে দেশটির ওপর বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে ইইউ। এর কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়।

মিয়ানমারের অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স বলছে, সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে ৬৮০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। দেশটিতে প্রতি রাতেই ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হচ্ছে।

এদিকে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এমআরটিভিতে আন্দোলনকারীকে হত্যার হুমকি প্রচারের পর তাদের মূল ফেসবুক পেজ বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

মিয়ানমারের ওপর বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞার পর অর্থনৈতিক সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন সেনাপ্রধান। সোমবার রাতে মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে সেনাপ্রধান মিন অং হদ্মাইং রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও আমদানি কমানো এবং রপ্তানি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, 'দেশের রুগ্‌ণ অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে কাউন্সিলের অবশ্য শক্তি ও অর্থ প্রয়োজন। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রতিকারমূলক জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।'

দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার পর কার্যত অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে সরকার। এ জন্য রাষ্ট্রীয় খরচ কমানোর চেষ্টা চালাচ্ছে সামরিক সরকার।

মিয়ানমারে গত নভেম্বরে সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। ওই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে ১ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। আটক করা হয় এনএলডি নেতা অং সান সু চিসহ দলের শীর্ষ নেতাদের। সেই থেকে রাজপথে বিক্ষোভ চলছে। এ পর্যন্ত এই বিক্ষোভে তিনজনের প্রাণহানি হয়েছে।

এ ছাড়া বিক্ষোভকারীদের ওপর মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর দমন-পীড়নের নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন দেশ। আগেই জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও সেনা সরকারকে নিপীড়ন থামানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে আসিয়ান জোটকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেওয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছে ইন্দোনেশিয়া। এই লক্ষ্যে সমর্থন আদায়ে জোটভুক্ত বিভিন্ন দেশে সফর শুরু করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি। মিয়ানমার সংকট নিয়ে আসিয়ানের একটি বিশেষ বৈঠক আয়োজনের চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। ইন্দোনেশিয়ার প্রস্তাবে বেশ কয়েকটি সদস্য দেশের জোরালো সমর্থন থাকলেও কূটনৈতিক তৎপরতায়ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।