ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জেতার জন্য কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিজেপির সর্বস্তরের নেতারা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মহামারির সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে দফায় দফায় বিশাল জনসভা ও নির্বাচনী গণজমায়েত করেছেন তারা। দেশটিতে যখন দৈনিক দুই লাখের বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছিল তখনও লাখো মানুষের সমাবেশ করেছেন মোদি। আট দফার ভোট উপলক্ষে ১২ বার পশ্চিমবঙ্গ সফর করেন তিনি। মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডাসহ শীর্ষ নেতারা শতাধিক জনসভা করেছেন। বিজ্ঞানীদের মহামারি বার্তা ও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করা এসব কর্মসূচিতে করোনা ছড়িয়েছে সর্বত্র। এখন প্রতিদিন সেখানে শনাক্ত হচ্ছে হাজার হাজার করোনা রোগী। এমন পরিস্থিতিতে রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূলের কাছে ভরাডুবি হয়েছে বিজেপির। তবে বাস্তবে জিতেছে করোনা মহামারি।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ভারতকে এই মহামারিতে বিশ্বের সবচেয়ে বিপর্যস্ত দেশে পরিণত করেছে। এক দিনে চার লাখের বেশি রোগী শনাক্তের নতুন বিশ্বরেকর্ডও দেখতে হয়েছে ভারতকে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় টিকা উৎপাদনকারী দেশ হয়েও করোনার টিকার ঘাটতি দেখা দিয়েছে এর বিভিন্ন রাজ্যে। হাসপাতালে জায়গা নেই, জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেনের মজুদও শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন শ্মশানে দাহ হচ্ছে হাজারো মানুষের দেহ। হিমশিম খাচ্ছেন দাফনকারীরাও- এ যেন মৃত্যুর মিছিল।

অথচ মার্চে মোদি বলেছিলেন, ভারত মহামারির বিরুদ্ধে 'লড়াইয়ের সমাপ্তির' পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে বিশ্বনেতাদের বলেছেন, তার দেশ মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হয়েছে। আর এখন প্রতিদিন দেশটিতে অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছে বহু মানুষ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, মোদির 'অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস' এবং তার 'কর্তৃত্বপরায়ণ নেতৃত্বের' ধরনের একটি বড় দায় রয়েছে এমন পরিস্থিতির জন্য।

বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, ভারতের জনগোষ্ঠী এখনও ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছে এবং তাদের 'হার্ড ইমিউনিটি' অর্জিত হয়নি। এমন সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে শত শত সভা করেছেন মোদিরা। যার মাধ্যমে সর্বত্র করোনা ছড়িয়েছেন তারা। এখন অনেকেই এই মহামারির জন্য সরাসরি মোদিকে দায়ী করছেন। বিরোধীরা আক্রমণ করছেন এবং অনলাইনে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন তিনি। বিশ্নেষকরা বলছেন, সমালোচনার মুখে চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিতের উদ্যোগ এবং টিকাদানে গতি বাড়ালেও এই মহামারির বিস্তার ও মৃত্যুর মিছিলের জন্য বহু মানুষ ব্যক্তিগত মোদিকে দায়ী করছেন। নয়াদিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের গবেষক আসিম আলি বলেন, 'মোদির শাসন পদ্ধতিই এই দোষারোপের পেছনে একটি বড় ভূমিকা রাখছে, যেখানে শীর্ষ মন্ত্রীদের বেছে নেওয়া হয়েছে তাদের দক্ষতা নয়; বরং আনুগত্যের বিবেচনায়। এ ধরনের শাসন কাঠামোয়, যখন মোদির হাত থেকে বল পড়ে যায়, যেমনটি হয়েছে কভিড মোকাবিলার ক্ষেত্রে, তখন বিপর্যয়ের পরিস্থিতি দেখা দেয়।'

সংক্রমণ যখন বেড়ে চলেছে, মোদি বিশাল নির্বাচনী সমাবেশ করার সুযোগ দিয়েছেন এবং তার সরকার লাখ লাখ মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি ছাড়াই সমবেত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করলেও মোদি সমাবেশ চালিয়ে গেছেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি, ভারতে যখন দৈনিক শনাক্ত রোগী দুই লাখ ছাড়িয়েছে, এক সমাবেশে তিনি বলেন, 'শুধু মানুষ আর মানুষ' দেখে তিনি দারুণ খুশি। বিশ্নেষকরা বলছেন, এতে শুধু তিনি খুশি হননি, সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে করোনা। পশ্চিমবঙ্গে ভোটের রাজনীতিতে বিজেপি মূলত হেরেছে তবে জিতেছে করোনা।

এদিকে আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির হারের পেছনে অন্যতম পাঁচটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, পরিচিত মুখের অভাব। রাজ্য বিজেপির নেতারা প্রচার পর্বে অনেক পরিশ্রম করলেও কোনো মুখ তুলে ধরতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, বাংলার কোনো নেতাকে মুখ হিসেবে তুলে না ধরে কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর ভর করায় 'বহিরাগত' তকমা পায় বিজেপি। তৃতীয়ত, রাজ্যে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা। চতুর্থত, বিভাজনের রাজনীতির মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করেছিল বিজেপি। পঞ্চমত, বিজেপির মূল অংশ ও নবাগতদের মধ্যকার বিবাদ।

মন্তব্য করুন