করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত ভারতের বৃহত্তম রাজ্য উত্তরপ্রদেশ। ২৪ কোটি জনসংখ্যার রাজ্যটিতে এখন দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই ব্যস্ত শ্মশান। করোনায় যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের মরদেহ দাহ করা হচ্ছে বিভিন্ন শ্মশানে। ক্রমেই চাপ বাড়ছে শ্মশানের কর্মীদের। সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে চললেও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগি আদিত্য নাথ বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছোটা রোগীর স্বজনদের বক্তব্যে উঠে আসছে ভিন্ন চিত্র।\হবিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন কানপুর শহরের বাসিন্দা কানওয়াল জিৎ সিং নামে এক ব্যক্তি। তিনি জানান, করোনায় আক্রান্ত তার বাবা নিরঞ্জন পাল সিংকে নিয়ে চারটি হাসপাতালে ঘুরেও ভর্তি করাতে পারেননি। অ্যাম্বুলেন্সেই তিনি মারা যান। এর চেয়ে কষ্টের কিছু আর নেই। কানওয়াল বিশ্বাস করেন, তার বাবা যদি চিকিৎসা পেতেন, হয়তো বেঁচে যেতেন। কিন্তু কেউ আমাদের সাহায্য করেনি; পুলিশ, হাসপাতাল, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বা রাজ্য সরকার কেউ না।

গত সোমবার পর্যন্ত উত্তর প্রদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৮ লাখ ৫১ হাজার ৬২০ জন এবং তাদের মধ্যে মারা গেছেন ৯ হাজার ৮৩০ জন। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো করোনার প্রথম ঢেউ সামলাতে রাজ্য সরকার তৎপর ছিল। তবে দ্বিতীয় ঢেউয়ে সব যেন ভেঙে পড়েছে। যোগি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে রাজ্যের রাজধানী লখনৌ, এলাহাবাদ, কানপুর ও বারাণসীর পরিস্থিতি খুবই নাজুক। এসব শহরের শ্মশান গত সপ্তাহ থেকে ২৪ ঘণ্টা ব্যস্ত রয়েছে। ক্রমেই বাড়ছে মরদেহের চাপ। যে কারণে এসব শহরের করোনা পরিস্থিতি প্রায়ই জাতীয় গণমাধ্যমে উঠে আসছে।

উত্তরপ্রদেশ যদি পৃথক দেশ হতো, তাহলে জনসংখ্যায় এটি হতো বিশ্বের পঞ্চম। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়ার পরই অবস্থান হতো উত্তরপ্রদেশের। অর্থাৎ পাকিস্তান ও ব্রাজিলের চেয়েও ভারতের এই রাজ্যে জনসংখ্যা বেশি। ভারতের প্রতি ছয়জনের একজন নাগরিক এখানকার বাসিন্দা। রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বের শীর্ষে থাকে রাজ্যটি। এখান থেকে ভারতের লোকসভার সবচেয়ে বেশি ৮০ সদস্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন। অন্য রাজ্যের বাসিন্দা হয়েও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখানকার একটি আসনের এমপি। রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে আছে রাজ্যটি। উত্তরপ্রদেশে বর্তমানে সক্রিয় রোগীর সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৯২ হাজার। প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে হাজারো মানুষ। কানপুরের স্থানীয় এক সাংবাদিকের ভিডিওচিত্রের বরাত দিয়ে সরকারি লালা রাজপাত রাই হাসপাতালের অবস্থা তুলে ধরেছে বিবিসি। তাতে দেখা যায়, হাসপাতালের পার্কিংয়ে একজন অসুস্থ মানুষ শুয়ে আছেন। তার পাশে বসে আছেন আরেকজন। দু'জনই করোনায় আক্রান্ত। তাদের রাখার মতো শয্যা হাসপাতালে নেই।

বিবিসি জানায়, সরকারি কাসিরাম হাসপাতালের সামনে কাঁদতে দেখা যায় এক নারীকে। কেন কাঁদছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার মাকে ভর্তি করে নেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, বেড খালি নেই। আরও কয়েকজনকে আমি হাসপাতাল থেকে ফিরে যেতে দেখেছি। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি আরও বলেন, 'মুখ্যমন্ত্রী বলছেন পর্যাপ্ত বেড আছে। দেখান তাহলে সেগুলো কোথায়? দয়া করে আমার মাকে সেবা দিন।' লখনৌ এবং বারাণসীর অবস্থাও একই। বারণসীর বাসিন্দা বিমল কাপুর। তার ৭০ বছর বয়সী মা গত বৃহস্পতিবার করোনায় মারা যান। তার ভাষায়- বারাণসীর অবস্থা ভয়াবহ। উল্লেখ্য, বারাণসীর প্রধানমন্ত্রী মোদির নির্বাচনী আসন। এখানে জিতে তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বিমল কাপুর বলেন, 'যখন আমরা মাকে শ্মশানে নিয়ে যাই, দেখি সেখানে মরদেহের স্তূপ। দাহ করার কাঠের দাম তিন গুণ বেড়ে গেছে। একেকটি মরদেহ দাহ করতে ছয়-সাত ঘণ্টা পর্যন্তও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আগে এমন পরিস্থিতি দেখিনি। যেদিকে তাকাই, দেখি মরদেহ আর অ্যাম্বুলেন্স।'

মন্তব্য করুন