সেনা অভ্যুত্থানের পর টানা বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও অসহযোগ আন্দোলনে বিপর্যস্ত মিয়ানমার। আরব বসন্তের পর সিরিয়ায় যেমন করে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিও জান্তার সঙ্গে বহু পক্ষের বিরোধের ফলে কার্যত সে পথে হাঁটছে। ক্ষমতা দখলের পর গণতন্ত্রপন্থিদের নির্বিচারে হত্যার ফলে ক্ষোভে ফুঁসছে পুরো দেশ। বিক্ষোভকারীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানোয় পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞায় নাস্তানাবুদ দেশটির অর্থনীতির। পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে মোকাবিলার এই আন্দোলনে প্রকাশ্য সমর্থন দিয়ে গেরিলা আক্রমণ শুরু করেছে আঞ্চলিকভাবে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। ক্ষমতা দখলকারী সেনাবাহিনীর সঙ্গে বহুপক্ষীয় লড়াইয়ে কার্যত সিরিয়ার ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে মিয়ানমার।\হস্থানীয় সময় মঙ্গলবার জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে এমনই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, 'অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতার ফলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি প্রবল হচ্ছে। যেমন করে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হতে দেখা গিয়েছিল এবং তখনও গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়।'

জাতিসংঘের হাইকমিশনার মাইকেল ব্যাচলেট এক বিবৃতিতে বলেছেন, ১ ফেব্রুয়ারি সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে সাত শতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। ইতোমধ্যে সেখানে ২৩ জনকে সামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

মাইকেল ব্যাচলেট বলেন, 'আমি আশঙ্কা করছি, মিয়ানমার পূর্ণ মাত্রার সহিংসতার পথে হাঁটছে। তবে এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলো অবশ্যই অতীতে সিরিয়ার ক্ষেত্রে ঘটা মারাত্মক ভুলগুলোর অনুমতি দেবে না এবং তা পুনরায় হতেও দেবে না।'

২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করতে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বাহিনী মারাত্মক শক্তি প্রয়োগ শুরু করলে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সে সময়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দেয় আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। এ কারণে দশক ধরে চলা এ গৃহযুদ্ধে পুরো দেশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এতে এ পর্যন্ত প্রায় চার লাখ বেসামরিক লোক নিহত হন। দেশটির জনসংখ্যার অর্ধেকই বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। আর প্রায় ৬০ লাখ মানুষ শরণার্থী হিসেবে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এ ছাড়া এখনও ১০ লাখের মতো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এমন পরিণতি বরণ করতে যাচ্ছে মিয়ানমার। ঘরে-বাইরে সর্বাত্মক চাপে দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। এদিকে, সেনাবাহিনীও সহসা ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ। আর সেনা শাসনের অবসানের দাবিতে আন্দোলনকারীও প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, বিভিন্ন সেনা শিবির ও থানায় গেরিলা আক্রমণ শুরু করেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। সব মিলিয়ে গৃহযুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে দেশটি।

মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ইরাবতি বলছে, সোমবার উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এদিন কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মির (কেআইএ) সঙ্গে জান্তার বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। কেআইএর তথ্য কর্মকর্তা কর্নেল নাউ বু বলেন, এ সংঘর্ষে ৩৪৭ ব্যাটালিয়নের কমান্ডারসহ বহু সেনা নিহত হয়েছেন। এ সময় সেনাবাহিনীর আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এ ছাড়া মান্দালয়ের মোগোক এলাকায় সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে তা'য়াং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির হামলা চালানোর খবর পাওয়া গেছে। তবে ইরাবতির পক্ষে এসব হামলার খবর নিরপেক্ষ সূত্র থেকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মন্তব্য করুন